বন্যার পরে
বন্যার জল নেমে গেলে নদীর পাশের গরিব মানুষদের আবার গোড়ার থেকে জীবন যাত্রা শুরু করতে হয়।
অবশেষে বন্যার জল নেমে গেল। কর্দমাক্ত মাঠগুলোর মধ্যে দিয়ে একটু করে সরু রশিতে বাঁধা শ্রান্ত একটা গাইকে টেনে নিয়ে চলেছে কৃষ্ণাঙ্গ এক বাপ, কৃষ্ণাঙ্গ এক মা, আর কৃষ্ণাঙ্গ এক শিশু। একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে তারা কাঁধের ওপরের পোঁটলাপুটলিগুলো একটু নাড়াচাড়া করে রাখলো। যতদূর দৃষ্টি যায় চারিপাশের জমি বন্যার জলে বয়ে আসা পলিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে। ছোট মেয়েটি শীর্ণ একটা আঙুল তুলে কর্দমাক্ত এক কুটিরের দিকে দেখালো।
“বাবা দেখো। ওই তো আমাদের বাড়ি, তাই না?” আনত কাঁধ, নীল রঙের জীর্ণ ওভার অল (একত্রে সংযুক্ত সার্ট ও ট্রাউজার) পরনে লোকটি বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। শরীরের একটা পেশিও তার নড়লো না, প্রায় ঠোঁট না নেড়েই সে বললো: “হ্যাঁ”।
মিনিট পাঁচেক তারা নির্বাক নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। এখানে বন্যার জল আট ফুটের বেশি উঠেছিল। প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঘাসের ডগা আর প্রতিটি ফুটোর গায়ে লেগে রয়েছে বন্যার চিহ্ন; হলুদ রঙের কাদা। জমির গায়ে লেপটে রয়েছে কাদা, সেই জমাট বাঁধা কাদার মাঝে মাঝে ইতঃস্ততভাবে মাকড়সার জালের মতো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফাটল ধরেছে। রিক্ত মাঠগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে এলো বসন্তের ঝোড়ো বাতাস। ঊর্ধ্বে আকাশ, নীলবরণ, সাদা মেঘ আর রৌদ্রে ভরা। এসব কিছুকে আচ্ছন্ন করেছে প্রথম দিনের অপরিচয়।
“মুরগির খাঁচাটা গেছে”, নিঃশ্বাস ফেলে বললো মেয়েটি।
“শুয়োরের খোঁয়াড়টাও গেছে”, নিঃশ্বাস ফেলে বললো লোকটি। তাদের কথার মধ্যে কোনো তিক্ততা ছিল না।
“মনে হয় মুরগিগুলোও সব ডুবে মরেছে।”
“তাই হবে।”
“মিস ফ্লোরার বাড়িও ভেসে গেছে”, ছোট্ট মেয়েটি বলে উঠলো।
তাদের প্রতিবেশীর বাড়িটা যে জায়গায় ছিল সেইখানের কতকগুলো গাছের দিকে তাকালো তারা।
“হায় ভগবান!”
“ওরা যে কোথায় তা কি কেউ জানে বলে তোমার মনে হয়?”
“সে কথা বলা শক্ত।”
পুরুষটি টিলার ঢাল বেয়ে নেমে গিয়ে অনিশ্চিতভাবে দাঁড়িয়ে পড়লো।
“এখানে কোথায় যেন একটা রাস্তা ছিল না”, সে বললো।
এখন আর সেখানে কোনো রাস্তা ছিল না। ছিল শুধু হলুদ রঙের খাঁজ কাটা কাটা পলিমাটিতে ঢাকা বিস্তীর্ণ এলাকা।
“টম, দেখো!” মেয়েটি ডাক দিয়ে বললো। “আমাদের ফটকের খানিকটা এখানে পড়ে আছে।”
ফটকের খুঁটিটার অর্ধেকটা মাটির মধ্যে গাঁথা। মরচে কব্জা একটা একক আঙুলের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেটা উপড়ে নিয়ে টম নিজের হাতের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরলো। ওটাকে কাজে লাগাবার বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না; ওটাকে শুধু শক্ত করে ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। শেষ পর্যন্ত কব্জাটা ফেলে দিয়ে মুখ তুলে সে বললো, “চলে এসো। ওখানে একবার নেমে গিয়ে দেখি কি করতে পারা যায়।”
একটু নিচু জায়গায় তৈরি বলে কুটিরের চারপাশের জমি বেশ নরম আর পিছলা হয়েছিল।
“চুনের বস্তাটা একবার দাও তো, মে”, ও বলেলো।
জুতোর মধ্যে তার কাদা ঢুকেছিল, তাই নিয়েই সে তার মোটামোটা আঙুলগুলো দিয়ে কুটিরের চর্তুদিকে সাদা চুন ছড়াতে ছড়াতে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললো। চর্তুদিকে ঘুরে আবার সামনে এলো যখন তখন বস্তার মধ্যে চুনের খুব সামান্য অংশই অবশিষ্ট রয়েছে; বারান্দার ওপর বস্তাটা রেখে দিলো, চুণের ভাসমান সুক্ষ্ম কণাগুলো সূর্যের আলোয় চিকচিক করছিল।
“এতে খানিকটা সুবিধা হতে পারে”, টম বললো।
“স্যাল, তুই একটু সাবধান হ’ বাছা।” সে বললো।
“ঐ কাদার মধ্যে আবার যেন আছাড় খেয়ে পড়িস না, কথাটা কানে গেল কি?”
“হ্যাঁ, মা।”
সিঁড়ির ধাপগুলো নেই। মে আর স্যালিকে টম বারান্দার ওপর তুলে দিলো। কুটিরের আধখোলা দরজার দিকে তাকিয়ে ওরা এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালো। কুটির ছেড়ে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments