কৃষ্ণনগরের চাঁদসড়কে নজরুল
১৯২৬ সালের গোড়ায় নজরুল হুগলী থেকে কৃষ্ণনগর বাস করতে এসেছিলেন, ১৯২৯ সালের গোড়ার দিকে কলকাতায় চলে যান। দিন তারিখ মাসগুলো স্মৃতির কোঠা থেকে হারিয়ে গিয়েছে। ১৯২৬ সালে অবিশ্যি তিনি চাঁদসড়কের ঐ বাড়িতে বাস করতে এসেছিলেন। তবে ১৯২৬ সালের গোড়ায় তৎকালীন অন্যতম কংগ্রেসী নেতা ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রধান সহকারীদের মধ্যে অন্যতম হেমন্তকুমার সরকার নজরুলকে কৃষ্ণনগর নিয়ে আসেন। প্রথমে তিনি এসে ওঠেন হেমন্তকুমারের বড় ভাই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার জ্ঞানচন্দ্র সরকারের গোয়াড়ির একটা বাড়ীতে। বাড়ীটা ছিল অত্যন্ত ঘিঞ্জি জায়গায়। আশেপাশে সবাই অত্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দু যদিও তাঁরা ও তাঁদের ঘরের মেয়েরা নজরুলের গান শোনার জন্য এই বাড়ীতে ভিড় জমাতেন। শেষে চাঁদসড়কের এই মুক্ত বাড়ীতে এসে নজরুল যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন।
সেটাও পাঁচ বিঘে জমির উপর বাড়ী—দুটো বেশ বড় শোবার ঘর, সামনে চওড়া বারান্দা, ভিতর দিকেও তেমনি বারান্দা, একটা ছোট ঘর, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর। বাইরে এক পাশে একটা বড় ইঁদারা। বোম্বাই আমের গাছ এবং তারপরে গুটিকয়েক দেশী আমের গাছ। দক্ষিণ দিকে বাড়ী থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে রেল স্টেশনে যাওয়ার বড় রাস্তা; পশ্চিমদিকে চাঁদসড়ক পাড়ায় যাওয়ার রাস্তা বাড়ীটা থেকে প্রায় ত্রিশ গজ দূরে; এই রাস্তার পশ্চিমে একটা ছোট আমবাগান আগে ছিল মোড়লদের, তাই নাম মোড়লবাগান। এই পথ দিয়ে বাগান পেরিয়ে বাঁ ধারে একটি ছোট খড়ের ঘর ছিল—নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’র মেজবৌদের, তারপরই ছিল আমাদের বাড়ী। পূর্বদিকটা ছিল একেবারে ফাঁকা অনেকদূর পর্যন্ত, উত্তরদিকের সীমানায় একটা ছোট আমবাগান—তারপরই ‘অমন কাথ্লি’ পাড়া। পশ্চিমদিকে অনেক দূর পর্যন্ত কৃষ্ণনগরের বৃহত্তম মুসলমান পাড়া, এরও পশ্চিমে গোয়ালাপাড়া।
নজরুল যে বাড়ীটায় থাকতেন তার ও চাঁদসড়ক পাড়ার একটু সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলাম দুটো কারণে। প্রথমত, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ যারা পড়েছেন বা পড়বেন তাঁরা বইয়ের বিষয়বস্তু ও পরিবেশ একটু ভাল করে বুঝতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, বাড়ীটা ছিল শহরের মধ্যে, অথচ দূরে শহুরে কোলাহলের চিহ্ন এখানে ছিল না, লোকের ভিড় নাই, দলে দলে যুবকেরা এসে ঝামেলা করত না—এ যেন কবির উপযুক্ত স্থান। বাড়ীর উত্তর দিকের ইঁদারা থেকে ৮/১০ গজ দূরে যে বোম্বাই আমগাছটি ছিল সেটার তলায় বসে নজরুল বহু কবিতা, গান ও গজল লিখেছিলেন। ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ গানটিও এই গাছতলাতেই বসে লেখা। গানটি রচনার কয়েক মিনিট পরেই আমি প্রায় নিত্যকার মতো সেখানে গিয়েছিলাম। পড়ে শোনালেন, তারপর বাড়ীর বারান্দায় গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে হার্মোনিয়াম এনে সুর দিলেন, গেয়ে শোনালেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের কৃষ্ণনগর অধিবেশনে এটা ছিল উদ্বোধনী সঙ্গীত। দিলীপ রায় এসে গানের খুব সামান্য একটু পরিবর্তন করেছিলেন। সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র ছিল হার্মোনিয়াম, ক্লারিওনেট ও একটা বিরাট ঢাক। দিলীপ রায় গানে ‘লীড’ দিয়েছিলেন। গান শুনে উচ্ছ্বসিত হয়নি, হাজার হাজার শ্রোতার মধ্যে এমন কেউ ছিল না। তবু সেই অধিবেশনেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের হিন্দু মুসলিম প্যাক্ট নাকচ হয়ে গিয়েছিল।
নজরুল ছিলেন আমার অতি নিকট প্রতিবেশী—মাঝে শুধু একটা ছোট আমবাগান। শুধু প্রতিবেশী বললে সবটা বলা হয় না। নজরুল আমার কাজী-দা ছিলেন না, আমি তাঁর ভক্তের দলভুক্ত ছিলাম না। অথচ, আমাদের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। নজরুল আমার থেকে বছর চারেকের ছোট। লোকে বলে, নজরুল নাকি বড় ছোট মানতেন না। আমি এটা সমর্থন করি না। আমার সঙ্গে তার ব্যবহার ও আচরণ বরাবর একই রকমের ছিল। আমাদের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ছিল না মোটেই। আমার ঘরের কথা তিনি জানতেন, আমি জানতাম তাঁর ঘরের কথা। এমন কি অনেক অন্তরের কথাও।
একটা দৃষ্টান্ত দিই। সৈয়দ আলী আশরাফ তাঁর ‘নজরুল জীবনে প্রেমের একটা অধ্যায়’ বইতে লিখেছেন, ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে নজরুলের প্রেমের কথা একমাত্র কাজী মোতাহার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments