একটি ছেলে
ছোট্ট এই গল্পটা বলা কঠিন—এতই সাদাসিধে এটা। আমি যখন এক তরুণ বালক, গ্রীষ্মের আর বসন্তের রবিবারগুলোয় আমাদের রাস্তার বাচ্চাদের এক সঙ্গে জড়ো করতাম—আর তাদের নিয়ে যেতাম মাঠে মাঠে, বনবাদাড়ের মধ্যে। পাখীদের মতো প্রাণচঞ্চল এই ক্ষুদে মানুষগুলোর সঙ্গে আমি বন্ধুত্বের সম্পর্ক রেখে চলতে চাইতাম।
বাচ্চাগুলো শহরের ধুলোভরা গুমোট রাস্তাগুলো ছেড়ে যেতে খুশি হতো, তাদের মায়েরা তাদের সঙ্গে গোটা গোটা রুটিই দিয়ে দিতো, আমি মিষ্টি লজেন্স কিছু কিনে কাভাস (Kavass) এর একটা বোতলে জল ভরে নিতাম আর শহরের মধ্যে দিয়ে মাঠঘাট পেরিয়ে নিঃশঙ্ক বাচ্চা ভেড়াদের পিছু পিছু রাখালের মতো বসন্তের সাজে সাজা সুন্দর নরম সবুজ জঙ্গলের দিকে যেতাম।
আমরা শহর ছাড়তাম, সাধারণত সকালের দিকে, ভোর বেলাকার ভজনার জন্য গির্জার ঘন্টাগুলো যখন বাজতে থাকতো, ঘণ্টাগুলোর শব্দ আর বাচ্চাদের ক্ষিপ্র পায়ে ওড়ানো ধুলোকে সঙ্গী করে। দুপুরে, দিনের উত্তাপ যখন তুঙ্গে, আমার বন্ধুরা এসে জড়ো হতো জঙ্গলের কিনারায়; খাওয়া দাওয়া সেরে, ক্ষুদে মানুষগুলো ঘাসের ওপর শুয়ে ঘুমোতো ঝোপঝাড়গুলোর ছায়ায়, ওদিকে একটু বড় বয়সের বাচ্চারা আমার চারপাশ ঘিরে সমবেত হয়ে একটা গল্প বলার জন্য মিনতি করতো, আর আমিও তাই বলতাম, তারা যেমন করতো আমিও তেমনি স্বেচ্ছায় তাদের সঙ্গে বক্ বক্ করে যেতাম। আর যৌবনের স্পর্দ্ধিত আত্মবিশ্বাস আর জীবন সম্বন্ধে অকিঞ্চিৎকর জ্ঞান সম্পর্কে হাস্যকর দম্ভ, যেটা এরই অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, সত্ত্বেও নিজেকে আমার প্রায়ই প্রাজ্ঞদের মাঝখানে বিশ বছরের এক শিশু বলে মনে হতো।
আমাদের মাথার ওপর বিস্তৃত চিরন্তন আকাশের আচ্ছাদন, আমাদের সমুখে জঙ্গলের উর্বর বৈচিত্র্য একটা বিচক্ষণ নীরবতায় মগ্ন হয়ে আছে, একটা বাতাস দ্রুত বয়ে যায়, একটা মৃদু ফিসফিসানি ছুটে চলে যায়, জঙ্গলের সুগন্ধভরা ছায়াগুলো কেঁপে ওঠে আর আবার প্রাণ ভরে যায় পরম সুখকর নীরবতায়।
সাদা সাদা মেঘমন্দ গতিতে ভেসে বেড়ায় আকাশের নীল বিশালতার মধ্যে; রৌদ্রে উত্তপ্ত পৃথিবীর থেকে দেখে আকাশকে এমন ঠাণ্ডা মনে হয় আর অবাক লাগে তার মাঝে মেঘগুলো গলে যাচ্ছে দেখে।
আর আমার চারপাশে এইসব চমৎকার ক্ষুদে মানুষগুলো, ডেকে আনা হয়েছে জীবনের সমস্ত দুঃখ আর সমস্ত সুখ জানার জন্য।
ঐগুলো ছিল আমার সুখের দিন, ওরা ছিল সত্যিকারের আনন্দোৎসব, জীবনের অন্ধকার দিনগুলোর দ্বারা এরই মধ্যে কলুষিত আমার মন বাল-সুলভ চিন্তা ও অনুভূতিগুলো সহজ জ্ঞানে নিজেকে অবগাহন করাতো আর নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করাতো।
একদিন এক দঙ্গল বাচ্চাদের নিয়ে আমি যখন শহর থেকে বেরিয়ে মাঠের মধ্যে এসে পড়েছি, তখন আমাদের দেখা হলো অচেনা একজনের সঙ্গে—ক্ষুদে এক ইহুদী, নগ্ন পা, পরনে ছিন্ন সার্ট, কালো-ভ্রু, ভেড়ার বাচ্চার মতো ক্ষীণকায় আর কোঁকড়ানো চুলওয়ালা। কোনো একটা ব্যাপারে মনটা খারাপ ছিল আর স্পষ্টতই সদ্য সদ্য সে কাঁদছিল, তার নিষ্প্রভ, চোখদুটোর পাতাগুলো ফোলা ফোলা আর লাল, তার ক্ষুধার্ত মুখের নীলচে বিবর্ণতার মধ্যে থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বাচ্চাদের দঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ে, সে রাস্তার মাঝে থমকে থেমে গেলো, সকালের ঠাণ্ডা মাটির ওপর সুদৃঢ়ভাবে শক্ত করে পা রেখে দাঁড়ালো, তার সুঠাম হাঁ মুখের কালচে ঠোঁট দুখানা আতঙ্কে হাঁ হয়ে গিয়েছিল আর পরের মুহূর্তেই সে দ্রুত একটা লাফ দিয়ে ফুটপাতের ওপর গিয়ে পড়লো।
‘ধর ওটাকে!’ বাচ্চারা একটা আনন্দোচ্ছল ঐক্যতানে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল, ‘ক্ষুদে ইহুদী, ক্ষুদে ইহুদীটাকে ধর।’ আমি আশা করেছিলাম সে ছুটে পালাবে, তার বড় বড় চোখওয়ালা মুখে আতঙ্কের প্রতিফলন, ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, বিদ্রূপমুখর ভিড়ের হট্টগোলের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে রইলো আর বেড়ার গায়ে কাঁধ দুটো ঠেসে হাতদুটো পিছন দিকে মুড়ে যেন সে আরো লম্বা হয়ে যাচ্ছে। এমনিভাবে নিজেকে রুখলো।
তারপর হঠাৎ সে খুব শান্তভাবে, স্পষ্ট করে আর
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments