‘যে দিন ভেসে গেছে…’
তখন আমার পনের কি ষোল বছর বয়েস হবে বোধহয়। এখনকার সময়ে শুনলে শিশুই মনে হবে। এখন তো পঁচিশ বছরেও কৈশোর কাটে না মেয়েদের। যা হোক, নজল ইসলামকে ঘিরেে আমার সব কথাই ওই সময়টুকূর পরিমণ্ডলে বাধা। ইদানিং ভুলে যাই ভীষণ। অতীত হাতড়ালে অনেক কথা একসঙ্গে ভিড় করে আসে। ঘটনাগুলোর ওপর অনেক দিনমাস বছরের প্রলেপ পড়েছে। তবু এখনো ভুলতে পারি না সেইসব গান। গান খুব ভালোবাসতাম। গান গাইতেও পারতাম। খুব প্রিয় ছিল আমার নজরুল গীতি। সেই যে ‘মন হারালে না পাওয়া যায় মনের বতন…’ ‘বাগিচা বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে…’ অপূর্ব সেই গানের পথ ধরেই স্মৃতিতে ভেসে আসেন তিনি। টুকরো অনেক ঘটনা মনে পড়ে যায়। একটা সময় নজরুল গীতিকে জড়িয়ে ছিলাম। তবে নিজের মত করে গেয়ে, এখন যা সব হচ্ছে, কথা বলে তেমন নয়। ওর নিজের শিখিয়ে দেওয়া সুরে গান গাইতাম। ভীষণ ভালো লাগত। খুব চেষ্টা করতাম ওর গানের কথাগুলিতে জীবন্ত করে তুলতে। সেইজন্য নজরুলও কখনো কখনো বাড়াবাড়ি করতেন। এমনিতেই মানুষটা ছিলেন সরল, প্রাণবন্ত। ছেলেমানুষের মত কিছু পাগলামি ছিল ওঁর মধ্যে। অনেকের সামনে এমন প্রশংসা করতেন লজ্জা পেয়ে যেতাম। ওই গানটার প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আজকাল শুনি ‘না পাওয়া যায় মনের বতন’ কথাটির পরিবর্তে ‘মনের মতন’ বলা হচ্ছে। খুব কষ্ট হয়। গানটাকে যে কতখানি অবমাননা করা হয় কেউ বোঝে না।
নজরুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কলকাতাতেই হয়েছিল। আমি গানের রেকর্ডিং-এর কাজে মাঝে মধ্যে কলকাতা আসতাম। তেমনি কোনও একটি আসরে ঠিক মনে পড়ছে না দেখা হয়েছিল ওঁর সঙ্গে। ভারি সুন্দর চেহারা ছিল নজরুল ইসলামের। একমাথা ঘন চুল। ঝকঝকে চোখ নাক মুখ একবার দেখলে ভোলা যায় না। আর সবচেয়ে মজার কথা হল ওঁর হাঁটা চলা, কথা বলা, সাজপোশাক সব কিছুর মধ্যে এমন একটা অগোছালো সৌন্দর্য্য লুকিযে থাকত। ভালো লাগতে বাধ্য। কক্ষনো কথা রাখতে পারতেন না তিনি। চেষ্টাও করতেন না। রেগে গেলে বলতেন, ‘বোঝো না কেন, ভদ্রলোকের এক কথা, আমি কথা রাখতে পাবি না এটা ভাঙি কি কবে।’ আশ্চর্য এক প্রাণশক্তি ছিল ওঁর মধ্যে। যতক্ষণ থাকতেন গানে গল্পে একেবাবে মাতিয়ে রাখতেন। সেই সময়টুকুর জন্য সকলের দুঃখ কষ্ট যেন উধাও। অথচ তারই মধ্যে গান লিখছেন, সুর দিচ্ছেন, গান শেখাচ্ছেন। ঢাকায় এলেই আমাদের বাড়ি আসতেন। আর তখন যেন ওটা আমাদের বাড়ি নয় শুধু। অতিথি ব্যক্তিটি অজান্তেই কেমন প্রিয়জন হয়ে উঠতেন আমাদের। প্রচুর গান শিখেছি ওঁর কাছে। বাড়িতে এলেই হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়তেন। সেই সময় দিলীপ রায় আমাদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। গান শিখেছি ওঁর কাছেও। প্রথম আলাপেই তো আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি মন্টুর ছাত্রী না, ঠিক চিনেছি।’
সে সময় তিনটি যুবক একেবারে মাতিয়ে রেখেছিলেন বাংলাকে। দিলীপ রায়, সুভাষচন্দ্র বসু ও নজরুল ইসলাম। নজরুলের কবিতা ও অন্যান্য লেখালেখি আমাকে মুগ্ধ করতে পারে নি তেমন। আসলে যে সব কবিতা ও কবিদের সান্নিধ্যে কাটিয়েছি তাঁরা তো নক্ষত্র বিশেষ। যেমন রবীন্দ্রনাথের পরে অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় নজরুলের কবিতা সেই স্তরে পৌঁছতে পারেনি। যদিও তাঁর কবিতা আমি খুব বেশি পড়িনি। তাহলেও এটা বরাবর মনে হয়েছে। কিন্তু তাঁর গান অনবদ্য। এবং যেখানে নজরুল তাঁর যাবতীয় সত্তার উন্মোচন ঘটিয়েছেন যেন। আজও নজরুলগীতি আমার প্রাণের গান। নজরুল এক ছন্নছাড়া, ওলটপালট জীবন কাটাতেন। দেখলেই মনে হত এ মানুষ জীবনের সোজা পথে চলবার মানুষ নন। পরবর্তীকালে তো কত কথা শুনেছি ওঁর সম্পর্কে। যোগাযোগ ছিল না একেবারেই। তবু কানে আসত। মন খারাপ হয়ে যেত।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments