মঙ্গলবারের দিবানিদ্রা
কম্পমান বেলে পাথরের সুড়ঙ্গের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে সুবিন্যস্ত অগণিত কলাবাগানগুলো পেরিয়ে চলতে শুরু করলো, বাতাস হয়ে গেলো সেঁতসেঁতে, সমুদ্রের হাওয়া আর তারা পাচ্ছিল না। কামরার জানলা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর ধোঁওয়ার একটা প্রবাহ ভেসে এলো। রেল লাইনের সমান্তরাল একটা সরু রাস্তার ওপর সবুজ সবুজ কলার কাঁদি ভর্তি বলদের সব গাড়ি। রাস্তার ওপাশে অকর্ষিত জমির ওপর ইতঃস্ততভাবে ছাড় দিয়ে দিয়ে তৈরি ইলেকট্রিক পাখা দেওয়া অফিসগুলো, লাল ইঁটের সব ইমারত, ধুলো মাখা তাল গাছ, গোলাপের ঝোপগুলোর মাঝে ছাদের ওপর সাদা রঙের ছোট ছোট টেবিল চেয়ার সাজানো বসতবাড়িগুলো। বেলা তখন এগারোটা, তাপটা তখনও প্রখর হতে শুরু করেনি।
“জানালাটা বন্ধ করো,” মহিলাটি বললে। “মাথাটা ঝুল আর কালিতে একেবারে ভর্তি হয়ে যাবে।”
মেয়েটি চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না। মরচের জন্য জানলাটা বন্ধ হচ্ছিল না। একটি মাত্র তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় তারাই ছিল একমাত্র যাত্রী। জানলার মধ্য দিয়ে ইঞ্জিনের ধোঁয়া ক্রমাগত আসতে থাকায় মেয়েটি তার জায়গা ছেড়ে উঠে গিয়ে, তাদের সঙ্গে যে কটি মাত্র জিনিস ছিল: কিছু খাবার ভরা একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ আর খবরের কাগজে মোড়া ফুলের একটা তোড়া, সেগুলো নামিয়ে রাখলো। নিজে গিয়ে উলটো দিকের আসনে বসলো তার মার দিকে মুখ করে। তাদের দুজনেরই পরনে অনাড়ম্বর, সস্তা শোকের পোশাক।
মেয়েটির বয়স বারো বছর, এই প্রথমবার সে ট্রেনে চড়লো। মহিলাটির তার মা হওয়ার পক্ষে খুব বেশি বয়স হয়েছে বলে মনে হচ্ছিল, মহিলাটির চোখে পাতার ওপরের নীল নীল শিরা আর আলখাল্লার মতো করে কাটা পোশাক পরা তার ছোটোখাটো বেঢপ আকৃতির জন্য। আসনের পিঠে তার মেরুদণ্ডটা ভালো করে ঠেকিয়ে, দুহাত দিয়ে তার পেটেন্ট লেদারের ছাল ওঠা হাতব্যাগটা নিজের কোলের ওপর ধরে সে বসেছিল। দারিদ্র্যে অভ্যস্ত এক মানুষের মতোই তার অবিচল ভাব।
বেলা বারোটা নাগাদ তাপ বাড়তে শুরু করলো। জল নেবার উদ্দেশ্যে দশ মিনিটের জন্য ট্রেনটা থামলো একটা স্টেশনে, সেখানে কোনো শহর ছিল না। বাইরে কলাবাগানগুলোর রহস্যময় নীরবতার মধ্যে, ছায়াগুলোকে পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কামরার মধ্যেকার স্তব্ধ বাতাসে কাঁচা চামড়ার গন্ধ। ট্রেনটা রঙ করা কাঠের বাড়িওয়ালা দুটো ঠিক একই রকমের শহরে থামলো। মহিলাটির মাথা নড়তে লাগলো আর ঘুমে সে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। মেয়েটি তার জুতো খুলে ফেললো। তারপর ফুলের তোড়াটা জলে রাখবে বলে কলঘরে চলে গেলো।
সে যখন আসনে ফিরে এলো তার মা তখন খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে রয়েছে।
মহিলাটি মেয়েটিকে এক টুকরো চীজ, ভুট্টার ছাতু দিয়ে বানানো আধখানা প্যানকেক আর একটা কুকি দিলো আর তার নিজের জন্যও প্লাসটিকের থলে থেকে সমান ভাগ বার করে নিলো। তারা খেতে খেতেই ট্রেনটা খুব মন্থরভাবে একটা লোহার সেতু পার হয়ে আগের শহরগুলোর মতোই আর একটা শহর পেরিয়ে চললো। শুধু এইটুকু মাত্র প্রভেদ যে এ শহরের চকে ছিল মানুষের ভিড়। দারুণ দাবদাহেব মধ্যে বাজনাদারদের একটা দল চটুল একটা সুর বাজাচ্ছিল। শহরের অপর প্রান্তে কলাগাছেন বাগানগুলো খরায় ফাটল ধরা একটা প্রান্তর পর্যন্ত পৌঁছে থেমে গেছে।
মহিলাটি খাওয়া বন্ধ করলো।
“জুতো পরে নাও,” সে বললে।
মেয়েটি বাইরের দিকে তাকালো। জনহীন প্রান্তর ছাড়া কিছু আর দেখতে পেলো না, সেখানে ট্রেনটা আবার গতি বাড়ালো, কিন্তু সে তার কুকির অবশিষ্ট টুকরোটা থলের মধ্যে তুলে রেখে জুতো পরে নিলো ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। মহিলাটি তাকে একটি চিরুণী দিলো।
“মাথাটা আঁচড়াও” সে বললে।
ট্রেনের হুইসল বাজতে লাগলো মেয়েটি যখন চুল আঁচড়াচ্ছিল, মহিলাটি মেয়েটার ঘাড়ের ঘাম মুছে আঙুল দিয়ে তার মুখের তেলও পরিষ্কার করে দিলো। মেয়েটি যখন তার চুল আঁচড়ানো শেষ করলো,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments