মায়া
দু-বছর আগের কথা বলি। এখনও অল্প-অল্প যেন মনে পড়ে। সব ভুল হয়ে যায়। কী করে এলাম এখানে! বগুলা থেকে রাস্তা চলে গেল সিঁদরানির দিকে। চলি সেই রাস্তা ধরেই। রাঁধুনি বামুনের চাকরিটুকু ছিল অনেক দিনের, আজ তা গেল।
যাক, তাতে কোনো দুঃখ নেই। দুঃখ এই অবিচারে চাকরিটা গেল। ঘি চুরি করিনি, কে করেছে আমি জানিও না, অথচ বাবুদের বিচারে আমি দোষী সাব্যস্ত হলাম। শান্তিপাড়া, সরষে, বেজেরডাঙা পার হতে বেলা দুপুর ঘুরে গেল। খিদেও বেশ পেয়েছে। জোয়ান বয়স, হাতে সামান্য কিছু পয়সা থাকলেও খাবার দোকান এ-পর্যন্ত এসব অজ পাড়াগাঁয়ে চোখে পড়ল না।
রাস্তার এক জায়গায় ভারি চমৎকার একটি পুকুর। স্নান করতে আমি চিরকালই ভালোবাসি। পুকুরের ভাঙা ঘাটে কাপড় নামিয়ে রেখে জলে নামলাম। জলে অনেক পানা-শেওলা, সেগুলি সরিয়ে পরিষ্কার করে প্রাণ ভরে ডুব দিলাম। বৈশাখের শেষ, গরমও বেশ পড়েছে, স্নান করে সত্যি ভারি তৃপ্তি হল। শরীর ঠান্ডা হল বটে, কিন্তু পেট জ্বলছে। এ সময় কোনো বনের ফল নেই? চোখে তো পড়ে না যেদিকে চাই।
এমন সময় একজন বুড়ো লোক পুকুরটাতে নাইতে আসছে দেখা গেল। আমাকে দেখে বললেন— বাড়ি কোথায়?
আমি বললাম— আমি গরিব ব্রাহ্মণ, চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছি। আপাতত বড়ো খিদে পেয়েছে, খাবো কোথায়, তিনি কি সন্ধান দিতে পারেন?
বুড়ো লোকটি বললে— রোসো, নেয়ে নি— সব ঠিক করে দিচ্ছি।
স্নান সেরে উঠে লোকটি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকে জঙ্গলে ঘেরা একটি পুরোনো বাড়িতে ঢুকল। বললে— আমার নাম নিবারণ চক্রবর্তী। এ বাড়ি আমার, কিন্তু এখানে আমি থাকিনে। কলকাতায় আমার ছেলেরা ব্যাবসা করে, শ্যামবাজারে ওদের বাসা। এত বড়ো বাড়ি পড়ে আছে, আর সেখানে মাত্র তিনখানা ঘরে আমরা থাকি। কী কষ্ট বলো দিকি? আমি মাসে মাসে একবার আসি, বাড়ি দেখাশুনো করি। ছেলেরা ম্যালেরিয়ার ভয়ে আসতে চায় না। মস্ত বড়ো বাগান আছে বাড়ির পেছনে। তাতে সবরকম ফলের গাছ আছে, বারো ভূতে খায়। তুমি এখানে থাকবে?
বললাম— থাকতে পারি।
—কী কাজ করবে?
—রাঁধুনির কাজ।
—যে ক-দিন এখানে আছি সে ক-দিন এখানে রাঁধো, দু-জনে খাই।
—খুব ভালো।
আমি রাজি হয়ে যেতে লোকটা যেন হঠাৎ ভারি খুশি হল। আমার খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে তখনি। খাওয়া-দাওয়ার পরে আমাকে একটা পুরোনো মাদুর আর একটা মোটা তাকিয়া বালিশ দিয়ে বললে— বিশ্রাম করো।
পথ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ঘুমিয়ে যখন উঠলাম, বেলা আর তখন নেই। রাঙা রোদ বড়ো বড়ো গাছপালার উঁচু ডালে। এরই মধ্যে বাড়ির পেছনের জঙ্গলে শেয়ালের ডাক শুরু হল। আমি বাইরে গিয়ে এদিক-ওদিক খানিকটা ঘুরে বেড়ালাম। যেদিকে চাই, সেদিকেই পুরোনো আম-কাঁঠালের বন আর জঙ্গল। কোনো লোকের বাড়ি নজরে পড়ল না। জঙ্গলের মধ্যে এক স্থানে কেবল একটা ভাঙা দেউল দেখতে পেলাম। তার মধ্যে উঁকি মেরে দেখি, বুড়ো নিবারণ চক্রবর্তী বসে তামাক খাচ্ছে। আমায় বললে— চা করতে জানো? একটু চা করো। চিঁড়ে ভাজো। তেল-নুন মেখে কাঁচালঙ্কা দিয়ে খাওয়া যাবে।
সন্ধ্যার পর বললে— ভাত চড়িয়ে দাও। সরু আতপ আছে, গাওয়া ঘি আছে, আলুভাতে— ব্যস।
—যে আজ্ঞে।
—তোমার জন্যে ঝিঙের একটা তরকারি করে নিও। ঝিঙে আছে রান্নাঘরের পেছনে। আলো হাতে নিয়ে তুলে আনো এইবেলা। আর একটা কথা, রান্নাঘরে সর্বদা আলো জ্বেলে রাখবে।
—তা তো রাখতেই হবে। অন্ধকারে কি রান্না করা যায়?
—হ্যাঁ, তাই বলছি।
মস্ত বড়ো বাড়ি। ওপরে-নীচে বোধ হয় চোদ্দো-পনেরো খানা ঘর। এ ছাড়া টানা বারান্দা। দু-চারখানা ছাড়া অন্য সব ঘরে তালা দেওয়া। রান্নাঘরের সামনে মস্ত বড়ো লম্বা রোয়াক, রোয়াকের ও-মুড়োয় চার-পাঁচটা নারকেল গাছ আর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments