রোডেসিয়া থেকে ট্রেন
[সামাজিক বৈষম্য, বিশেষ করে বর্ণবৈষম্যের ওপর লিখিত তাঁর গল্পগুলির জন্য সুবিদিত লেখিকা নাডাইন গর্ডিমারের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার এক শ্বেতাঙ্গ পরিবারে। পঞ্চাশ দশকে যখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা সম্বন্ধে তাঁর জোরালো গল্পগুলি লিখতে আরম্ভ করেন তখন ওটা ঠিক ফ্যাশানও ছিল না বা শ্বেতাঙ্গ শাসনের অবিচারগুলোর কথা প্রকট করা যুক্তিযুক্তও ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাহসের এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি তা ব্যক্ত করে গেছেন। অগণিত ছোটগল্প ছাড়া বেশ কয়েকটি উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। ১৯৯১ সালে সাহিত্যের জন্য তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।]
রক্তিম দিগন্তের মধ্যে থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এসে একক সিধা রেল লাইন ধরে সবেগে তাদের দিকে নেমে এলো। স্টেশন মাস্টার তার ছুঁচোলো শালে (chalet) ছাতওয়ালা ইঁটের তৈরি ছোট্ট স্টেশন থেকে বেরিয়ে এলো, তার সার্জের তৈরি ইউনিফর্মের পায়ের ভাঁজগুলো মসৃণ করতে করতে। ধুলোর উপর উবু হয়ে বসা অপেক্ষমান নেটিভ ফিরিওয়ালাদেব মধ্যে দিয়ে প্রস্তুতির একটা শিহরণ বয়ে গেলো, একটা থলির ভেতর থেকে সদা বিস্মিত একটা কাঠের জন্তুর মুখ বেরিয়েছিল। স্টেশন মাস্টারের নগ্নপদ ছেলেমেয়েরা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরতে ঘুবতে এসে হাজির হলো। কারুকার্য করা মাটির একটা দেওয়ালের মধ্যেকার অবিন্যস্ত মাথাওয়ালা ধূসর রঙের মাটির কুঁড়েঘরগুলো থেকে মুরগির পাল আর তাদের হাড়ের ওপর চামড়া ভূর্জপত্রের মতো টান করে টানা কুকুরগুলো বেরিয়ে এসে রেল লাইন ধরে পিকানিনদের (Piccanins—আফ্রিকান শিশুরা) পিছু পিছু চললো। রক্তিমাভঘর্মাক্ত পশ্চিম ক্ষীণ, নিরুত্তাপ একটা ছায়া ফেললো স্টেশনের ‘মালপত্র’ লেখা টিনের চালার ওপর, দেওয়াল ঘেরা ক্রালের (Kraal—বেড়া ঘেরা দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রাম) ওপর, স্টেশন মাস্টারের ধূসর রঙের টিনের বাড়ির ওপর আর বালির ওপর যে বালি চারিদিক পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে, আকাশ থেকে আকাশ পর্যন্ত, ছোট ছোট সব ছায়ার ছন্দভরা পাত্র গড়লো, যাতে করে বালি হয়ে গেলো সমুদ্র, আর বাচ্চাদের কালো কালো পাগুলো আলতোভাবে ঢেকে দিলো কোনো চিহ্ন ছাড়াই।
স্টেশন মাস্টারের স্ত্রী বসেছিল তার বারান্দার জালের আড়ালে। তার মাথার ওপর ভেড়ার মাংসের একটা চাঁই বাতাসের একটা প্রবাহে দুলতে দুলতে একটু খানি নড়লো। তারা প্রতীক্ষা করছিল।
ট্রেনটা ডাক দিলো, আকাশ জুড়ে; কিন্তু কোনো সাড়া মিললো না; ডাকটা শূন্যে ভেসে রইল: আমি আসছি…আমি আসছি।
ইঞ্জিনটা এখন বড় হয়ে ছড়িয়ে পড়লো, বেগে আসছিল পিছনে একটা ক্রমহ্রাসমান দেহ নিয়ে; ইঞ্জিনটাকে ঢুকতে দেবার জন্য রেল লাইনটা ছড়িয়ে গেলো।
ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করতে করতে, ঝাঁকি দিতে দিতে, ধাক্কা মারতে মারতে হাঁফাতে হাঁফাতে ট্রেনটা স্টেশন ভরতি করে দিলো।
এই যে শোনো একবার, ওটা একটু আমায় দেখাও তো—যুবতীটি তার দেহটাকে বাঁকিয়ে করিডোরের জানলা দিয়ে বাইরের দিকে আরও খানিকটা বার করে দিলো। মিসাস (Missus)? তার হাতে ধরা জন্তুগুলোর দিকে তাকিয়ে বুড়ো লোকটি হাসলো। তার ধুসর রঙের আঙুলে আটকানো এক টুকরো সুতো থেকে একটা টুকরি ঝুলছিল। প্রশ্ন করে সে ওটা টেনে তুললো। না, না যুবতীটি জোর দিয়ে বললো, তার দিকে ঝুঁকে পড়ে, ট্রেনের উচ্চতার ওপর থেকে কম্বলের টুকরো পরা লোকটির দিকে; ঐ যে, ঐটা, ঐটা, যুবতীর হাতটা দাবি করলো। ওটা ছিল একটা সিংহ, স্পঞ্জ কেকের মতো দেখতে নরম শুকনো কাঠে খোদাই করে বানানো, হেরালডিক (heraldic—কুলচিহ্নসূচক), সাদা আর কালো, ইমপ্রেসানিস্টিক পদ্ধতিতে (Impressionistic), ছোটোখাটো অলঙ্কারগুলো, গরম লোহার ছেঁকা দিয়ে দাগানো। তখনও মন থেকে নয় খদ্দেরের জন্য কাষ্ঠহাসি হেসে বুড়ো লোকটি সিংহটা যুবতীটির দিকে তুলে ধরলো। শ্রবণের অতীত এক অতি ভয়ঙ্কর অন্তহীন গর্জনে খোলা মুখের ভেতর ভানডাইক (Vandyke) দাঁতগুলোর মাঝখানে ছিল কালো একটা জিভ। শোনো, অল্পবয়সী স্বামীটি বলেছিল কিছু যদি মনে না করো। সিংহটার ঘাড়ে জড়ানো একটুকরো লোমওয়ালা চামড়া (ইঁদুরের, খড়গোশের, মীরক্যাটের?); একটা সত্যিকারের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments