সাদত হাসান মান্টোর সাহিত্য জীবন
এই উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী ও উর্দু সাহিত্যের অনন্য-সাধারণ প্রতিভা সা’দত হাসান মান্টো ১৯১২ সালের ১২ই মে অমৃতসর জেলার সোমবালা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতৃব্য বংশগত দিক থেকে কাশ্মীরী ছিলেন কিন্তু পরে হিজরত করে পূর্ব পাঞ্জাবে চলে আসেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মান্টোর পিতা অমৃতসরে মুনেসফ ছিলেন। তাঁর দুই স্ত্রী। মান্টো দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনান্তে অমৃতসর থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং সেখানকার হিন্দু-মহাসভা কলেজে ভর্তি হন। তদানীন্তন বিশিষ্ট সমাজবাদী লেখক ও ইতিহাসবেত্তা ‘বারী আলীগ’-এর সাথে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি দুর্লভপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর রচনার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল অত্যন্ত উদার। মান্টো বারী আলীগের পাণ্ডিত্যে ও বিপ্লবী চরিত্রের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বলিষ্ট লেখনীর দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে মান্টো বই পড়া ও গল্প লেখার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। এই সময় বিদেশী সাহিত্যের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে এবং বিশ্বের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের সৃষ্টিশীল সাহিত্য-পুস্তক মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করেন।
অনুবাদক হিসেবে মান্টোর সাহিত্যজীবনে প্রবেশ। সর্বপ্রথম তিনি ফ্রান্সের খ্যাতনামা লেখক ভিক্টোর হুগোর একটি উপন্যাস ‘কয়েদীর ডাইরী’ নামে উর্দু ভাষার অনুবাদ করেন। এই উপন্যাসে মৃতুদণ্ডদানের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা হয়েছে। অতঃপর মান্টো ইংলণ্ডের খ্যাতনামা লেখক অস্কার ওয়াইল্ডের ‘বেয়ারা’ নাটক অনুবাদ করেন।
মান্টোর জীবনে চরম দুর্যোগ
বারী সাহেব অমৃতসর থেকে ‘খল্ক’ নামে একটি উর্দু সাপ্তাহিকী প্রকাশ করেছিলেন। এই উর্দু সাপ্তাহিকে মান্টোর প্রথম গল্প ‘তামাসা’ প্রকাশিত হয়। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের ভিত্তিতে এই গল্প রচিত। এই গল্পের মাধ্যমে মান্টোর সৃজনশীল প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। এই সময় তিনি ফরাসী, ইংরেজী ও রুশ সাহিত্যের মোঁপাসা, সমারসেট মম এবং ম্যাকসিম গোর্কীর রচনা পড়ে বিশেষভাবে প্রভাবান্বিত হন। কলেজজীবনে মান্টো লাহোরের প্রসিদ্ধ সাময়িকী ‘হুমায়ুন’ ও ‘আলমগীর’-এর ফরাসী ও রুশ সাহিত্য সম্পর্কিত বিশেষ সংখ্যা সম্পাদনা করেন। একই সাথে তাঁর পড়াশুনাও চলছিল। কিন্তু মান্টো ছকে ধরাবাঁধা পাঠ্য-পুস্তকে বিশেষ ননোযোগ দেবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। গতানুগতিক ক্লাসের বই পড়ায় তিনি কখনও মনোনিবেশ করতে পারেননি।
যৌবনে একবার মান্টো হাওয়া পরিবর্তনের জন্য কাশ্মীর বেড়াতে যান। মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যে ঘেরা কাশ্মীরের উপত্যকায় অবস্থানকালে মান্টো এক মর্মান্তিক ঘটনার সম্মুখীন হন যা তাঁর ব্যক্তি ও সাহিত্য-জীবনে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ঘটনা মান্টো বিস্তারিতভাবে তাঁর ‘ভিগোও একটি চিঠি’ নামক নিবন্ধে লিপিবদ্ধ করেছেন। মান্টোর জীবনের এই ঘটনা তাঁর সংবেদনশীল বিশেষ গল্পগুলি উপলব্ধি করতে অনেকাংশে সাহায্য করে। বুকে বিরাট বেদনার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে মান্টো অমৃতসর ফিরে এসে পড়াশুনার মনোনিবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মান্টোর স্বাস্থ্য দিন দিন ভেঙে পড়ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এক্সরে করার পর তাঁর যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ে। ফলে মান্টোর পড়াশুনার এখানেই চিরদিনের জন্য ছেদ পড়ে যায়।
সাহিত্য-জীবনের উন্মেষ
পিতার মৃত্যুর পর আলীগড় থেকে বাড়ী ফিরে মান্টো চাকরির সন্ধানে লাহোর চলে যান এবং সেখানে করম চান্দ নামক জনৈক ব্যক্তির ‘পারেস’ নামক পত্রিকায় ৪০ টাকা বেতনে চাকরি নেন। কিছুদিন পর পত্রিকায় মালিকের সাথে মতবিরোধ দেখা দেয়ায় মান্টো চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের অন্বেষণে বোম্বে যাত্রা করেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে বোম্বে ছিল ভারতের অন্যতম সর্বাধুনিক সুন্দর শহর। ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বোম্বে। তাছাড়া বোম্বে ছিল ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাণকেন্দ্র। এখানে চিত্রজগতে উর্দু লেখক ও কবিদের ছবির কাহিনী লিখে ভাগ্য উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ ছিল। মান্টো বোম্বের ‘মোসাব্বির’ সিনেমা সাময়িকীর ভারপ্রাপ্ত-সম্পাদক নিযুক্ত হন। প্রকৃতপক্ষে এখানেই মান্টোর সক্রিয় সাহিত্য-জীবনের সূচনা। দীর্ঘদিন বোম্বে অবস্থানকালে মান্টো গভীরভাবে সেখানকার চিত্রজগতের জীবনধারা পর্যালোচনা করেন এবং তাঁর গল্পের জন্য বিষয়বস্তু ও
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments