জলকন্যার নাও

সন্ধ্যা ঘনিয়ে ওঠার অনেক আগে থেকেই কড়ইতলার শেকড়ে নাও বেঁধে গোরস্থানের আশপাশটায় ঘুরঘুর করছে কেরায়া নাওয়ের মাঝি মকবুল। তার দোস্ত খায়রুল সেই যে গেছে―এখনও আসছে না দেখে বিরক্তি নিয়ে একটা অস্থিরতার মধ্যে আছে সে। খায়রুলও অপেক্ষা করছিল আরও দুজনের জন্য। অপেক্ষা করে করে বড় রাস্তার দিকে তালাশ নিতে গেছে।

গোরস্থানের শেষ প্রান্তে বিষখালির ভাঙন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ওই শিলকড়ই। এমনই অতিকায় সে―পাঁচজনে হাত ধরাধরি করেও বেড় পাওয়া যায় না বৃক্ষটার। বাকলে ফাটল ধরে পাথর হয়ে আছে। চারদিকে ছড়ানো শ্যাওলাজমা মস্ত ডালগুলোতেও তেমন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদীর এই নির্জনে এটিকে এভাবেই দেখে আসছে সবাই।

একটু আগেই বড় রাস্তার ওপারের মসজিদে ভাঙা ভাঙা গলায় মাগরিবের আজান দিয়েছেন মুয়াজ্জিন। সূর্য ডোবার আগে থেকেই কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে―জমে উঠছে জ্বালাতে থাকা দুধের ফেনাভাঙা সরের মতো। উত্তুরে হাওয়া বেয়ে দিনশেষের ঠান্ডা ছায়া নামতে নামতেই থমথমে গোরস্থানের কাঁটাঝোপে, খানাখন্দে বিচিত্র স্বরে গলা চড়াচ্ছে হাজারো পতঙ্গ। শিয়ালগুলো গর্তের বাইরে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোরের মতো লোকালয়ের দিকে চলে গেছে। থেমে গেছে কড়ইগাছে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য পক্ষীর হল্লা। কেরায়া নাওয়ের মাঝি মকবুল এবং নানকের দুখানা নাও ছাড়া এই ঘোর সাঁঝে কড়ইতলার ঘাট এখন বুকে ভয় ধরানোর মতোই বিরান।

শহরের শেষ প্রান্তের এমন বিরানে বিষখালির এই ভাঙা পাড় জলের দাপটে ভাঙতে ভাঙতে কড়ইতলায় এসে থমকে আছে―নদীর বেপরোয়া স্রোতে ভাঙা পাড়ের মাটি ভেসে গেলে শিলকড়ইয়ের কয়েকটি বিকট শিকড় জলে নেমেছে বিস্তর ডালপালা সঙ্গে করে। বাতাস বেড়ে গেলে, বিশেষ করে বর্ষায় নদীর জলের উল্লাস এসে আছড়ে পড়ে ভাঙা পাড়ের খাড়িতে, গাছটার শেকড়ে। কিন্তু এই পার এখন আর ভাঙে না। এদিককার মানুষের বিশ্বাস শিলকড়ই থামিয়ে দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন।

অতীতে এই ভাঙন কোথায় ছিল, কত দূরে তার ইতিহাস কেউ জানে না। ভাটি-বাঙ্গালার ভাঙা-গড়ার এই জনপদ চিরকালই ইতিহাসবিমুখ। তবে এখনকার গাঙপাড়ের বয়স্ক মানুষজন বলে, ‘বাপ-দাদায় যেই বিষখালির কতা কইত তা ছিলো অনেক দূরে, হেই গাঙ কি আর আছে এহন! এই পাড়ে খাড়াইয়া হেই পাড়ের কিচ্ছু ঠাওর অয় নাই, এমনই হেই গাঙ! আর কী যে সোত, আর কী যে ঢেউ ছিলো হেই গাঙের!’

তখনকার বিষখালিতে যেই স্রোত বইত, যেরকম ঢেউ উঠত আজ আর তার কিছুই অবশিষ্ট নাই। তবুও আজকের বিষখালি এদিকের মানুষের কাছে এখনও তেমনই!

আচ্ছা, শিলকড়ই কি আছড়ে পড়া জলের ওই উল্লাস অনুভব করে? তার শিকড় থেকে দড়ির বাঁধন খুলে কে কখন কোন উদ্দেশ্যে কোন দিকে নাও ভাসায় বা নাও এনে বাঁধে―কারা এসে তার ছায়ায় বসে, সময় ফুরিয়ে গেলে আবার চলেও যায়―সবার মনের খবর কি সে রাখে? কিছু মানুষের সহজ সরল বিশ্বাস―শিলকড়ই সব খবরই রাখে। শত বছরের শত সাক্ষ্য নিয়ে নীলকণ্ঠ সে―সময়ের ছবির মতোই সুস্থির এক ছায়াবৃক্ষ।

কড়ইতলার এই ঘাট কোনো প্রতিষ্ঠিত ঘাট নয়। কবরস্থানের দেয়াল ঘেঁষে পায়ে দলা অস্পষ্ট একটা ক্ষীণ পথ জেগে উঠেছে। সেই পথের ছায়া ধরে আসা নদীপাড়ের হাওয়া খোঁজা মানুষের বিরামের একটা নির্জন জায়গা ক্রমে নাওঘাটে রূপান্তরিত হয়েছে। আসল ঘাট এখান থেকে পোয়া মাইল উত্তরে। ঘন গাছপালার ওধারে। সেখানে ভেড়ানো রয়েছে বিরাট দুটি জেটি। তার একটা অন্যটার চেয়ে কিছুটা ছোট। জেটির পাশেই অসংখ্য সিঁড়িওয়ালা শানবাঁধানো পাকা ঘাট―নানা পদের মানুষের আড্ডা বসে সেখানে―গোসল করা, কাপড় কাচা থেকে শুরু করে যাবতীয় ধোয়াধুয়ির হুল্লোড়ে, ঠেলাঠেলিতে সব সময় অস্থির হয়ে থাকে।

বড় জেটিটায় স্টিমার ছাড়া আর কিছু ভেড়ে না। ছোটটায় ভেড়ে লঞ্চ আর ট্রলার। কেরায়া আর ডিঙ্গি নাওগুলো নিয়ে মাঝিরা জেটির কাছাকাছি প্রায় দশ-বিশ

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice