হিরোশিমার সাইকেল
প্রতিবারই গ্রীষ্মের ছুটির আগে আমরা বসে যাই বেড়ানোর প্ল্যান করতে। আমাদের লিডার মাসুল মামা। সাথে রবিন, মনি আর আমি। মনি আর রবিন তো সবসময়ই সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনা কিংবা জাপানের দিকে যেতে চায়। মাসুল মামা অনেক টানাটানি করে তাদেরকে দার্জিলিং পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টা করে। আমি অবশ্য তাদের মতো উচ্চাকাক্সক্ষী নই। বেশি হলে কক্সবাজার কিংবা সুন্দরবন পর্যন্ত যেতে পারলেই খুশি। কিন্তু কোনোবারই আমাদের প্ল্যান বাস্তবায়িত হয় না টাকার অভাবে। অনেক চেষ্টা করেও দু-তিন হাজারের বেশি জোগাড় করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত আমাদের দৌড় সেই চিরাচরিত নানাবাড়ি মোগলটুলায় গিয়েই শেষ হয়ে যায়। এবারও জাপান-সুন্দরবন পর্যন্ত প্ল্যান করে মোগলটুলায় যাওয়াই স্থির হয়েছে কিন্তু এবার সেখানেও যাওয়া আমার হলো না।
আমরা যাব রবিবার সকালে, কিন্তু রবিবার দুপুর থেকেই ছোট চাচা পেটব্যথা শুরু। প্রথমে চিনচিনে, শেষে বাড়তে বাড়তে একেবারে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। সবাই তাকে নিয়ে ছুটলাম ডাক্তারের কাছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তার রায় দিলেন এপিন্ডিসাইটিস। সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি এবং সোজা অপারেশন টেবিলে। অপারেশন শেষে ওটি থেকে বেরিয়ে এসে, মুখ থেকে মাস্কটা সরিয়ে খুব গম্ভীর গলায় ডাক্তার বললেন, ‘আপনাদের ভাগ্য খুব ভালো। ঠিক সময়ে রোগী নিয়ে এসেছিলেন। আর ঘণ্টা দুয়েক পরে আনলে রোগীকে বাঁচানো খুব কঠিন হতো’।
ডাক্তারের কথা শুনে একটু আড়ালে গিয়ে রবিন আর মনি হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়তে চায়। এর আগেও নাকি আরও এগারো জনের অপারেশনের সময় ওরা কাছেই ছিল। প্রতিবারই ডাক্তাররা একই কথা বলেছে।
ছোট চাচা অপারেশন হয়েছে রাতে, আর সকালে উঠেই কাঁধে ট্র্যাভেল ব্যাগ ঝুলিয়ে মনি আর রবিন হাসিমুখে মাসুল মামার সাথে মোগলটুলার দিকে রওনা হলো। আমারও যাওয়ার ইচ্ছা পুরোপুরিই ছিল, কথাটা আম্মুর কাছে মিনমিন করে বলতেই, আম্মু এমন ছিঃ ছিঃ শুরু করল, যেন ছোট চাচার মরণ-বাঁচন অবস্থা। অথচ পরদিন বিকেলেই দেখি ছোট চাচা দিব্যি হাঁটাহাঁটি করছে আর সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। মাঝখানে আমার বেড়াতে যাওয়াটাই মাটি।
মোগলটুলা হচ্ছে মাসুল মামাদের গ্রামের বাড়ি। আবার মনি, রবিন আর আমার আম্মুদের নানাবাড়ি অর্থাৎ উত্তরাধিকার সূত্রে আমাদের ডবল নানাবাড়ি। সেখানে আছে আমাদের ডজন ডজন মামা আর খালা। সবাই আবার একজনের চেয়ে আরেকজন পাল্লা দিয়ে ভালো। সবাই যা খাওয়ায় না কী বলব! আমাদের তিনজনের স্থির বিশ্বাস মোগলটুলার মানুষদের মতো ভালো মানুষ পৃথিবীতে আগেও কোথাও ছিল না, এখনও নেই আর ভবিষ্যতেও হবে না।
মাসুল মামা একদিন বলেছিল, ‘তোরা তো শুধু খাওয়ার জন্যেই আমাদের ভালো বলিস, আমি কি আর বুঝি না’।
কথাটা শুনে। কথাটা সত্য হলেও হতে পারে! আমরা তিনজন এত রেগে গেলাম যে, মাসুল মামার সাথে পুরো চারদিন কথা বলা বন্ধ করে দিলাম, যাকে বলে একেবারে লাগাতার হরতাল। শেষে পাঁচদিনের দিন ও কথাটা উইথড্র করার পর আমরা হরতাল তুলে নিয়েছিলাম।
ওরা তো বলে গেছে তিনদিনের বেশি মোগলটুলায় থাকবে না। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি সাতদিনের আগে কোনোভাবেই ওরা ফিরছে না। আরও বেশি থাকলেই-বা আনতে যাবে কে!
একা একা থাকতে থাকতে এমনিতেই মন-মেজাজ খারাপ হয়ে আছে, তার উপর উড়ে এসে জুড়ে বসেছে আরেক বিপত্তি। এক মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে টিটি মামা এবং ওর সদ্য কেনা জাপানি সাইকেল। টিটি মামা আম্মার চাচাতো ভাই। ও সাইকেল চালানো শিখেছে মাত্র কদিন আগে। এখনও ভালো করে চালাতে পারে না, হাত একেবারেই পাকেনি। একা একা চালাতেও পারে না। রাস্তায় চালানোর সাহস হয় না। কলেজ মাঠে এক চক্কর দিতে তিনবার উল্টে পড়ে। অথচ কী ভাগ্য ওর, এখনই ও পেয়ে গেছে দারুণ
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments