সোনাকরা যাদুকর
রোহিণী রায় আমাদের গ্রামের জমিদার ছিলেন শুনেছিলাম।
আমাদের পাড়ায় তাঁদের মস্ত দোতলা বাড়ি। তিন-চার শরিকে ভাগ হয়ে এক একখানা ঘরে বাস করে এক-এক শরিক— এই অবস্থা। ধানের জোতজমি যা আছে, তাতে একটা গোলাও ভরে না। রোহিণী রায়ের বর্তমান বংশধরগণ পেটপুরে দু-বেলা খেতেও পান না।
আমি আর নন্তু রোহিণী রায়ের চণ্ডীমণ্ডপে, বেণীমাধব রায়ের পাঠশালায় রোজ পড়তে যাই। রোহিণী রায়ের চণ্ডীমণ্ডপের অবস্থাও ওদের বাড়ির মতোই।
মস্ত বড়ো চণ্ডীমণ্ডপের এধারে-ওধারে টানা রোয়াকে চুন-সুরকি খসে পড়চে, চালের খড় উড়ে যাচ্ছে, দেওয়াল ফেটে গিয়েছিল ১৩০৪ সালের বড়ো ভূমিকম্পে। এখন যদিও ১৩১৮ সাল হল, এই চোদ্দো-পনেরো বছর সে দেওয়াল যেমন তেমনি রয়েছে। সেকেলে চওড়া মজবুত মাটির দেওয়াল, মাটির সঙ্গে কুচো বিচালি, কাঠকয়লা আর পুটিং-চুন মিশিয়ে দেওয়াল তৈরি। ভূমিকম্প না-হলে এক-শো বছরেও জখম হত না।
রায়দের এই চণ্ডীমণ্ডপ দেখতে অনেকদূর থেকে লোক আসে জানি। এমন চমৎকার খড়ের ঘর আর নাকি এ-তল্লাটে নেই। উলো-বীরনগরের বিখ্যাত গড়ু ঘরামির তৈরি এই আটচালা। কী চমৎকার সলা বাখারির কাজ, কী সুন্দর রং করা বাখারির সজ্জা, সবই সুন্দর। গড়ু ঘরামির তৈরি মটকায় নাকি দু-দিকে দুটো ময়ূর ছিল পেখম-ধরা। সে সব অনেক দিনের কথা। আমার বাবার মুখে গল্প শুনেছি।
রোহিণী রায়দের তিন শরিক বর্তমানে দরিদ্র অবস্থায় ওই সেকেলে পৈতৃক আবাস বাটিতে বাস করে। তাদেরই একজন হচ্ছেন বেণীমাধব রায়, যাঁর পাঠশালায় আমরা পড়ি।
গুরুমশায় প্রায়ই আমাকে বলেন— তোমাদের তো অনেক কলাই-মুগ হয় ঘরে? না?
—আজ্ঞে হ্যাঁ।
—কত হয়?
—আমি জানিনে, বাবা জানেন।
—একদিন এককাঠা মুগ নিয়ে আসবি, বুঝলি?
এককাঠা মুগের দাম হল তিন আনা। তাও কিনবার ক্ষমতা নেই বেণী কাকার। আমি বাড়ি গিয়ে মাকে বলতেই মা প্রায় দশ সের মুগ ওদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন আমাদের মাইন্দার অর্থাৎ কৃষাণের হাতে।
—ও হাজু, মুগ দিলে কে রে অত?
—মা দিলেন, গুরুমশায়।
—বেশ বেশ। অনেক দিয়েচেন বউমা।
—মা বলেচে, দরকার হলে আমায় জানাবেন।
—না না, আর জানাতে হবে না। একজনের কাছ থেকে সব নিতে হবে তার মানে কী? আর দিতে হবে না। নামতা মুখস্থ করো।
বেণী কাকার দাদার নাম মদনলাল রায়। তাঁর বয়েস হয়েচে বটে, কিন্তু শরীরের গড়ন ও স্বাস্থ্য খুব ভালো। আমাদের গাঁয়ে অমন সুপুরুষ বৃদ্ধ আর একটি নেই। অনেক গ্রামেই নেই। লাঠিখেলা, ঘোড়ায় চড়া ও শড়কি চালানোতে যৌবন বয়সে নাকি পাকা ওস্তাদ ছিলেন শুনেছি, কেউ বলে তাঁর ডাকাতের দল ছিল, পুলিশের জুলুমে সে পেশা ছেড়ে দিয়েচেন।
বর্তমানে তাঁর তিন অবিবাহিতা মেয়ে, নিরু দিদি, বাসন্তী দিদি আর শান্তি দিদি। নিরু দিদি দেখতে তত ভালো নয়। বাসন্তী ও শান্তি দিদি সুন্দরী মেয়ে।
মদন জ্যাঠামশায় এখন গরিব লোক। কোঁচার মুড়োয় বেঁধে হাট থেকে এককাঠা করে মোটা আউশ চাল আনেন দু-আনা দিয়ে। দু-আনাও জোগাড় করতে পারেন না সব দিন। পাড়াগাঁয়ে দু-আনা জোগাড় করা সোজা কাজ কি? মেয়ে যতই সুন্দরী হোক, বিনি পয়সায় কে নেবে?
কিন্তু মদন জ্যাঠা গরিব হলেও, শান্ত-প্রকৃতির লোক নন। তাঁর দাপটে গ্রামসুদ্ধ হিন্দু-মুসলমান তটস্থ। কথায় কথায় তাঁর মান যায়, পান থেকে চুন খসবার জো নেই। ভয় করে তাঁকে খুব, সবাই বলে মদন রায় ডাকাত, কখন কী করে বসে তার ঠিক কী?
শড়কির এক হ্যাঁচকা টানে ভুঁড়ি হসকে দেবো—
এই হচ্চে মদন জ্যাঠামশায়ের মুখের বুলি!
এ হেন মদন জ্যাঠামশায়ের একবার—
আচ্ছা, থাক। ও ভাবে নয়, গল্পটা অন্যভাবে বলি।
বর্ষার সকাল বেলা। জন্মাষ্টমীর ছুটি সামনে আসচে। আমাদের গিরিধারীলালের আখড়ায় জাঁকিয়ে জন্মাষ্টমী হয়; লোকজন নিমন্ত্রণ হয়, লুচি, মালপুয়া, সুজি, গজা,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments