টোবা টেকসিং
অনুবাদ: কমলেশ সেন
দেশ বিভাগের দু-তিন বৎসর পর পাকিস্তান এবং হিন্দুস্থানের সরকারের খেয়াল হল কয়েদীদের মতো পাগলদের আদান প্রদান হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ যে সব মুসলমান পাগল হিন্দুস্থানের পাগলা গারদে আছে তাদের পাকিস্তানে এবং যে সব হিন্দু ও শিখ পাকিস্তানের পাগলা গারদে আছে তাদের হিন্দুস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
জানি না এ ঠিক ছিল কি বেঠিক ছিল। যাই-ই হোক, বুঝদার মানুষের রায় অনুসারে উচ্চস্তরের কনফারেন্স হল এবং শেষে এক দিন পাগলদের আদান-প্রদানের ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনুসন্ধান চালানো হলো। যে সব মুসলমান পাগলদের আত্মীয়-স্বজন হিন্দুস্থানে আছে তাদের সেখানেই রাখা ঠিক হল। আর পাকিস্তান থেকে যেহেতু সব হিন্দু এবং শিখ হিন্দুস্থানে চলে গিয়েছে তাই কাউকেই আর এখানে রাখার কথাই ওঠে না। যত হিন্দু এবং শিখ পাগল ছিল তাদের পুলিশের পাহারায় সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া হল। ওদিককার কোন খবর নেই। কিন্তু এ দিকে লাহোরের পাগলা গারদে এই আদান-প্রদানের খবর পৌঁছলে খুব মজার মজার ঘটনা ঘটল। এক মুসলমান পাগল, যে বারো বৎসর ধরে প্রতিদিন নিয়মিত ‘জমিদার’ পত্রিকা পড়ে আসছে, তাকে তার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, “মৌলভী সাহাব, এই পাকিস্তান বস্তুটা কি?” মৌলভী সাহেব খুব গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করে বলল, “হিন্দুস্থানের মধ্যে এ এমন এক জায়গা যেখানে খুর তৈরী হয়।”
মৌলভী সাহেবের উত্তর শুনে তার বন্ধু আর কোন কথাই বলল না।
একজন শিখ পাগল আর একজন শিখ পাগলকে জিজ্ঞেস করল, “সর্দারজী, আমাদের হিন্দুস্থানে কেন পাঠানো হচ্ছে? আমার তো ওখানকার ভাষা জানা নেই।”
অন্য শিখ পাগলটি হেসে বলল, “আমার কিন্তু হিন্দুস্থানের ভাষা জানা আছে। তবে হিন্দুস্থানীরা খুব ডাঁটের মাথায় চলা-ফেরা করে।”
একদিন এক মুসলমান পাগল স্নান করতে করতে এমন জোড়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিল যে, পা পিছলে সে শানের ওপর পড়ে বেহুঁশ হয়ে গেল। এমন কিছু পাগল ছিল যাদের ঠিক পাগল বলা যায় না। এদের অধিকাংশই ছিল খুনী। এই সব খুনীদের সঙ্গে জড়িত অফিসাররা ফাঁসীর দড়ি থেকে তাদের বাঁচানোর জন্যে অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে এখানে পাঠিয়েছে।
এরা অবশ্য কিছু কিছু বোঝে, দেশ বিভাগ কেন হয়েছে এবং পাকিস্তান কি। কিন্তু সমস্ত ঘটনা সম্পর্কে তারাও বিশেষ কিছু জানে না। খবরের কাগজ থেকে সমস্ত ঘটনা আঁচ করা সম্ভব নয়। আর পাহারাদার সিপাইরাও অজ্ঞ এবং তাদের ব্যবহার ভীষণ রুক্ষ। ওদের আলাপ-আলোচনা থেকে কোন কিছুই বেরিয়ে আসে না। তারা কেবল এতটুকুই জানে মুহম্মদ আলী জিন্না নামে একজন মানুষ আছেন, যাঁকে কায়েদ-ই-আজম বলা হয়। ইনি মুসলমানদের জন্যে এক পৃথক দেশ বানিয়েছেন—যার নাম পাকিস্তান। কিন্তু এই পাকিস্তান কোথায় আছে? এর উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। কারণ পাগলা গারদের এরা সবাই উন্মাদ। যাদের মাথা একেবারে বিগড়ে যায়নি, তাদের চিন্তা তারা পাকিস্তানে আছে, না হিন্দুস্থানে আছে। যদি হিন্দুস্থানে থাকে তবে পাকিস্তান কোথায়, আর যদি পাকিস্তানে থাকে তবে এই জায়গা কিছুদিন আগেও হিন্দুস্থান ছিল। একজন পাগলা হিন্দুস্থান-পাকিস্তান, পাকিস্তান-হিন্দুস্থানের এমন চড়কি পাকের মধ্যে পড়ল যে তার মাথা আরো বিগড়ে গেল। ঝাঁট দিতে দিতে সে একদিন এক গাছের ডালে বসে পাকিস্তান এবং হিন্দুস্থানের মৌলিক সমস্যার ওপর লাগাতার দু’ঘণ্টা ভাষণ দিল। সিপাইরা তাকে নীচে নামতে বললে সে আরো ওপরের ডালে চড়ে বসল। তাকে ধমকানো এবং ভয় দেখানো হলে সে বলল, “আমি হিন্দুস্থানেও থাকতে চাই না, পাকিস্তানেও না। আমি এই গাছের ওপরেই থাকব।”
বুঝিয়ে-সুজিয়ে তার রাগ ঠাণ্ডা করা হলে সে গাছ থেকে নেমে এসে হিন্দু এবং শিখ বন্ধুদের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। তাকে ছেড়ে এরা সব হিন্দুস্থানে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments