-
রাস্তার ধারে ধুলোভারাচ্ছন্ন বৈঠকখানায় বসে খানবাহাদুর মোত্তালেব সাহেব ভাবেন। ভাবেন যে সে-কথা তাঁর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চোখের নিচে মাংসের থলে। বড় গোছের চোখ দুটো তার মধ্যে ভারি দেখায়। অনেকটা মার্বেলের মতো। তাও ড্রেনের কোণে হারিয়ে যাওয়া নিশ্চল মার্বেল।
তিনি তাঁর বয়সের কথা ভাবেন। তাঁর সমগ্র মাথায় আজ পক্ককেশ, কিন্তু তার জন্যে বয়সকে দোষ দেওয়া যায় না। বিস্তারিত ওকালতি ব্যবসা সৃষ্টি করবার জন্যে যে কঠোর শ্রম করেছেন বছরের পর বছর, সে-শ্রমই পক্ককেশের জন্যে দায়ী। পক্ককেশ মিথ্যার একটি প্রলেপ মাত্র। এ কথা ঠিক যে, যারা তাঁর বয়সের কথা জানে না এবং চুলের অকালপক্বতার খোঁজ রাখে না, তারা তাঁকে বৃদ্ধ বলেই
-
সে দিন রাত্রে মা আমাদের দোকানে গিয়েছিল আর ফিরে আসেনি। কখনো না। কি হয়েছিল? জানি না। আমার বাবাও একদিন চলে গিয়েছিল, কখনো আর ফিরে আসেনি; কিন্তু বাবা তো গিয়েছিল যুদ্ধে, লড়াই করতে। আমরাও তো যুদ্ধের মধ্যেই ছিলাম, কিন্তু আমরা তো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, আমরা ছিলাম আমাদের দিদিমা আর দাদুর মতোই, আমাদের বন্দুক পিস্তল ছিল না। আমাদের বাবা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, আমাদের সরকার তাদের বলতো—ডাকাত—তারা চারিদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল আর আমরা কুকুর খেদানো মুরগির মতো তাদের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম। কোথায় যে পালাবো তা জানতাম না। আমাদের মা দোকানে গিয়েছিল, কে যেন তাকে বলেছিল রান্নার তেল পাওয়া যাবে। আমরাও খুশি হয়েছিলাম
-
বন্যার জল নেমে গেলে নদীর পাশের গরিব মানুষদের আবার গোড়ার থেকে জীবন যাত্রা শুরু করতে হয়।
অবশেষে বন্যার জল নেমে গেল। কর্দমাক্ত মাঠগুলোর মধ্যে দিয়ে একটু করে সরু রশিতে বাঁধা শ্রান্ত একটা গাইকে টেনে নিয়ে চলেছে কৃষ্ণাঙ্গ এক বাপ, কৃষ্ণাঙ্গ এক মা, আর কৃষ্ণাঙ্গ এক শিশু। একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে তারা কাঁধের ওপরের পোঁটলাপুটলিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে রাখলো। যতদূর দৃষ্টি যায় চারিপাশের জমি বন্যার জলে বয়ে আসা পলিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ছোট মেয়েটি শীর্ণ একটা আঙুল তুলে কর্দমাক্ত এক কুটিরের দিকে দেখালো।
“বাবা দেখো। ওই তো আমাদের বাড়ি, তাই না?” আনত কাঁধ, নীল রঙের জীর্ণ ওভার অল (একত্রে সংযুক্ত সার্ট
-
ম্যাকের সঙ্গে আমার দেখা হয় মেক্সিকোয়—চিহুয়াহুয়া সিটিতে—নববর্ষের পূর্ব সন্ধ্যায়। সে ছিল স্বদেশের এক ঝলক বাতাস, অমার্জিত এক আমেরিকান। আমার মনে পড়ে চী-লীতে একপাত্র টম-আর-জেরির (Tom and Jerry—সুরাসারযুক্ত পানীয় বিশেষ) জন্য হোটেল থেকে আমরা যখন হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসেছিলাম তখন প্রাচীন ক্যাথিড্রালে মধ্যরাত্রের মাস (Mass)[১]-এর জন্য ফাটা ঘন্টাগুলো উন্মত্তের মতো বাজছিল। আমাদের মাথার ঊর্ধ্বে তপ্ত মরুভূমির তারার দল। সারা শহর জুড়ে কুয়ারটেলগুলো (Cuartels—শিবিরগুলো), যেখানে ভিলার (Villa)[২]সেনাবাহিনী সন্নিবেশিত ছিল সেখান থেকে, নিরাবরণ পাহাড়গুলোর ওপরের সুদূর ছাউনিগুলো থেকে রাস্তাগুলোর রক্ষীদের কাছ থেকে পরম উল্লসিত গুলির শব্দ আসছিল। প্রমত্ত এক অফিসার আমাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফিয়েস্তাকে (Fiesta—উৎসব) ভুল করে
-
আরচিল ঘুমোতে পারলো না...। সে হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ছাদের দিকে ক্লান্তভাবে তাকিয়ে চিৎ হয়ে শুচ্ছিলো, নয় তো উপুড় হয়ে শুয়ে বালিশের মধ্যে তার উত্তপ্ত মুখখানা গুঁজছিলো। চোখ বুজলেই চোখের সামনে ভাসছিলো কেতিনোর পাণ্ডুর মুখখানা। তুষার-ধবল বালিশের গায়ে তার কুচকুচে কালো চুল যেন আরও কালো লাগছিল। তার কালো কালো চোখ দুটো আঁখিপল্লবে ঢাকা, তার ঠোঁট দুটি কাঁপছিল, যেন সে ফিস ফিস করে কিছু বলছে।
আরচিল উঠে বসলো, চোখ খুলে যে ভয়ঙ্কর স্বপ্নগুলো তার চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছে তাদের মন থেকে তাড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলো।
উদ্বিগ্ন এক মা তার অসুস্থ কন্যার শয্যার উপর ঝুঁকে পড়েছে। নিদ্রাহীন রাতগুলোর পর ক্লান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই
-
[জনৈক রাশিয়ান বীর কিশোরীর মর্মস্পর্শী কাহিনী]
১৯৪১ সাল। ডিসেম্বর মাসের শুরু। জার্মানেরা পেট্রিশ্চেভ অঞ্চলের ভেরিয়া শহরের নিকট একজন সৈনিকের প্রাণদণ্ড দিলো। সে ছিলো একজন আঠারো বছরের তরুণী।
তরুণীটি কে? কোথেকে সে এসেছিলো? পেট্রিশ্চেভের এ শোকাবহ ঘটনা ঘটাবার আগে ভেরিয়ার একজন সৈনিকের সঙ্গে তরুণীর সাক্ষাৎ হয়েছিলো। সৈন্যদের দ্বারা তৈরী একটি পরিখার ভেতর গোপনে তারা আশ্রয় নিয়েছিলো। তরুণী তার নাম বলেছিলো তানিয়া। তারপরে আর স্থানীয় সৈনিকেরা কেউ তাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু তারা জানতো, বেশী দূরে নয়, কাছাকাছি কোথাও দুঃসাহাসী এবং সুকৌশলী মেয়ে তানিয়া তাদের মতো সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
সে সময়ে মস্কো নগরীর চরমতম দুর্দিন ঘনিয়ে এসেছে।
১৬ই নভেম্বর আমাদের রাজধানীতে যে আক্রমণ
-
“ধরো ওকে! ওকে ধরো তোমরা!” চিৎকারে সবুজ পাহাড় আর ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত ঝোপে ঢাকা পর্বতে ঘেরা উপত্যকার মধ্যে আরামে গা ঘেঁষে থাকা পিরিচের আকারের গ্রামটার নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিল।
পাহাড়ের চূড়ো থেকে প্রতিধ্বনিগুলো মাঝ আকাশে ধাক্কা খেয়ে তালগোল পাকানো কলরবে ছিটকে পড়েছিল, গমগম সেই শব্দ আমাদের কানের মধ্যে বিঁধে গিয়ে অন্য সব শব্দ আটকে দিয়েছিল।
ওয়েহ ওয়েহ ওয়েহ খাউউ খাউউ লেহ লেহ লেহ লেহ তুউ তুউ তুউ এক মুহূর্ত আগেও যেসব ন্যাকড়ার পুতুল নিয়ে আমরা নির্বিষ্ট হয়ে ছিলাম একটা শক্তিশালী চুম্বকের মতো সোরগোলটা তার থেকে আমাদের টেনে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
ইইই-ইইই-উউ-উউউউউ!
এম এম বা-এম বিই ই ই হ হ হ-নি!
-
“ঠাকুমা! বলি ও ঠাকুমা!”
আনিসিয়া চোখ তুলে তাকালো। বেড়ার ও ধার থেকে নাতালকা তাকে ডাকছে।
“কি হলো?”
“এক মিনিটের জন্যে একটু ভেতরে আসতে পারি কি?”
“তোমার ভেতরে আসতে না পারার কোনো কারণ তো দেখছি না। আসতে চাও তো এসো!” আনিসিয়া অস্পষ্টভাবে বিড় বিড় করে তাব স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষতার সঙ্গে বললো।
আঃ, রৌদ্রটা আজ কি চমৎকার গরম! অবশেষে তার আড়ষ্ট বেদনা জর্জরিত হাড় পাঁজরাগুলো একটু উত্তাপ পাবে। জুলাইয়ের মঙ্গলময় করুণাময় সূর্য! শুধু যদি বৃষ্টি না পড়ে আর। শুধুমাত্র তার সম্ভাবনার কথাতেই আগের থেকেই তার দুশ্চিন্তা আরম্ভ হয়ে গেলো। বৃষ্টি—না, তার থেকে খারাপ আর কিছু নেই। সে সময় তার প্রত্যেকটি হাড়-পাঁজরা ব্যথা করে,
-
আকাশে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি উড়ছিল, সেগুলো তাড়াতাড়ি নেবে আসে। ব্যাটা ছেলেরা কাজ ভুলে আরাম ছেড়ে রাস্তায় বেরোয়, পর্দানশিন মেয়েরা দাঁড়ায় বেড়ার পেছনে পর্দার আড়ালে। ঔৎসুক্যের সীমা নাই যাদের তারা রাস্তার মোড়ে-চৌমাথায় জড়ো হয় এবং ন্যাংটা ছেলেরা বাঁদর-নাচ হবে মনে করে তারস্বরে চিৎকার করে দিগ্বিদিগশূন্য ছুটতে শুরু করে।
সারা শহরে খবর পৌঁছে গেছে।
খবরটা অতিশয় বিচিত্র।
সেটি এই যে, বৃদ্ধ সদরউদ্দিন একটি অত্যাশ্চর্য অন্তিমখেয়াল পূর্ণ করতে পথে নেবেছে। খাড়া নাকে কড়া রোদ, গর্তে ঢোকা চোখে ঘোলাটে অন্ধকার এবং লম্বা শীর্ণ হাড়সার পায়ে কাঠ কাঠ ভাব, শহরের অলিগলি দিয়ে হেঁটে হেঁটে সে বন্ধু-শত্রুর সন্ধান করে। মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে মানুষের যখন মৃত্যু ছাড়া অন্য
-
মতিনউদ্দিন মেদমাংসশূন্য ক্ষীণ কাঠামোর ক্ষুদ্র আকৃতির মানুষ। ক্ষিপ্রবেগে চলার অভ্যাস সত্ত্বেও পথেঘাটে সে সহজে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। বাচালতা দোষ নাই বলে অন্যদের মতো অজস্র কথায় সৃষ্ট একটি স্পর্শনীয় দৃশ্যমান চরিত্রও তার নয়। আপিসে দীর্ঘ বারান্দা-ঘরের সহযোগীদের মতো রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যাপারে তার মতামত থাকলেও ক্বচিৎই তা সে প্রকাশ করে। কেবল চাল-ডালের দামের কথা উঠলে সে একটি বিশেষ মন্তব্য না করে যেন পারে না। একই ভঙ্গিতে একই স্বরে সে প্রতিবার বলে, শায়েস্তা খানের আমলে এক মন চাল পাওয়া যেত মাত্র দু-আনায়। উক্তিটা সত্য হলেও তা এখন সময়- কালবহির্গত এবং বাস্তব হতে এত দূরস্থিত শোনায় যে তার সে ঐতিহাসিক মন্তব্যটি শূন্যে ঝুলে
-
কারিগর গ্রিগরী পেত্রোভ, একজন অত্যুৎকৃষ্ট শিল্পকারী এবং একজন পাকা মদ্যপ ও নিষ্কর্মা বলে সারা গালচিনো জেলায় যার সুপ্রতিষ্ঠিত খ্যাতি, তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে চলেছে জেমস্তভো হাসপাতালে। তাকে যেতে হবে ৩০ ভেস্ত (দৈর্ঘ্যের রুশীয়মাপ ১/৩ মাইল) আর পথ খুবই ভয়াবহ; এমন কি ডাক হরকরার পক্ষেও পেরে ওঠা ভার, সেখানে কারিকর গ্রিগরীর মতো একজন অলস মানুষের কথা না বলাই ভালো। একটা কনকনে তীব্র বাতাস তার মুখে এসে লাগছিল। তুষারকণাগুলো বিরাট বিরাট মেঘের আকারে ঘুরপাক খাচ্ছিল, আকাশ থেকে তৃষার পড়ছে না মাটি থেকে উঠছে তা বোঝা কঠিন হচ্ছিল। তুষারের জন্য মাঠ-ঘাট, টেলিগ্রাফের পোষ্টগুলো কিংবা বনবাদাড়ও দেখা যাচ্ছিল না, আর বিশেষ করে যখন দমকা
-
ঐ আসছে ওরা! সুবিন্যস্তভাবে সারিবদ্ধ হয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে—একটা, আর একটা, তৃতীয়টা—তাদের গায়ে বিড়ালের চোখের মতো সাদা বৃত্ত আর তার মাঝখানে কালো ক্রুশ চিহ্ন আঁকা। পিওতর ফিলিপোভিচ-এর পিছনে দাঁড়িয়ে, প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা নিজের গায়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলো। ঘড় ঘড় শব্দে ট্যাঙ্কগুলি এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পিওতর ফিলিপোভিচ লাফ দিয়ে জানালার ধারের বেঞ্চির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে, জানলার কাঁচের গায়ে মুখ লাগালো ভালো করে দেখবে বলে।
প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা তার সর্বাঙ্গে ক্রুশ চিহ্ন আঁকার পর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার তারের মতো কড়া খসখসে দাড়ির মধ্যে প্রায় দন্তহীন একটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো।
গ্রামের কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে ট্যাঙ্কগুলোর পিছু পিছু সারিবদ্ধভাবে আসছিল বিরাট ট্রাকে জোড়া
ক্যাটাগরি
লেখক
- অ্যাগনেস স্মেডলি (১)
- আন্তন চেখভ (১)
- আমা আতা আইদু (১)
- আলেক্সেই তলস্তয় (১)
- ইভোন ভেরা (১)
- এলবার্ট মালজ (১)
- ওয়ান্ডা ওয়াসিলেস্কা (১)
- কনস্তানতিন লর্তকিপানিৎজে (১)
- ক্যাথারিন সুসানাহ প্রিচার্ড (১)
- গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১)
- গিয়োরগি শাটবেরাশভিলি (১)
- জন রিড (১)
- নাডিন গর্ডিমার (৩)
- পাভেল লিডভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ভ্যালেনটিনা ডিমিট্রিয়েভা (১)
- মাও টুন (১)
- মিখাইল শলোখভ (২)
- ম্যাক্সিম গোর্কি (২)
- রিচার্ড রাইট (১)
- লুইজি পিরানদেল্লো (১)
- সিনডিউই ম্যাগোনা (১)
- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (৯)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.