পরাজয়
দূরে যেখানে ধলেশ্বরীর সাথে এই রাঙাধারের ঢালা এক হয়ে মিশেছে, সে-সঙ্গমস্থানের বিস্তীর্ণ জলরাশি হঠাৎ ঝলমল করে উঠল। মেঘের ফাঁকে সকালবেলার সূর্যালোক ঝলকে পড়েছে সেখানে। এবং ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষুদ্র কোটরগত অথচ উজ্জ্বল চোখ দুটি দূরে নিবদ্ধ করে মজনু ঠোঁটের প্রান্তে একটু হাসল, তারপর সবল হাতে লগি দিয়ে তীর হতে গভীর জলে নৌকা ঠেলে সে বলে উঠল:
—হেই গো, মোদের নাও ভাসল।
মাথায় তার জড়ানো লাল গামছা, সাদার ওপরে নীল চেকের আধময়লা লুঙ্গিটি কোঁচামেরে পরা, এবং দেহের বাকি সমস্ত অংশ অনাবৃত। লগি ছেড়ে হাল ধরে বাইতে শুরু করলে তার সুগঠিত পেশিবহুল কঠিন-কালো দেহের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চঞ্চল হয়ে উঠল, যেন তার সমগ্র দেহ উল্লাসে ঝলমল করে উঠল ওই রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিস্তৃত জলরাশির মতো।
ছইয়ের ভেতর থেকে কালু কথা কয়ে উঠল:
—তার নাও তো ভাসল, মোর কল্কেয় আগুন ধরে কই?
মজনু উত্তর দিলে না। ওপাশ দিয়ে হলদে রঙের তালি-দেয়া ছোট পাল উড়িয়ে একটা নৌকা যাচ্ছিল; তার হালের কাছে উবু হয়ে বসে রয়েছে কুঁজোমতো একটি বুড়ো মাঝি, তাকে উদ্দেশ করে ঘাড় হেলিয়ে মজনু চিৎকার করে প্রশ্ন করলে:
—কই যায় গো তোমার নাও, অ কেতাঘাটের মাঝি?
বুড়ো তার পানে তাকাল না, শুধু একটু নড়ে বসে গলা উঁচিয়ে জবাব দিলে:
—মামুদপুর।
আড়চোখে সে-নৌকার ছইয়ের ভেতরে তাকাল মজনু: কাঁচা সোনার মতো রঙের কে এক মেয়ে বসে রয়েছে সেখানে। মুখে তার ঘোমটা নেই, পরনে কালো শাড়ি।
নৌকাটি তখন দূরে চলে গেছে, হলদে রঙের পালের তালিগুলো আর নজরে পড়ে না, কালুকে মজনু আস্তে বললে,
—একটা সোনা-মুখ দেখলাম।
—জলকন্যা দেখলা নাকি?
পুব থেকে হাওয়া বইছে, নদীর জলে তাই মৃদু ঢেউ, আর অস্পষ্ট কলকল আওয়াজ। ওধারে আকাশটা পরিষ্কার হয়ে গেছে, নীল স্বচ্ছ আকাশে পরিপূর্ণ রোদ ঝলমল করছে, আর তারই ছটা লেগেছে অদূরে কাশের বনে। মৃদু হাওয়ায় দুলছে কাশবন, তার ডগাগুলো চিকচিক করছে। নৌকা যখন রাঙাধারের ঢালা থেকে বেরিয়ে ধলেশ্বরীর মাঝামাঝি এসে পড়ল তখন স্রোতের ধারে নৌকা দুলে উঠল। তাছাড়া নৌকা চলছে ঈষৎ কোনাকুনি ভাবে। স্রোতের অনুকূলে ওদিক হতে একটা দৈত্যের মতো গোপালপুরী নৌকা আসছে, পালের রং তার সাদা। পেছনে মাচার ওপর লাল ডোরাকাটা নিশানার তলে বসে রয়েছে নেড়া হিন্দুস্থানি মাঝি, তাছাড়া বাইরে কেউ নেই। মাঝির পানে চেয়ে মজনু হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল,
—হেইগো, বাঁয়ে বাঁয়ে।
নৌকা না তো, সত্যিই যেন দৈত্য। তাছাড়া পেতলে বাঁধানো গলুইর পানে তাকালে কিছু শ্রদ্ধাও হয়, আর মনে পড়ে কবে একবার সে দেখেছিল এক মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীকে, যার সামনের দুটো দাঁত ছিল সোনায় বাঁধা।
—অ কালু, হুক্কার পানি কদ্দূর গো? একবার বার হয়ে আস দেখি, নায়ে জবর টান ধরছে।
হুক্কার গুড়গুড় আওয়াজ হঠাৎ থেমে গেল, ছইয়ের গর্ভ দিয়ে সশব্দে নদীতে থুতু ফেলে লোকটি বলে উঠল:
—পানিটা কেমুন বোঁদা-বোঁদা, গলায় ধরল না।
একটু পরে ছইয়ের পেছন দিয়ে বেরিয়ে এল কালু, হাতে তার হুঁকা। সেটি মজনুর হাতে দিয়ে সে চলে গেল সামনে। দাঁড় বাইতে হবে।
সূর্য তখন অনেকটা উঠে পড়েছে। যেখানে তারা এসে পৌঁছল সেটা নদীর তীর নয়, নদীর মাঝখানে জলে ডোবা বিস্তীর্ণ চর। ওপাশে ছমিরের মাচাটা নজরে পড়ে, নিচে বাঁধা ছোট ডিঙিটার কিছু অংশও দেখা যাচ্ছে। ছমির তাহলে মাচাতেই রয়েছে। এধারে ধান নেই, শুধু জলের ওপর মাথা উঁচু করে রয়েছে দীর্ঘ ধারালো ছন ও ভাতসোলা। গলুইতে বসে রয়েছে বলে কালুর পিঠ ছড়ে যেতে লাগল ছনের ধারে। জলে ভারি গন্ধ, আর চারধারে কেমন ভাপসা গরম, যেন ওপরে অত বড় বিস্তৃত অনন্ত আকাশ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments