কেরায়া

দিগন্ত থেকে বিচিত্রভাবে রাত এসে ধানক্ষেতের ওপর, সমগ্র নদীর ওপর ছড়িয়ে পড়ে।

ওরা দু-জন নৌকাতে বসেছিল। সেখানে বসেই তারা রাত্রির সঞ্চার দেখে: আস্তে-আস্তে নদীর মতোই অতল হয়ে ওঠে অন্ধকার, যে-অন্ধকারে পৃথিবী তলিয়ে যায়; তারপর দিগন্তের কাছাকাছি একটি-দুটি তারা জেগে ওঠে। অন্ধকার ঘনীভূত হলে তারা সে অন্ধকারে গা-ডুবিয়ে বসে থাকে। তাদের মনে হয়, একবার নয় বারবারই যেন নিঃশব্দ কালো স্রোতের মতো রাতটি আসে, যেন তীরে তরঙ্গ ভেঙে পড়ে বারবার।

অবশ্য তা সম্ভব নয়। তরঙ্গ বারবার ফিরে আসে, রাত আসে একবারই।

তারা বোঝে, আরেকটি দিন শেষ হয়েছে। বনপ্রান্তর নদী-মাঠ-ঘাট ছেয়ে রাত নেবেছে, সূর্য অস্ত গেছে। কেবল অন্যদিনের মতো হাটখোলার পাশে নোঙর-করা নৌকায় তারা বসে আছে শূন্য হাতে, রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে। তাদের অপেক্ষার শেষ হয় নাই।

মহাজনটি সেদিন বলে গিয়েছিল আসবে বলে। সে আসে নাই। হয়তো সে আসবে ও না। তবু তার গুড়ের কেরায়া নেবে বলে সেই পরশু থেকে তারা নোঙর করে বসে আছে। তাদের দু-ধারে অন্য কেরায়া নৌকা এসেছে, নোঙর ফেলেছে, আবার চলে গেছে। তীরে হাট বসেছে, ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় হয়েছে, কেনা চলেছে, তারপর এক সময়ে সে হাটও ভেঙেছে। তারপর নিত্যকার মতো শূন্য ভাঙা হাটে নেড়ি কুত্তাগুলি ঘেউ ঘেউ করে লড়াই করেছে, ঘাসশূন্য মাঠে দমকা বাতাসে ধুলোর ঘূর্ণি উঠেছে, বৃহৎ গাছটি থেকে মরা পাতা ঝরেছে নিঃশব্দে। মহাজন ফিরে আসে নাই, তাদের যাওয়াও হয় নাই।

তাদের নৌকার দোষ নাই। নৌকাটি তাদের বেশ ছিপছিপে এবং মজবুত। গাবের আঠা দিয়ে তার সারা গা মাজা, দু-পাশে দুটো ক্ষুদ্র জানালাও। সে-জানালা দিয়ে তারা ভাতের ফেন ফেলে, পাটাতনের তলে জমে ওঠা পানি সেচন করে, কখনো-কখনো থুতু ফেলে। নৌকার ভেতরে যা-যা প্রয়োজনীয় তা সব আছে: রান্নার হাঁড়ি-কুড়ি, হুক্কা-তামাক, বৈঠা-লগি, আর হাওয়ার পাল। পালটা অবশ্য ছেঁড়া, কিন্তু নানা রঙের তালিতে তার সৌন্দর্যের বাহার হয়েছে। তারপর নৌকা চালাবার জন্যে তারা দু-জন মাঝি—তাগড়া জোয়ান দু-জন মাঝি। একটি ছেলেও আছে সঙ্গে। ছেলেটি এতিম। সে ফাই-ফরমাশ খাটে।

কিন্তু মহাজনটি আসে নাই, তারা কেরায়াও পায় নাই। মহাজনের পা আছে; কেরায়ার পা নাই। মোটা মহাজনটির মতো নৌকাটিও যেখানে খুশি যেতে পারে, যে-ঘাটে মন চায় সে-ঘাটে, যে-নদীতে দিন পড়ে সে-নদীতে। তার বৈঠা-লগি আছে, পাল আছে, জোয়ান দু-জন মাঝিও আছে। কিন্তু কেরায়া-নৌকা কেরায়া ছাড়া যায় কোথায়? জোয়ান মাঝি দুটির পেটে, এতিম ছেলেটার পেটে ক্ষিদের আগুন জ্বলে। দূর গাঁয়ে তাদের বাড়িতেও সে-আগুন জ্বলে ধিকিধিকি করে।

কেরায়া নাই বটে, কিন্তু নৌকার অভ্যন্তরে শক্ত পাটাতনের ওপর শুয়ে একটি মুমূর্ষু বুড়ো। সে আপন ব্যথায় গোঙায়, কাতরায়। তার এ-নৌকায় আবির্ভাবের কথায় নদীর মোহানার মাছগুলোর কথা মনে পড়ে। সেখানে মাঝে মাঝে গভীর পানির কোনো ভীষণাকার জন্তুর তাড়া খেয়ে ছোট-ছোট মাছ সভয়ে জেলেদের নৌকায় লাফিয়ে ওঠে, তারপর ভয়ে কাঁপতে থাকে, তাদের কানকো হাপরের মতো ওঠা-নাবা করে। মাছগুলোর মতো বুড়োমানুষটিও আজ সকালে কোথেকে এসে কোনোমতে নৌকায় চড়ে ছইয়ের তলে ঢুকে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। সে মাঝিদের আত্মীয়-কুটুম্ব নয়, এতিম ছেলেটিরও কেউ নয়। মুমূর্ষু মানুষটির মুখের কথা তখন প্রায় শেষ হয়েই এসেছে। তবে বাক্শক্তি যারা হারাতে বসে তারা শব্দের অপচয় করে না বলেই তার বক্তব্য সে দুটি কথায়ই পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করতে পারে। বুড়োটি বলে তার জীবনের শেষ বাসনার কথা। সে পাক-পাগাড়ে তার শেষনিশ্বাস ফেলতে-তো চায়ই না, বিদেশে বিভুঁই-এও মরতে চায় না। মৃত্যুকালে সে নিজের গ্রামে আপনজনের মধ্যেই থাকতে চায়। মাঝিরা তাকে কি নিয়ে যাবে তার দেশের বাড়িতে? বোধহয় মৃত্যুর মতো বিরাট ব্যাপার তার জীবনে কখনো ঘটে নাই। তাই তো

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ


কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice