একটি অসাধারণ কাহিনী
ঐ আসছে ওরা! সুবিন্যস্তভাবে সারিবদ্ধ হয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে—একটা, আর একটা, তৃতীয়টা—তাদের গায়ে বিড়ালের চোখের মতো সাদা বৃত্ত আর তার মাঝখানে কালো ক্রুশ চিহ্ন আঁকা। পিওতর ফিলিপোভিচ-এর পিছনে দাঁড়িয়ে, প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা নিজের গায়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলো। ঘড় ঘড় শব্দে ট্যাঙ্কগুলি এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পিওতর ফিলিপোভিচ লাফ দিয়ে জানালার ধারের বেঞ্চির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে, জানলার কাঁচের গায়ে মুখ লাগালো ভালো করে দেখবে বলে।
প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা তার সর্বাঙ্গে ক্রুশ চিহ্ন আঁকার পর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার তারের মতো কড়া খসখসে দাড়ির মধ্যে প্রায় দন্তহীন একটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো।
গ্রামের কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে ট্যাঙ্কগুলোর পিছু পিছু সারিবদ্ধভাবে আসছিল বিরাট ট্রাকে জোড়া জোড়া বেঞ্চিতে বসা সৈনিকের দল। তাদের ভারী ভারী হেলমেটগুলোর (শিরস্ত্রাণ) তলা থেকে জার্মানরা ‘শূন্য’ দৃষ্টিতে ধূসর বৃষ্টির দিকে তাকিয়েছিল, তাদের মুখগুলো সব ধূসর প্রাণহীন আর মলিন।
পার হয়ে যাওয়ার সারিটার শব্দ মিলিয়ে গেলে তখন আবার বাজের শব্দ শোনা যেতে লাগলো। পিওতর ফিলিপোভিচ জানলার দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখগুলো হাসিতে কুঞ্চিত, আর সঙ্কুচিত চোখের পাতার মধ্যে বহুকষ্টে দেখা চোখদুটোর কেমন অদ্ভুত একটা দ্বীপ্তি। প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা বললো:
“হা ভগবান, কি সাংঘাতিক! এইবার, পিওতর ফিলিপোভিচ, আমরা হয়তো হোমরা চোমরা একটা কিছু হবো?” ও কোনো উত্তর দিলো না। বসে বসে টেবিলের ওপর নখ নিয়ে টোকা মারতে লাগলো—ছোটখাটো মানুষটি, প্রশস্ত নাসারন্ধ্র আর পাতলা লাল চুল। তাদের বাড়ির সম্বন্ধে কিছু বলতে পারলে প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা খুশি হতো কিন্তু ভীরুতা তার মুখ বন্ধ করে দিলো। বরাবর সে তার স্বামীকে ভয় করে এসেছে, ১৯১৪ সালে তাকে তার দুস্থ পরিবার থেকে নিয়ে আসা হয় তার বিত্তশালী, স্বামীর প্রার্থনাদির পুরাতন অনুষ্ঠান পদ্ধতিতে বিশ্বাসী১ পরিবারে।
পুরাতন অনুষ্ঠান পদ্ধতিতে বিশ্বাসী রুশীয় ধর্মীয় এক সম্প্রদায়—ধর্মগুরু নিকন-এর প্রার্থনাদির অনুষ্ঠান পদ্ধতির সংশোধনের প্রতিবাদে সপ্তদশ শতাব্দীতে এই সম্প্রদায়ের উৎপত্তি পরিবারে, সেই দিন থেকে। বছরগুলোর সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল সে যেন এটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সেবার সেই বসন্তকালে, দশ বছরের দণ্ড ভোগ করে পিওতর ফিলিপোভিচ যখন ফিরে এলো, তখন থেকে সে আবার তাকে ভয় করতে আরম্ভ করলো। কিন্তু কেন যে তা সে নিজেই বলতে পারতো না। স্বামী তাকে মারধর বা গালমন্দ করতো না—কিন্তু সে যাই করুক না কেন স্বামী তাকে বিদ্রুপ করতো আর সব সময় হেঁয়ালি করে কথা বলতো। আগে ঐ বাড়িতে কেউ কখনো কোনো বই পড়তো না, কিন্তু এখন তার স্বামী গ্রামের লাইব্রেরী থেকে খবরের কাগজ নিয়ে আসে আর রাত্রে বই পড়বার জন্য কেরোসিন পোড়ায়। এই জন্য উত্তরাঞ্চল থেকে চশমা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল।
প্রাসকোভাইয়া তার মনের কথা না বলেই রাতের খাবার তৈরি করতে লেগে গেলো; খানিকটা বাঁধাকপি আর পেঁয়াজ কুচিয়ে কিছুটা জলো কভাস (রাঈ শস্যের দানা পচিয়ে তৈরি অম্লস্বাদের পানীয়) ঢাললে তারপর অপ্রসন্নভাবে তার ছেলে-মেয়েকে ডাক দিলো। তাদের রাতের খাবারের সঙ্গে তারা ছাতাধরা সেঁকা রুটির টুকরো খেলো: শস্যের দানা, ময়দা জড়ানো হাঁসের আর শূকরের মাংস, পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হবার জন্য জার্মানদের চোখের অন্তরালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। নিজের চামচটা তুলে নেবার আগে পিওতর ফিলিপোভিচ তার জামার হাতার মধ্যে থেকে হাত দুটো বার করে কনুইয়ের কাছ থেকে বেঁকিয়ে নিজের চুলে বিলি কাটতে লাগলো—ওর বাপের অভ্যাস ছিল এটা। সে তার হাত দুটো বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা মহিলাসুলভ অসঙ্গতির সঙ্গে বলে উঠলো: “ওরা গ্রাম সোভিয়েত-এর সাইন বোর্ডটা খুলে ফেলে দিয়েছে; এবার ওদের উচিত আমাদের বাড়িটা ফিরিয়ে দেওয়া।”
নিজের চামচটা নামিয়ে রেখে এপ্রনের খুঁটে চোখের জল মুছে প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা, শততম
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments