স্বপ্ন-বাসুদেব
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের কথা। আজ থেকে প্রায় বাইশশো বছর আগের তক্ষশিলা।
নগরীর রাজপথ কোলাহলমুখর! নবারুণোদয় নিজ মহিমায় ধীরে ধীরে উচ্চ চূড়ায় ও স্তম্ভে নবপ্রভাতের বাণী ঘোষণা করচে। তক্ষশিলায় সম্প্রতি দেবী মিনার্ভার এক মন্দির তৈরি হচ্ছে, পার্থেননের স্থাপত্যের অনুকরণে—গম্বুজ বা ডোম কোথাও নেই—ছাদ সমতল, অগণিত সুসমঞ্জস বিরাট স্তম্ভশ্রেণী। গ্রিক স্থাপত্য গম্বুজের খিলান গড়তে অভ্যস্ত ছিল না। বহু পরবর্তী কালে সারাসেন সভ্যতার যুগে ইউরোপে এর উৎপত্তি, সারাসেন তথা মুর সভ্যতার দান এটি।
বড়ো বড়ো স্প্রিংবিহীন কাঠ ও লোহার তৈরি এক্কার ধরনের গাড়িতে মাঝে মাঝে দু-চারজন ধনী বণিক ও গ্রিক জমিদারগণ যাতায়াত করছেন। সুন্দরী গ্রিক বালিকাও মাঝে মাঝে রথে চড়ে চলেছে—দেবী এথেনির মতো। ব্রোঞ্জের বিরাট জুপিটারমূর্তি প্রস্তরের ছত্রাবরণতলে শোভা পাচ্চে রাজপথের মোড়ে। বণিকগণের আপণশ্রেণীতে কত কি জিনিস—কত দেশ থেকে আহরণ করে আনা।
একটি সুবেশ বালক ভৃত্য একটি দোকানে এসে বল্লে—কলা আছে?
—আছে, দাম বেশি পড়বে।
—কোথাকার কলা?
—এই কাছের গাঁয়ের। বুড়ো রোজ টাটকা দিয়ে যায়।
—আর আঙুর?
—মদ তৈরি করবার জন্যে সামান্য কিছু এনেছিলাম,—নিয়ে যাও।
হঠাৎ রাজপথকে চমকিত করে তুর্য বেজে উঠল। মহারাজ অ্যান্টিআলকিডাসের মহামাত্য ডিওন ভ্রমণে বেরিয়েছেন—রাজপথ কাঁপিয়ে শ্বেতাশ্ববাহিত টাঙ্গায় রাজপুরুষ ডিওন চলে গেলেন—বালক ভৃত্যটি হাঁ করে চেয়ে রইল।
দোকানদার বল্লে—তোমার কর্তা কোথায় চল্লেন?
বালক তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বল্লে—কি জানি বাপু! সে খোঁজে আমার দরকার কি?
—ওঁর ছেলে কি এখনো সেই বিদেশে?
—তিনি কাল এসেছেন মালব থেকে। সেখান থেকে এসেই অসুখ বাধিয়েছেন বলেই ফল নিতে এসেচি এত সকালে। বলব কি—পয়সাকড়ির অবস্থা ভালো না। রাজা মাইনে দেন না ঠিকমতো—লুটেপুটে নিয়ে যা চলে।
দোকানদার অধীরভাবে বলে উঠল—যাও, যাও—আমার দোকানে ওসব— এক্ষুনি কে শুনবে! তোমার কি, বড়োলোকের চাকর—সুন্দর মুখের সব মাপ—
এই কথার মধ্যে কিঞ্চিৎ বক্রোক্তি ছিল। ভৃত্য সে উক্তি গায়ে না-মেখেই চলে গেল।
একটু পরে স্বয়ং ডিওনপুত্র হেলিওডোরাস এসে ফলের দোকানের সামনে দাঁড়াল। সুগঠিতদেহ সৌম্যকান্তি গ্রিক যুবক, রং অনেকটা আধুনিককালের পেশোয়ারি মুসলমানের মতো। দীর্ঘ দেহ, ঈষৎ কুঞ্চিত কেশ, চক্ষু দুটি নীল নয়— কটা। হেলিওডোরাস চাকা ছুড়বার প্রতিযোগিতায় দু-বার সকলকে পরাজিত করে মহারাজ অ্যান্টি আলকিডাসের প্রকাশ্য সভায় পুরস্কার পেয়েছেন। তক্ষশিলার অনেক লোকে তাঁকে চেনে। কপিলা থেকে আনীত বিদেশি সুরা খুব চড়া মূল্যে বিক্রি হয় তক্ষশিলার বাজারে। সাধারণ লোকের সাধ্য নেই তা কেনে—কিন্তু হেলিওডোরাস বন্ধুবান্ধব নিয়ে সরাইখানায় বসে ফুর্তি করবার সময়ে কপিলার সুরা ব্যতীত অন্য কিছু চায় না।
ফলের দোকানের মালিক সসম্ভমে অভিবাদন করে বল্লে—আসুন ছোটোকর্তা, আমার আজ বড়ো সৌভাগ্য—এত সকালে আপনার পায়ের ধুলো পড়ল এ গরীবের দোকানে।
হেলিওডোরাস ঈষৎ গর্বিত সুরে বল্লে—জুজু এখানে এসেছিল?
—হাঁ কর্তা, এইমাত্র চলে গেল।
—আঙুর দিয়ে তাকে?
কথার উত্তর দোকানির কাছ থেকে শুনবার আগেই হেলিওডোরাস চলে গেল। দোকানি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে হেলিওডোরাসের অপস্রিয়মাণ সুন্দর চেহারার দিকে চেয়ে রইল।
ডিওনের আর্থিক অবস্থা আজকাল সত্যই ভালো নয়। রাজার দরবারে তিনি সভাসদ বটে, কিন্তু রাজা অ্যান্টি আলকিডাসের নিজেরই আর্থিক অবস্থা যা, তাতে সভাসদদের অর্থসাহায্য করবার অবস্থা নয় তাঁর। গান্ধারের রাজা জোজিফাস ও পুরুষপুরের গ্রিক তালুকদার হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ লেগেই আছে— রাজকোষের যাবতীয় অর্থ এখন ওদিকেই ওড়ে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম, সুতরাং ডিওন এবং অন্যান্য কর্মচারীগণ ঠিকমতো বেতন পান না, বাজারের বণিক ও প্রজাদের নিকট নানা ছলে অর্থশোষণ করেন। এঁদের মধ্যে ডিওন প্রধান সভাসদ, সুতরাং তাঁর অত্যাচারে তক্ষশিলার বিত্তশালী প্রজা ও বণিক মাত্রেই তাঁর ওপর যথেষ্ট বিরক্ত।
রাজা অ্যান্টি আলকিডাস ব্যাকট্রিয়ান গ্রিক—সুতরাং ভারতীয় প্রজা যত বেশি উৎপীড়িত হয়—গ্রিক ব্যবসায়ী বা প্রজা তার অর্ধেকও না। দু-বার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments