খুনী
চর আলেকজান্দ্রার সোনাভাঙা গ্রামের ঘাটে এখনো নৌকার ভিড়। কত নৌকা আসছে, যাচ্ছে: বালাম, সাম্পান, কিছু সোরঙ্গ-ও। চালের মরসুম এখনো সরগরম। অথচ এদিকে চৈত্রের শেষাশেষি। গাঁয়ের পশ্চিমে নারকেল-বন পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত খোলা প্রান্তরের ধারে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যাবে: উদ্দাম হাওয়ায় সে-প্রান্তরময় ধুলো উড়ছে। পেছনে নারকেল-বনে অশান্ত মর্মরধ্বনি, আর সামনের জনশূন্য প্রান্তরে কেবল ধুলো উড়ছে আর উড়ছে, কখনো ঘূর্ণি হয়ে ঊর্ধ্বে উঠে, কখনো আকাশের বুক থেকে তির্যক গতিতে নিচে নেবে আসে, আবার কখনো মাটি ছুঁয়ে তীরবেগে দূরান্তে মিলিয়ে গিয়ে। আর, যে-পথটা গ্রাম থেকে বেরিয়ে কিছু এঁকেবেঁকে সোজা পশ্চিমে চলে গেছে, সে পথ স্থানে স্থানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সে-ধুলোর মধ্যে: যেন শূন্যে মিলিয়ে গেছে উদ্দাম হাওয়ার তীব্র মায়ায়।
এমনি এক সময়ে এক ভরা দিনে রোদ খরখর করছে, তার মধ্যে ফজু মিঞাদের বাড়ির ও মৌলবীদের বাড়ির দু ছেলের মধ্যে কী একটা সামান্য বিষয় নিয়ে হঠাৎ খুনোখুনি হয়ে গেল; ফজু মিঞাদের ছেলের প্রাণ গেল, আর মৌলবীদের ছেলে তারপর সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, সোনাভাঙা গ্রামের কেউ আর তার কোনো সন্ধান পেল না। চর অঞ্চলে খুনোখুনি লেগে-ই থাকে, তাই চরবাসীদের জন্যে এটা এমন নতুন কিছু নয়। এবং মাস কাটতেই তারা প্রায় ভুলে গেল সে-কথা।
উত্তরবঙ্গের কোনো এক মহকুমা শহর। আবেদ মিঞার দর্জির দোকানটা ফৌজদারি আদালতের পাশে এক বিরাট পঞ্চবটি গাছের তলে। ওধারে ট্রেজারি। কাঁটাতারের বেড়ার দু কোণে উজ্জ্বল আলো; সে-আলোর খানিকটা এসে পড়ে তার দোকানের সামনে। কেউ-বা কখনো ভুল করে, বা পথ সংক্ষিপ্ত করবার জন্যে ট্রেজারির সামনে দিয়ে যেতে-ই পাহারাদার তীক্ষ্ণ ও কর্কশ গলায় হেঁকে ওঠে, তাছাড়া এ স্থান ভরে প্রগাঢ় অবিচ্ছেদ্য নীরবতা। সারাটা দিন ভরে এ-স্থান জনতার কোলাহলে তীব্রভাবে মুখর হয়ে থাকে বলে সন্ধ্যার পর এ-নির্জনতার নীরবতা অত্যন্ত জমাট মনে হয়, আর পাথরের মতো ভারি ঠেকে যেন। এবং পঞ্চবটির তলে ঘাসশূন্য পরিষ্কার স্থানে থেকে-থেকে যে শুকনো ঝরা পাতা দমকা হাওয়ায় মর্মরিয়ে ওঠে, সে-মর্মরকে মনে হয় দিনের কোলাহলের আবছা, অস্পষ্ট স্মৃতির মতো।
আবেদ দর্জি বৃদ্ধ। তার সেলাইয়ের কলটিও ঝুনো, চলতে গিয়ে সেটা আওয়াজ করে বেশি, আর কেমন থরথরিয়ে কাঁপে। অনেকক্ষণ তার ওপর হাত রেখে কাজ করলে হাতে ঝিঁঝি ধরে যায়, মনে হয় সেখানে-ও কল চলছে।
সে-কলটা এখন নীরব। নাকে চশমা দিয়ে ওপরে টাঙানো লণ্ঠনের আলোয় আবেদ রিফু করছে। সহকারী দর্জি দু-জন সন্ধ্যার পরেই বাড়ি চলে গেছে। এক সময়ে হাতের কাজ নাবিয়ে সে বিড়ি ধরাল, তারপর চশমার ফাঁক দিয়ে ওধারে তাকিয়ে দেখলে যে সিধু ময়রার দোকান এখনো খোলা, আর তার পাশে টিউবওয়েলে পানি তোলার ঘসঘস আওয়াজ হচ্ছে। সে চোখ নাবালে। তারপর দমকা হাওয়ায় হঠাৎ সামনের পাতা মর্মরিয়ে উঠল শুনে আবার সে চোখ তুলল, তুলে সামনের পানে তাকাল। ট্রেজারির আলো: শুকনো পাতা নড়ছে: আর ওদিকে কিছু-ভাঙা টুলটা। কিন্তু সে-টুলে কে যেন বসে রয়েছে না?
কয়েক মুহূর্ত চেয়ে চেয়ে দেখল আবেদ, তারপর শুধাল,
—কেডা বাহে?
কোনো উত্তর এল না। ওদিকে চেয়ে লোকটি মূর্তির মতো নিশ্চল।
আবেদ আবার ডাকলে, এবারো কোনো সাড়া এল না। এবং তাই একটা অদম্য কৌতূহল জাগল দর্জির মনে। সে দ্রুতভঙ্গিতে উঠে পড়ল, উঠে হুক থেকে লণ্ঠনটা নাবিয়ে খড়ম পায়ে দিলে, তারপর টুলটির কাছে গিয়ে লোকটার মুখের সামনে আলো তুলে ধরল। দেখল, অপরিচিত এক লোক, বয়স বেশি নয়। তার চুল উষ্কখুষ্ক, পরনের জামা ময়লা ও ছেঁড়া; দেহে প্রাণহীনতার স্তব্ধতা, আর চোখে শূন্যতার বীভৎসতা।
—কেডা তুমি?
লোকটি এবার চোখ ফিরিয়ে তাকাল তার পানে, কিন্তু তার চোখের সে বীভৎসতা চোখে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments