বুনো বোরোনিয়া ফুল
হোঁচট খেতে খেতে, টলতে টলতে বুড়ো লোকটি বালির রাস্তায় বেয়ে উঠছিল। সরু সরু আগাছা আর ঝোপে ঢাকা নিচু একটা টিলার গা বেয়ে এঁকে বেঁকে চলে গেছে রাস্তাটা।
কাছে পিঠের শহরতলি থেকে কাজের শেষে ফেরার মুখে মেরি তাকে পার হয়ে এলো। পিছন থেকে বুড়ো লোকটির ডাকে মেরি থমকে দাঁড়ালো, সে কোন রকমে টলতে টলতে মেরির দিকে এগিয়ে এলো। ছেঁড়া জুতোর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা, রাঙাধুলোর পুরু প্রলেপ মাখা ফাটা ফাটা আঙুলগুলো মেরিকে বলে দিলো লোকটি আসছে বহু দূর থেকে।
“এন’ গুলা!” লোকটি চেঁচিয়ে উঠলো। “হ্যাঁ গো মা, ‘নেটিভ ক্যাম্পে (আদিবাসী শিবির) এন’ গুলা বলে কোনো মেয়ে আছে কিনা জানো?”
“কস্মিন কালে তার নাম শুনিনি,” বলে মেরি এগিয়ে চললো। শনিবারের সন্ধ্যা, তার তখন বাড়ি ফেরার ভীষণ তাড়া। জুতো জোড়া হাতে ধরে, খালি পায়ে রাস্তা বেয়ে উঠছিল, সপ্তাহ শেষের জন্য কেনা মাংস ও সবজি ভরা থলের ভারে, নমনীয় কর্মপটু শরীর তার একদিকে নুয়ে পড়ছিল। বছর চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হবে তার। পরনে ফুল ছাপা সুতির তৈরি ছিমছাম পোশাক, বুড়ো লোকটির দিকে তাকিয়ে ছিল তার আদিবাসী সুলভ সুন্দর বাদামী রঙের চোখদুটি মেলে, তার চুলের রঙ কিন্তু বাদামী, জায়গায় জায়গায় পাক ধরেছে, গায়ের রঙে হলুদের আভাস।
বুড়ো লোকটিকে নবাগত বলে মনে হলো তার। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর অবশিষ্ট যৎসামান্য অংশের থেকে পরিত্যক্ত এক মানুষ, ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ের এক প্রান্তে আদিবাসীদের কুঁড়েগুলো নিয়ে গড়া এই পল্লীতে এসে পড়েছে। এটা হচ্ছে নিজ নিজ উপজাতীয় গোষ্ঠী থেকে বিতাড়িত, এখনও যাদের আদিবাসী মনে করা হয়, মিশ্রিত রক্তের এমন সব মেয়ে পুরুষদের আশ্রয়স্থল—এদের মধ্যে রয়েছে বুড়োর গোষ্ঠীর লোক, রয়েছে মেরিও।
ঐখানে জড়ো হওয়া জঙলি, যাযাবর ধরনের লোকগুলোর সঙ্গে মেরি কোনো সংস্রবই রাখে না। ওদের মধ্যে বয়স্ক-বয়স্কাদের সঙ্গে অবশ্য ওর সৌহার্দই আছে।
মেরি থাকে এই পল্লীরই এক প্রান্তে। ওর স্বামী, মেরির মতই গায়ের রঙ তার, মাঝে মাঝে ওকে ব্যঙ্গ করতো, সাদা চামড়াদের মেয়েদের মত করে ওর থাকার এই প্রচেষ্টার মিশন স্কুলে শেখা পদ্ধতিতে বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা আর নিজেকে ভদ্র, সভ্য করে তোলা।
এখান থেকে ওর বাড়ি বেশি দূরে নয়, টুকরো টুকরো কাঠ মরচে পড়া কেরোসিনের টিন দিয়ে বানানো ঢিবি গোছের ঘর একটা, বেঢপ আকারের, ঘুপচি, এমনই তার ছাত যে শীতকালে তার মধ্যে দিয়ে ঘরে বৃষ্টির জল পড়ে। কিন্তু যে জমির ওপর ঘরটা বানানো—সেটা মেরির নিজের। তাই নিয়ে তার খুবই গর্ব। শহরতলিতে, বাড়ি বাড়ি ঘর মুছে আর কাপড় কেচে অর্জিত যে টাকা বছরের পর বছর তারই থেকে বাঁচানো, লুকিয়ে রাখা টাকা দিয়ে কেনা এ জমি। মেরির ছেলে-মেয়েরা সব এখন বড় হয়ে গেছে—আস্তে আস্তে যে যার মত মেরির কাছে থেকে দূরে সরে গেছে। এখন সে বেঁচে আছে, প্রাণপাত করে খেটে মরছে শুধু তার এ জমির ওপর একটি বাড়ি তুলবে বলে করোগেটেড টিনের ছাদ দেওয়া কাঠের তৈরি ছোট্ট একখানি বাড়ি।
মেরি যেটাকে তার বাগান বলে, তারই শুকনো বালির ওপর ক’টা টোমাটোর চারা নেতিয়ে পড়ে আছে। দরজা খুলে ঘরে ঢোকবার আগে স্নেহাতুর দৃষ্টিতে মেরি অনেকক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।
টেবিলের ওপর তার স্বামীর ছড়িয়ে রেখে যাওয়া উচ্ছিষ্টের টুকরো আর আ-ধোওয়া থালা বাসন দেখে বিরক্ত হলো সে. বাজারের থলে নামিয়ে রেখে মেরি সে সব পরিষ্কার করলো। ঘরের মেঝের উন্মুক্ত চুল্লীতে আগুন জ্বালালো, ঘর ঝাঁট দিলো, থালা বাসন মাজলো, স্টু বানাবে বলে বাজার থেকে আনা মাংস আর সবজি কেটে একটা পাত্রে রাখলো। তারপর পাত্রটা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments