-
“ঠাকুমা! বলি ও ঠাকুমা!”
আনিসিয়া চোখ তুলে তাকালো। বেড়ার ও ধার থেকে নাতালকা তাকে ডাকছে।
“কি হলো?”
“এক মিনিটের জন্যে একটু ভেতরে আসতে পারি কি?”
“তোমার ভেতরে আসতে না পারার কোনো কারণ তো দেখছি না। আসতে চাও তো এসো!” আনিসিয়া অস্পষ্টভাবে বিড় বিড় করে তাব স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষতার সঙ্গে বললো।
আঃ, রৌদ্রটা আজ কি চমৎকার গরম! অবশেষে তার আড়ষ্ট বেদনা জর্জরিত হাড় পাঁজরাগুলো একটু উত্তাপ পাবে। জুলাইয়ের মঙ্গলময় করুণাময় সূর্য! শুধু যদি বৃষ্টি না পড়ে আর। শুধুমাত্র তার সম্ভাবনার কথাতেই আগের থেকেই তার দুশ্চিন্তা আরম্ভ হয়ে গেলো। বৃষ্টি—না, তার থেকে খারাপ আর কিছু নেই। সে সময় তার প্রত্যেকটি হাড়-পাঁজরা ব্যথা করে,
-
লেখক: আন দাক
বা আর তার স্ত্রী অনেক রাত পর্যন্ত জেগে বসে রযেছে। বা র বয়স প্রায় চল্লিশ, তার স্ত্রী তার থেকে বছর দুই তিনেক ছোট হবে। একটা খুঁটির গায়ে ঠেস দিয়ে মাদুরের ওপর পা ছড়িয়ে বসে ছিল সে। অনেকক্ষণ তারা চুপচাপই ছিল হঠাৎ মুঠি পাকিয়ে মাটিতে সজোরে একটা ঘুষি মারলো সে।
“আমি এটাই ঠিক করেছি।”
ওর স্ত্রী কিছু বললো না কিন্তু চোখ দুটো তার জলে ভরে গেলো। মুখটা তার করুণ লাগছিল। মাঝে মাঝে পাহারা দেবার উঁচু বুরুজ থেকে ছোঁড়া রাইফেলের এক আধটা গুলির আওয়াজ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছিল। “যুদ্ধ পরিচালনার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছোট একটা গ্রামে” এতো নিত্যকার ঘটনা।
-
হোঁচট খেতে খেতে, টলতে টলতে বুড়ো লোকটি বালির রাস্তায় বেয়ে উঠছিল। সরু সরু আগাছা আর ঝোপে ঢাকা নিচু একটা টিলার গা বেয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে রাস্তাটা।
কাছে পিঠের শহরতলি থেকে কাজের শেষে ফেরার মুখে মেরি তাকে পার হয়ে এলো। পিছন থেকে বুড়ো লোকটির ডাকে মেরি থমকে দাঁড়ালো, সে কোন রকমে টলতে টলতে মেরির দিকে এগিয়ে এলো। ছেঁড়া জুতোর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা, রাঙাধুলোর পুরু প্রলেপ মাখা ফাটা ফাটা আঙুলগুলো মেরিকে বলে দিলো লোকটি আসছে বহু দূর থেকে।
“এন’ গুলা!” লোকটি চেঁচিয়ে উঠলো। “হ্যাঁ গো মা, ‘নেটিভ ক্যাম্পে (আদিবাসী শিবির) এন’ গুলা বলে কোনো মেয়ে আছে কিনা জানো?”
“কস্মিন কালে
-
রাস্তার ধারে ধুলোভারাচ্ছন্ন বৈঠকখানায় বসে খানবাহাদুর মোত্তালেব সাহেব ভাবেন। ভাবেন যে সে-কথা তাঁর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চোখের নিচে মাংসের থলে। বড় গোছের চোখ দুটো তার মধ্যে ভারি দেখায়। অনেকটা মার্বেলের মতো। তাও ড্রেনের কোণে হারিয়ে যাওয়া নিশ্চল মার্বেল।
তিনি তাঁর বয়সের কথা ভাবেন। তাঁর সমগ্র মাথায় আজ পক্ককেশ, কিন্তু তার জন্যে বয়সকে দোষ দেওয়া যায় না। বিস্তারিত ওকালতি ব্যবসা সৃষ্টি করবার জন্যে যে কঠোর শ্রম করেছেন বছরের পর বছর, সে-শ্রমই পক্ককেশের জন্যে দায়ী। পক্ককেশ মিথ্যার একটি প্রলেপ মাত্র। এ কথা ঠিক যে, যারা তাঁর বয়সের কথা জানে না এবং চুলের অকালপক্বতার খোঁজ রাখে না, তারা তাঁকে বৃদ্ধ বলেই
-
ধনুকের মতো বাঁকা কংক্রিটের পুলটির পরেই বাড়িটা। দোতলা, উঁচু এবং প্রকাণ্ড বাড়ি। তবে রাস্তা থেকেই সরাসরি দণ্ডায়মান। এদেশে ফুটপাত নাই বলে বাড়িটারও একটু জমি ছাড়ার ভদ্রতার বালাই নাই। তবে সেটা কিন্তু বাইরের চেহারা। কারণ, পেছনে অনেক জায়গা। প্রথমত প্রশস্ত উঠান। তারপর পায়খানা-গোসলখানার পরে আম-জাম-কাঁঠালগাছে ভরা জঙ্গলের মতো জায়গা। সেখানে কড়া সূর্যালোকেও সূর্যাস্তের ম্লান অন্ধকার এবং আগাছা আবৃত মাটিতে ভাপসা গন্ধ।
অত জায়গা যখন তখন সামনে কিছু ছেড়ে একটা বাগান করলে কী দোষ হত?
সে-কথাই এরা ভাবে। বিশেষ করে মতিন। তার বাগানের বড় শখ, যদিও আজ পর্যন্ত তা কল্পনাতেই পুষ্পিত হয়েছে। সে ভাবে, একটু জমি পেলে সে নিজেই বাগানের মতো করে
-
দিগন্ত থেকে বিচিত্রভাবে রাত এসে ধানক্ষেতের ওপর, সমগ্র নদীর ওপর ছড়িয়ে পড়ে।
ওরা দু-জন নৌকাতে বসেছিল। সেখানে বসেই তারা রাত্রির সঞ্চার দেখে: আস্তে-আস্তে নদীর মতোই অতল হয়ে ওঠে অন্ধকার, যে-অন্ধকারে পৃথিবী তলিয়ে যায়; তারপর দিগন্তের কাছাকাছি একটি-দুটি তারা জেগে ওঠে। অন্ধকার ঘনীভূত হলে তারা সে অন্ধকারে গা-ডুবিয়ে বসে থাকে। তাদের মনে হয়, একবার নয় বারবারই যেন নিঃশব্দ কালো স্রোতের মতো রাতটি আসে, যেন তীরে তরঙ্গ ভেঙে পড়ে বারবার।
অবশ্য তা সম্ভব নয়। তরঙ্গ বারবার ফিরে আসে, রাত আসে একবারই।
তারা বোঝে, আরেকটি দিন শেষ হয়েছে। বনপ্রান্তর নদী-মাঠ-ঘাট ছেয়ে রাত নেবেছে, সূর্য অস্ত গেছে। কেবল অন্যদিনের মতো হাটখোলার পাশে নোঙর-করা নৌকায়
-
সেবার গ্রীষ্মের ছুটিতে সেলিনারা দাদার বাড়িতে বেড়াতে আসার দু-দিন পরেই গ্রামে একটি শোচনীয় হত্যাকাণ্ড ঘটে। সন্ধ্যার প্রাক্কালে দাদাসাহেবেরই প্রজা তারা মিঞা তার ছোটভাই সোনা মিঞাকে কোঁচবিদ্ধ করে খুন করে। নির্মম ঘটনাটি তুচ্ছ একটি দু-আনা পয়সা নিয়ে ঘটে।
খবর পেয়ে দাদাসাহেব যখন সদলবলে তারা মিঞার বাড়িতে উপস্থিত হন তখন নয় বছরের মেয়ে সেলিনাও যে তাঁর পশ্চাদানুসরণ করে তা তিনি লক্ষ্য করেন না। তারপর এক সময়ে লণ্ঠনের আলোয় লেপাজোকা পরিচ্ছন্ন উঠানে গরু-বাঁধার খুঁটির পাশে পড়ে থাকা চৌকোণা দু-আনার মুদ্রাটি দেখতে পেয়ে সেলিনা তীক্ষ্ণকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলে তিনি তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সজ্ঞান হন। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। উঠানে রক্তস্রোতের মধ্যে
-
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় ক্যানভাসের ডেকচেয়ারে বসলে পায়ের সামনে আবদুল ঝুঁকে পড়ে তার জুতা-মোজা খোলে। ভৃত্যের এ সেবায় আফসারউদ্দিন যে আনন্দ বোধ করে, তা নয়। বরঞ্চ জুতা বাড়াতে গিয়ে প্রতিদিন কেমন জড়তা বোধ করে, তার পা-দুটি পাথরের মতো ভারি হয়ে ওঠে। সে আশা করেছিল নিত্যকার এ-সাহেবিয়ানা অনুষ্ঠানে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, কিন্তু এখনো হয় নাই। ভাবে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটাবে। তা-ও হয়ে ওঠে না।
আজও চাকরটি তার পাথরের মতো ভারি পা-দুটি থেকে প্রথমে জুতা খোলে, তারপর মোজা। অন্য দিনের মতো আজও আফসারউদ্দিনের দৃষ্টি পড়শীর বাড়ির ছাদে নতুন করে চুন-দেয়া সিঁড়িঘরে নিবদ্ধ হলেও তার সমগ্র সত্তা ব্যস্ত-সমস্ত চাকরটি সম্বন্ধে
-
আকাশে রঙ-বেরঙের ঘুড়ি উড়ছিল, সেগুলো তাড়াতাড়ি নেবে আসে। ব্যাটা ছেলেরা কাজ ভুলে আরাম ছেড়ে রাস্তায় বেরোয়, পর্দানশিন মেয়েরা দাঁড়ায় বেড়ার পেছনে পর্দার আড়ালে। ঔৎসুক্যের সীমা নাই যাদের তারা রাস্তার মোড়ে-চৌমাথায় জড়ো হয় এবং ন্যাংটা ছেলেরা বাঁদর-নাচ হবে মনে করে তারস্বরে চিৎকার করে দিগ্বিদিগশূন্য ছুটতে শুরু করে।
সারা শহরে খবর পৌঁছে গেছে।
খবরটা অতিশয় বিচিত্র।
সেটি এই যে, বৃদ্ধ সদরউদ্দিন একটি অত্যাশ্চর্য অন্তিমখেয়াল পূর্ণ করতে পথে নেবেছে। খাড়া নাকে কড়া রোদ, গর্তে ঢোকা চোখে ঘোলাটে অন্ধকার এবং লম্বা শীর্ণ হাড়সার পায়ে কাঠ কাঠ ভাব, শহরের অলিগলি দিয়ে হেঁটে হেঁটে সে বন্ধু-শত্রুর সন্ধান করে। মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে মানুষের যখন মৃত্যু ছাড়া অন্য
-
মতিনউদ্দিন মেদমাংসশূন্য ক্ষীণ কাঠামোর ক্ষুদ্র আকৃতির মানুষ। ক্ষিপ্রবেগে চলার অভ্যাস সত্ত্বেও পথেঘাটে সে সহজে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। বাচালতা দোষ নাই বলে অন্যদের মতো অজস্র কথায় সৃষ্ট একটি স্পর্শনীয় দৃশ্যমান চরিত্রও তার নয়। আপিসে দীর্ঘ বারান্দা-ঘরের সহযোগীদের মতো রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যাপারে তার মতামত থাকলেও ক্বচিৎই তা সে প্রকাশ করে। কেবল চাল-ডালের দামের কথা উঠলে সে একটি বিশেষ মন্তব্য না করে যেন পারে না। একই ভঙ্গিতে একই স্বরে সে প্রতিবার বলে, শায়েস্তা খানের আমলে এক মন চাল পাওয়া যেত মাত্র দু-আনায়। উক্তিটা সত্য হলেও তা এখন সময়- কালবহির্গত এবং বাস্তব হতে এত দূরস্থিত শোনায় যে তার সে ঐতিহাসিক মন্তব্যটি শূন্যে ঝুলে
-
মুখভাঙা কলের পাশ দিয়ে বেরিয়ে পিচ-ক্ষয়ে-আসা কঙ্করজর্জরিত পথটা ধরে মিনিট সাতেক হাঁটলেই ইস্কুল। ফিকে কমলা রঙের তাঁতের এবং সবুজ পাড়ের মিলের জীর্ণ শাড়ি দুটি অদল-বদল করে পরে মালেকা আজ ছ-মাস যাবৎ এ-পথে আসা-যাওয়া করছে। প্রথমে পথটা অতিক্রম করতে তার মনে হত অখণ্ড একটা ঘণ্টাই বুঝি কাবার হয়ে গেল। তখন তার পা-দুটো কেমন জড়িয়ে থাকত। খোলা আকাশের তলে উন্মুক্ত রাস্তায় নাবতেই লজ্জাজনিত যে-নিদারুণ জড়তায় সে অভিভূত হয়ে পড়ত, সে-জড়তার জন্যে প্রতি পদক্ষেপই অতিশয় দীর্ঘ মনে হত। ইস্কুলের চাকরিটা নেবার আগে সে কখনো এমন একাকী হাঁটে নাই।
অবশ্য অভ্যস্ত হতে সময় লাগে না, পথের সঙ্গে পরিচয় হতেও দেরি হয় না। তারপর সে
-
আবু তালেব মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দিন সাহেব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মাঝে-মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ করাটা পারিবারিক ফরজ হিসেবেই দেখেন। যতদিন দুনিয়াদারির কাজে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন ততদিন সে-কর্তব্যটি ইচ্ছানুযায়ী পালন করতে পারেন নি। আজ তাঁর দায়িত্বের ভার অপেক্ষাকৃতভাবে লঘু হয়েছে বলে সে-কর্তব্য পালনে বাধাবিপত্তিও কমেছে।
সালাহ্উদ্দিন সাহেব যখন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যান তখন তার পূর্ব-আয়োজনটি রীতিমতো সফরের আয়োজনের মতোই মনে হয়। বিনা খবরে ঝট্ করে কারো বাড়িতে তিনি উপস্থিত হন না। দেখা করতে আসবেন বলে আগাম খবর পাঠান দিনকয়েক আগে। সময় প্রহর জানান, সঙ্গে-সঙ্গে এ-কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, তিনি চা-মিষ্টি কিছুই গ্রহণ করেন না, পান-দোক্তা তামাকের অভ্যাসও তাঁর নেই। তাছাড়া ডাক্তারের কড়া নির্দেশে পথ্য
ক্যাটাগরি
লেখক
- অ্যাগনেস স্মেডলি (১)
- আন্তন চেখভ (১)
- আমা আতা আইদু (১)
- আলেক্সেই তলস্তয় (১)
- ইভোন ভেরা (১)
- এলবার্ট মালজ (১)
- ওয়ান্ডা ওয়াসিলেস্কা (১)
- কনস্তানতিন লর্তকিপানিৎজে (১)
- ক্যাথারিন সুসানাহ প্রিচার্ড (১)
- গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১)
- গিয়োরগি শাটবেরাশভিলি (১)
- জন রিড (১)
- নাডিন গর্ডিমার (৩)
- পাভেল লিডভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ভ্যালেনটিনা ডিমিট্রিয়েভা (১)
- মাও টুন (১)
- মিখাইল শলোখভ (২)
- ম্যাক্সিম গোর্কি (২)
- রিচার্ড রাইট (১)
- লুইজি পিরানদেল্লো (১)
- সিনডিউই ম্যাগোনা (১)
- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (৯)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.