নুটি মন্তর

হাবু— নাপিতের ছেলে, সুতরাং রীতিমতো তার বুদ্ধি।

পায়রাগাছির গুণিন রোজা (ওঝা) এ অঞ্চলে প্রসিদ্ধ, সে নাকি মন্ত্রবলে সাপ হতে পারে, বাঘ হতে পারে, কী না-হতে পারে! লোহার সিন্দুকে কিংবা বাড়িতে বড়ো বড়ো হবসের-চবসের কুলুপ লাগানো আছে— পায়রাগাছির রোজা এসে কী একটা মন্তর বিড়-বিড় করে বলে দু-বার তালা ঝম-ঝম করে নাড়লে, আর তালা সব গেল বেমালুম খুলে। এ কত লোকের স্বচক্ষে দেখা। রায়েদের কলম আমবাগানে বিকাল বেলা কেউ কেউ নাকি দেখেছে, রোজা কলমের আম পাড়ছে; হয়তো লোকে ধরতে গিয়ে দেখলে— একটা খরগোশ লাফাতে লাফাতে বাগানের উত্তর দিকের বেড়া ডিঙিয়ে পালিয়ে গেল।

পায়রাগাছির রোজার মস্ত বড়ো নাম।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়— এত বড়ো নাম করা রোজা যে, তাকে কেউ কখনো দেখেনি। কোথায় সে কখন কীভাবে থাকে, তা কেউ বলতে পারে না।

হাবুর বড্ড ইচ্ছে সে কিছু মন্তর-তন্তর শেখে। এ তার অনেক দিনের ইচ্ছে। এখন তার বয়েস আঠারো-উনিশ। যখন তার বয়েস চোদ্দো-পনেরো, তখন থেকে সে যেখানেই শুনেছে রোজা-গুণিন এসেছে; অমনি তার পিছু পিছু ছুটে গিয়েছে। একবার তাদের পাশের গ্রামের হাই স্কুলে একজন বড়ো জাদুকর এসে নানারকম তাসের খেলা, টাকার খেলা দেখালে। একটা তাস বেমালুম গোলাপ ফুল হয়ে গেল, এর মুঠোবাঁধা টাকা ওর হাতে গেল, এক গ্লাস জল হয়ে গেল মিষ্টি শরবত।

তাদের গাঁয়ের দু-চারজন লোকের সঙ্গে হাবুও গিয়েছিল খেলা দেখতে। একখানা তাসকে তার চোখের সামনে গোলাপ ফুল হতে দেখে সত্যিই সে কী আশ্চর্যই না হয়ে গিয়েছিল!

ফিরবার পথে সন্ধে হয়ে এসেছে। ওর কীরকম গা ছমছম করতে লাগল।

কালি স্যাকরা দলের মধ্যে প্রবীণ। হাবু বললে— আচ্ছা কালিজ্যাঠা, ওসব কী করে করলে?

কালি স্যাকরা এটা তাচ্ছিল্যসূচক ভঙ্গি করে বললে— আহা এসব তো সোজা—

—সোজা, কালিজ্যাঠা?

—খু-উ-ব সোজা।

—কীরকম সোজা?

—ওসব মন্তর-তন্তরের কাণ্ড। আমিও ইচ্ছে করলে পারি।

—তুমিও পারো?

—কেন পারব না!

—একদিন করে দেখাবে জ্যাঠা?

কালি স্যাকরার কথায় কিন্তু হাবুর বিস্ময়বোধ দূর হল না। সে গিয়ে জাদুকরকে পরদিন সকালে পাকড়ালে। সোজাসুজি তাকে জানালে, সে ওইসব খেলা শিখতে চায়। শাকরেদ হতে সে রাজি আছে। জাদুকর কলকাতার লোক, মাথায় নরম বুরুশ দিয়ে চুল আঁচড়ে থাকেন, হাতে ঘড়ি পরেন, চোখে থাকে চশমা। তিনি নাক উঁচু করে বললেন— ওসব হয় না। অনেক টাকার খেলা, অনেক টাকা প্রিমিয়াম দিলে তারে শাকরেদ করি।

হাবু বললে— প্রিমিয়াম কী?

—প্রিমিয়াম টাকা হে, টাকা; পারবে আমায় দিতে?

মরিয়া হয়ে হাবু বললে— আজ্ঞে কত টাকা?

—এক-শো। পারবে দিতে?

—আজ্ঞে না। অত টাকা কখনো একসঙ্গে দেখিনি।

—তবে ফিরে যাও। এসব এমনি হয় না।

—কিছু কম করে নিন—

—দু-শো করে প্রিমিয়াম নিই, তোমায় এক-শো বলেছি।

হাবু সেখান থেকে সরে পড়ল। অত টাকার সিকিও দেবার ক্ষমতা নেই তার। জাদুবিদ্যা শেখবার সৌভাগ্য কি সকলের ঘটে?

কেটে গেল বছর তিনেক। এই তিন বছরে তার জীবনে নতুন কিছু ঘটল না। এ-অজ পাড়াগাঁয়ে জীবন একরঙা ছবির মতো একঘেয়ে।

ঠিক এমন সময়ে একদিন হাবু দুপুরে মাছ ধরতে গেছে নদীতে, সেইসময়ে দেখলে একটা লোক আমবাগানের ছায়ায় বসে বসে আপন মনে কতকগুলো ঢিল নিয়ে খেলছে। হাবু একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলে লোকটা একটা ঢিল হাতে নিয়ে ছুড়ে দিতেই সেটা মস্ত একটা কোলা ব্যাঙ হয়ে গেল, লাফিয়ে লাফিয়ে পালাল। আর একটা ঢিল ছুঁড়তেই সেটা হয়ে গেল ছেলেদের দু-চাকার একটা খেলনাগাড়ি, কিন্তু সে গাড়ি গড়গড় করে গড়িয়ে চোখের বাইরে অদৃশ্য হল; আর একটি ঢিল হিল-হিল করতে করতে একটা সাপ হয়ে চলে গেল, একটা ঢিল একমুঠো আবির হয়ে ছত্রাকারে ছড়িয়ে

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice