-
ঐ আসছে ওরা! সুবিন্যস্তভাবে সারিবদ্ধ হয়ে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে—একটা, আর একটা, তৃতীয়টা—তাদের গায়ে বিড়ালের চোখের মতো সাদা বৃত্ত আর তার মাঝখানে কালো ক্রুশ চিহ্ন আঁকা। পিওতর ফিলিপোভিচ-এর পিছনে দাঁড়িয়ে, প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা নিজের গায়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলো। ঘড় ঘড় শব্দে ট্যাঙ্কগুলি এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পিওতর ফিলিপোভিচ লাফ দিয়ে জানালার ধারের বেঞ্চির ওপর উঠে দাঁড়িয়ে, জানলার কাঁচের গায়ে মুখ লাগালো ভালো করে দেখবে বলে।
প্রাসকোভাইয়া সাভিশনা তার সর্বাঙ্গে ক্রুশ চিহ্ন আঁকার পর সে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার তারের মতো কড়া খসখসে দাড়ির মধ্যে প্রায় দন্তহীন একটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো।
গ্রামের কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে ট্যাঙ্কগুলোর পিছু পিছু সারিবদ্ধভাবে আসছিল বিরাট ট্রাকে জোড়া
-
সারার পা দুখানা অচল হয়ে পড়ার আগে সে আমাদের কাছেই কাজ করতো। খুবই মোটা ছিল সে আর তার গায়ের রঙ ছিল হালকা হলদেটে-বাদামী, যেন একটা বেলুনের মতো, বেলুন ফোলালে যেমন রঙটা তার হালকা হয়ে যায়, পিগমেন্টের (প্রাণী ও উদ্ভিদের তত্ত্বরঞ্জক পদার্থ বিশেষ) পাতলা স্তরের নিচের মেদ বৃদ্ধি হলে সেটা টানটান হয়ে আরও বেশি পাতলাভাবে ছড়িয়ে যায়। গিল্টি করা ছোট্ট সরু ফ্রেমের চশমা পরতো সে আর ভালো রাঁধুনী ছিল, মাখনের ব্যাপারে শুধু যা তার হাতটা ছিল দরাজ।
তার সম্বন্ধে এই সব জিনিসগুলোই আমরা লক্ষ্য করেছিলাম।
কিন্তু এর ওপর তার ছিল একটি মাত্র স্বামী, আইনসম্মতভাবে তার সঙ্গে গীর্জায় বিবাহিত, আর ছিল তিনটি
-
[সামাজিক বৈষম্য, বিশেষ করে বর্ণবৈষম্যের ওপর লিখিত তাঁর গল্পগুলির জন্য সুবিদিত লেখিকা নাডাইন গর্ডিমারের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। পঞ্চাশ দশকে যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা সম্বন্ধে তাঁর জোরালো গল্পগুলি লিখতে আরম্ভ করেন তখন ওটা ঠিক ফ্যাশানও ছিল না বা শ্বেতাঙ্গ শাসনের অবিচারগুলোর কথা প্রকট করা যুক্তিযুক্তও ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাহসের এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি তা ব্যক্ত করে গেছেন। অগণিত ছোটগল্প ছাড়া বেশ কয়েকটি উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। ১৯৯১ সালে সাহিত্যের জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।]
রক্তিম দিগন্তের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে একক সিধা রেল লাইন ধরে সবেগে তাদের দিকে নেমে এলো। স্টেশন মাস্টার তার ছুঁচোলো
-
রাত্রের ট্রেনে যে সব যাত্রীরা রোম ছাড়তো, ফাব্রিয়ানা স্টেশনে তাদের ভোর পর্যন্ত থাকতে হতো তারপর সালমোনার মেল লাইন ধরবার জন্য হেরকালের ছোট্ট একটা লোকাল ট্রেনে করে তাদের যেতে হতো। দমবন্ধ করা, ধোঁয়া ভরা একটা সেকেন্ড ক্লাস গাড়ি, ইতিমধ্যেই পাঁচজন লোক যার মধ্যে রাত কাটিয়েছে, ভোরবেলায় সেটাতে গভীর শোকের পোশাক পরা প্রায় বেঢপ একটা বস্তার মতো এক মহিলাকে টেনে তোলা হলো। তার পিছনে হাঁফাতে হাঁফাতে, কাতরাতে কাতরাতে উঠে এসেছিল তার স্বামী—ছোট্ট এতটুকু এক লোক। রোগাটে আর নিস্তেজ, মুখ তার মড়ার মতো ফ্যাকাশে, চোখগুলো ছোট ছোট আর চকচকে, তাঁকে কেমন যেন সলজ্জ আর অস্থির দেখাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত একটা সীটে বসে পড়ে সে,
-
কম্পমান বেলে পাথরের সুড়ঙ্গের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে সুবিন্যস্ত অগণিত কলাবাগানগুলো পেরিয়ে চলতে শুরু করলো, বাতাস হয়ে গেলো সেঁতসেঁতে, সমুদ্রের হাওয়া আর তারা পাচ্ছিল না। কামরার জানলা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ধোঁওয়ার একটা প্রবাহ ভেসে এলো। রেল লাইনের সমান্তরাল একটা সরু রাস্তার ওপর সবুজ সবুজ কলার কাঁদি ভর্তি বলদের সব গাড়ি। রাস্তার ওপাশে অকর্ষিত জমির ওপর ইতঃস্ততভাবে ছাড় দিয়ে দিয়ে তৈরি ইলেকট্রিক পাখা দেওয়া অফিসগুলো, লাল ইঁটের সব ইমারত, ধুলো মাখা তাল গাছ, গোলাপের ঝোপগুলোর মাঝে ছাদের ওপর সাদা রঙের ছোট ছোট টেবিল চেয়ার সাজানো বসতবাড়িগুলো। বেলা তখন এগারোটা, তাপটা তখনও প্রখর হতে শুরু করেনি।
“জানালাটা বন্ধ করো,” মহিলাটি বললে। “মাথাটা
-
কোনো একটা অফিসে কাজ করা তার পক্ষে খুব সুখকর যে হবে না, মিস হুয়াং এটা অনুমানই করেছিল, কিন্তু সেখানে তার জীবন বিষময় করে তোলার বস্তুগুলো সে কল্পনাও করতে পারেনি।
সকাল সাড়ে আটটায় মিস হুয়াং কোম্পানির প্রধান অফিসে গিয়ে ঢুকলো। চাকরিজীবী হিসাবে তার জীবনের প্রথম পাতার প্রথম পংক্তি শুরু হলো নিচুগলায় আলোচনারত কিছু লোকের চাপা হাসি দিয়ে। প্রধান অফিসে আলো খুবই কম। পূবমুখী ও উত্তরমুখী জানালাগুলো বেশ বড় হলেও সামনের আকাশছোঁয়া বড় বড় বাড়িগুলো দৃষ্টিপথ অবরোধ করেছে। জানালার কাঁচের শার্সিগুলোর মধ্য দিয়ে সূর্যের আলোর পরিবর্তে এসে পড়ছে উলটোদিকের অফিসগুলোর বৈদ্যুতিক বাতির আভা। ছাত থেকে ঝুলছিল ফুলের আকারের হাতমুখ ধোবার গামলার মত
-
আসানা আম্মা কোলা-বাদামের অকিঞ্চিৎকর স্তূপের দিকে তাকিয়ে থুথু ফেললো, আর টুকরিটা তুলে নিলো। তারপর টুকরিটা নামিয়ে একটা বাদাম তুলে নিয়ে সেটায় একটা কামড় দিয়ে সেটা ছুঁড়ে স্তূপের মধ্যে ফেলে আবার থুথু ফেলে উঠে দাঁড়ালো। তীব্র ক্ষণস্থায়ী একটা ব্যথা তার বাঁ কানের নিচে কোথায় যেন চাগিয়ে উঠলো। চোখদুটো তার ঝাপসা হয়ে এলো।
“জ্বালানি কাঠগুলো একবার দেখতে হবে”, সে ভাবছিল চোখ ঝাপসা হয়ে আসাটা যে বাতাসের ঠাণ্ডা আমেজের জন্য এই কথা চিন্তা করতে করতে। বাদামের ঝোপগুলোর ওপর হেঁট হলো সে।
“এই ঘেসো জমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ধুলোর ওপর কার কুদৃষ্টি পড়বে জানি না, আমি বরং তাড়াতাড়ি ওগুলো তুলে ফেলি।”
ক্রাল-এ
-
বৃদ্ধ জাখার আর আমি ডন নদীর ধারে একটা বুনো কাঁটাঝোপের তলায়, রৌদ্রদগ্ধ ন্যাড়া একটা ঢিবির ওপর শুয়েছিলাম। বাদামী রঙের একটা চিল একটা মেঘের আঁশালো ধারির নিচে ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছিল। পাখিদের পুরীষ লাঞ্ছিত কাঁটাঝোপের পাতাগুলো আমাদের কোনো ছায়াই দিচ্ছিল না। গুমোট গরমে কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করছিল; ডন নদীর পাকানো পাকানো ফুটকি কাটা জলের কিংবা পায়ের নিচের খাঁজকাটা তরমুজের খোলাগুলোর দিকে তাকালে, মুখের মধ্যে চটচটে একটা লালা এসে যাচ্ছিল কিন্তু মুখ থেকে সেটা ফেলে দিতেও আলসেমি লাগছিল।
নিচেয় খোদলের মধ্যে শুকিয়ে আসা পুকুরের কাছে ভেড়াগুলো গাদাগাদি করে একটা দঙ্গল পাকিয়ে একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল। জগতের কাছে ক্লান্ত ভাবে তাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে
-
"শত্রুকে মনে প্রাণে ঘৃণা করতে না শিখলে তাকে পরাজিত করা যায় না।"
[জে স্তালিন, এ অর্ডার অব দ্য ডে, মে ডে ১৯৪২, পিপলস কমিসার অব ডিফেন্স, ইউএসএসআর]
যুদ্ধের সময় মানুষের মতো গাছদেরও নিজ নিজ ভাগ্য থাকে। আমি দেখেছি বিশাল এক বনভূমিকে আমাদের কামানের গোলায় ধ্বংস হয়ে যেতে। খুবই সম্প্রতি, অমুক গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়ে জার্মানরা এখানে বেশ ভালোভাবে গেড়ে বসেছিল, ভেবেছিল বহুদিন থাকবে এখানে, কিন্তু গাছগুলোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু তাদেরও ধ্বংস করে দিয়েছিল। ভাঙা গুঁড়িগুলোর তলায় মৃত জার্মানরা পড়েছিল, ফার্ন আর ব্র্যাকেন-এর সজীব শ্যামলিমার মধ্যে তাদের খণ্ডবিখণ্ড দেহগুলো পচছিল; কামানের গোলায় বিদীর্ণ পাইন গাছগুলোর আঠার সুগন্ধ ঐসব পচা দেহগুলোর শ্বাসরুদ্ধ
-
ছোট্ট এই গল্পটা বলা কঠিন—এতই সাদাসিধে এটা। আমি যখন এক তরুণ বালক, গ্রীষ্মের আর বসন্তের রবিবারগুলোয় আমাদের রাস্তার বাচ্চাদের এক সঙ্গে জড়ো করতাম—আর তাদের নিয়ে যেতাম মাঠে মাঠে, বনবাদাড়ের মধ্যে। পাখীদের মতো প্রাণচঞ্চল এই ক্ষুদে মানুষগুলোর সঙ্গে আমি বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখে চলতে চাইতাম।
বাচ্চাগুলো শহরের ধুলোভরা গুমোট রাস্তাগুলো ছেড়ে যেতে খুশি হতো, তাদের মায়েরা তাদের সঙ্গে গোটা গোটা রুটিই দিয়ে দিতো, আমি মিষ্টি লজেন্স কিছু কিনে কাভাস (Kavass) এর একটা বোতলে জল ভরে নিতাম আর শহরের মধ্যে দিয়ে মাঠঘাট পেরিয়ে নিঃশঙ্ক বাচ্চা ভেড়াদের পিছু পিছু রাখালের মতো বসন্তের সাজে সাজা সুন্দর নরম সবুজ জঙ্গলের দিকে যেতাম।
আমরা শহর ছাড়তাম, সাধারণত
-
শরতের এক সন্ধ্যায় একবার খুবই অসুবিধাজনক আর অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম। সদ্য এক শহরে পৌঁছে দেখি একেবারে কপর্দকহীন অবস্থা, মাথা গোঁজার একটা আস্তানা পর্যন্ত নেই, সেখানের একটা লোককেও চিনি না।
গোড়ার ক’দিন অতিরিক্ত জামাকাপড় যা কিছু সঙ্গে ছিল সব বিক্রি করে দিলাম; শহর ছেড়ে চলে গেলাম উসতাই-এর শহরতলিতে—পারঘাটগুলো সব সেখানেই।
নৌকো চলাচল মরসুমে কর্মব্যস্ততায় জায়গাটা সরগরম হয়ে থাকে—কিন্তু তখন একেবারে নিস্তব্ধ, জনমানব শূন্য—অক্টোবর মাস প্রায় শেষ হয় হয়।
ভেজা বালুর ওপর দিয়ে পা টেনে টেনে চলতে চলতে বালুর ওপরে লক্ষ্য রাখছিলাম, খাবারের ছিটেফোঁটাও যদি মেলে এই আশায়, খালি বাড়ি আর দোকান ঘরগুলোর মধ্যে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ভাবছিলাম ভরাপেট কী রকম
-
যখন বৃষ্টি পড়ে (ইমেরেতিতে মার্চ-এপ্রিল মাসে বরাবরই বৃষ্টি হয়) আর রিয়োনির ঝোপগুলো থেকে বাতাস পীচ আর বুনো প্লাম ফুলের গন্ধ আনে, ছোট্ট ৎসাবুনিয়া তার মাকে জিজ্ঞাসা করে, “মা, তোমার চাদরটা কি আমি গায়ে দিতে পারি?”
“হ্যাঁ, বাছা।”
ৎসাবুনিয়া পুরোনো বাক্স থেকে ওটাকে টেনে বার করলো, পাখির পালকের মতো চাদরটা বাতাসে সাদা পায়রার মতো উড়তে লাগলো।
ৎসাবুনিয়া চাদর দিয়ে নিজেকে এমন আঁট সাঁট ভাবে জড়িয়ে নিলো যে শুধু তার মেছেতার দাগ ওয়ালা ছোট্ট নাকটি আর তার আগুনে সেঁকা লাল লাল পাগুলো দেখা যেতে লাগলো। বাচ্চা মেয়েটির জন্য তার বাপের গলোশগুলো (বৃষ্টি বাদল থেকে বাঁচাবার জন্য জুতোর ওপর পরবার একরকম জুতো) পাপোষের
ক্যাটাগরি
লেখক
- অ্যাগনেস স্মেডলি (১)
- আন্তন চেখভ (১)
- আমা আতা আইদু (১)
- আলেক্সেই তলস্তয় (১)
- ইভোন ভেরা (১)
- এলবার্ট মালজ (১)
- ওয়ান্ডা ওয়াসিলেস্কা (১)
- কনস্তানতিন লর্তকিপানিৎজে (১)
- ক্যাথারিন সুসানাহ প্রিচার্ড (১)
- গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ (১)
- গিয়োরগি শাটবেরাশভিলি (১)
- জন রিড (১)
- নাডিন গর্ডিমার (৩)
- পাভেল লিডভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (২)
- ভ্যালেনটিনা ডিমিট্রিয়েভা (১)
- মাও টুন (১)
- মিখাইল শলোখভ (২)
- ম্যাক্সিম গোর্কি (২)
- রিচার্ড রাইট (১)
- লুইজি পিরানদেল্লো (১)
- সিনডিউই ম্যাগোনা (১)
- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (৯)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.