কুটিরে
“ঠাকুমা! বলি ও ঠাকুমা!”
আনিসিয়া চোখ তুলে তাকালো। বেড়ার ও ধার থেকে নাতালকা তাকে ডাকছে।
“কি হলো?”
“এক মিনিটের জন্যে একটু ভেতরে আসতে পারি কি?”
“তোমার ভেতরে আসতে না পারার কোনো কারণ তো দেখছি না। আসতে চাও তো এসো!” আনিসিয়া অস্পষ্টভাবে বিড় বিড় করে তাব স্বভাবসিদ্ধ রুক্ষতার সঙ্গে বললো।
আঃ, রৌদ্রটা আজ কি চমৎকার গরম! অবশেষে তার আড়ষ্ট বেদনা জর্জরিত হাড় পাঁজরাগুলো একটু উত্তাপ পাবে। জুলাইয়ের মঙ্গলময় করুণাময় সূর্য! শুধু যদি বৃষ্টি না পড়ে আর। শুধুমাত্র তার সম্ভাবনার কথাতেই আগের থেকেই তার দুশ্চিন্তা আরম্ভ হয়ে গেলো। বৃষ্টি—না, তার থেকে খারাপ আর কিছু নেই। সে সময় তার প্রত্যেকটি হাড়-পাঁজরা ব্যথা করে, যন্ত্রণায় ঝনঝন করে, গাঁটগুলো সব ফুলে যায়, এক পা চলাও তখন কষ্টকর হয়ে পড়ে। কিন্তু যখন রৌদ্র ঝক্ঝক্ করে বিশেষ করে এখন যেমন করছে—তখন সব কিছু একেবারে অন্য রকম হয়ে যায়। জুলাইয়ের করুণাময় সূর্য তার সোনালী কিরণ দিয়ে স্নেহভরে পৃথিবীকে স্পর্শ করে।
“ঠাকুমা!”
“আবার কি হলো?”
“আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছো?”
“কেন শুনতে পাবো না…। তোমার কথা নিশ্চয় শুনতে পাচ্ছি”, আনিসিয়া নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিলো। “ঐ মেয়েটা সব সময় লুকিয়ে লুকিয়ে একটা না একটা কিছু করছেই…। এই বুড়ো মানুষটাকে ওরা একটু শান্তিতে বিশ্রাম করতে দেয় না কেন? এখন মানুষ জীবন থেকে আর কিছুই চায় না, চায় শুধু একটু শান্তি, শুধু একটু শান্তি, পথে অপেক্ষমান মৃত্যু, তাকে নিয়ে যাবার আগের ঘন্টাগুলো কোনোরকমে শুধু কাটিয়ে যাওয়া”—এইগুলোই তার মনে আসছিল।
“ঠাকুমা”, নাতালকা ছাড়লো না, লেগেই রইলো “আমার দিকে তাকাও তো!”
অনিচ্ছাভরে বৃদ্ধা তার ভারী ভারী চোখের পাতা দুটো তুললো। তার বিবর্ণ চোখদুটো মনে হচ্ছিল যেন পাতলা একটা আবরণে ঢাকা, সেই চোখ দিয়ে সে সঙ্কীর্ণভাবে মেয়েটির দিকে তাকালো।
“ঠাকুমা, জার্মানরা আসছে।”
আনিসিয়া নির্লিপ্তভাবে কাঁধ ঝাঁকালো। পর পর বেশ কয়েকদিন ধরে এই গুজবই সে শুনে আসছে। ওরা আসছে, ওরা আসছে কি? বেশ তো, ওদের আসতে দাও। জার্মানরা অন্তত তার মতো অস্থিচর্মসার বৃদ্ধাকে শান্তিতে মরতে দেবে। আসুক না ওরা তাতে ওর কি? জার্মানরা—কথাটাই তার কাছে কেমন যেন খুব একটা দূরের ব্যাপার বলে মনে হয়েছিল আর তার কাছে ঐ কথাটার সত্যই কোনো অর্থ ছিল না। তার কাছে যেটা সত্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা হলো রোদ পোহানো আর তার বেদনা জর্জরিত হাড় পাঁজরাগুলোর মধ্য দিয়ে উষ্ণতার সুখকর সঞ্চার অনুভব করা। জার্মানরা—অল্প বয়সী লোকেরা জার্মানদের নিয়ে চিন্তা ভাবনা করুক। তার মতো এক বৃদ্ধার আর তাতে কি ইতর বিশেষ হতে পারে...।
“ঠাকুমা, আমরা জঙ্গলের মধ্যে চলে যাচ্ছি।”
“বেশ তো, যেতে চাও তো যাও না কেন”, আনিসিয়া বিড়বিড় করে বললো। “তার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক? …আমি তোমাদের সঙ্গে যাচ্ছি না।”
নাতালকা অধৈর্যভরে তার হাতটা ধরলো।
“অমন কোরো না…। লাগছে…। এখন বলো কি…”
“ঠাকুমা, ঠাকুমা, এখন এক মিনিট আমার কথাগুলো শোনো।”
“শুনছি তো...।”
“আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?”
“হ্যাঁ পাচ্ছি, কি বলছো?”
“ঠাকুমা আমরা জঙ্গলের মধ্যে চলে যাচ্ছি। বাবা যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি, আর অন্যরাও সকলে যাচ্ছে!”
“বেশ তো, যাও না তাহলে…। জার্মানরা আসছে…, আসছে কি? ...তাহলে তো, নিশ্চয়ই তোমাদের জঙ্গলের মধ্যে চলে যাওয়াই উচিত। কিন্তু আমি এখানেই থাকবো আর রোদ পোহাবো…।”
“ঠাকুমা, আমাদের বাগানে দু’জন লাল সেনাবাহিনীর লোক রয়েছে।”
“দু’জন কি?”
“দু’জন লাল সেনাবাহিনীর লোক। কি বলছি বুঝতে পারছো?”
“হ্যাঁ…। কিন্তু তার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক?...”
মেয়েটি হতাশ হয়ে বৃদ্ধার কাঁধ ধরে ঝাঁকানি দিলো।
“ঠাকুমা, তুমি আবার ঘুমিয়ে পড়ছো। লক্ষ্মীটি, একটু জেগে থাকার চেষ্টা করো।”
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments