আমার বন্ধু নজরুল
রাণীগঞ্জের ইস্কুলে তখন আমাদের ক্লাশ বসে দোতলায়।
পশ্চিমদিকে বড় বড় জানলা। সেই খোলা জানলার পথে দেখলাম, দলে দলে লোক ছুটছে রেললাইনের দিকে। কি ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। ইস্কুলের ছেলে—ক্লাশ ছেড়ে যেতেও পারি না। সবাই ভাবছে, ছুটি হোক, ছুটি হলেই ছুটবো ওইদিকে।
ছুটি হলো। বাইরে বেরিয়েই শুনলাম, সাঁওতালদের একটা মেয়ে নাকি কাটা পড়েছে ট্রেনের তলায়। তার মৃতদেহটা পড়ে আছে লাইনের ধারে।
ইস্কুলের ছেলেরা অনেকেই গেল দেখতে। আমার কিন্তু একা যেতে মন সরলো না। কিছুদিন ধরে কি যে হয়েছে নজরুলের সঙ্গে দেখা না হলে বিকেলটা মনে হয় মাটি হয়ে গেল।
নজরুল পড়ে শিয়াড়শোল ইস্কুলে, আমি পড়ি রাণীগঞ্জে। এক এক সময় আফশোষ হয়—এক ইস্কুলে পড়লাম না কেন? কিন্তু উপায় নেই।
বাড়িতে বই-খাতা রেখেই ছুটলাম।
বাগানে গিয়ে দেখি, পুকুরের শান-বাঁধানো ঘাটের চত্বরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে নজরুল। দু’হাত দিয়ে বুক বাজাচ্ছে, গুঁক গুঁক করে ডুগি-তবলার বোল বলছে আর গান গাইছে।
আমাকে দেখেই তার সঙ্গীত বন্ধ হয়ে গেল। উঠে বসেই বললে, অনেকক্ষণ এসেছি।
বেশ করেছ। চল।
কোনও কথা বলবার অবসর না দিয়েই দু'জনে ছুটলাম রেল-লাইনের দিকে। মুসলমানপাড়ার ভেতর দিয়ে, শেকার-সাহেবের বাঙলো পেরিয়ে, অলিতে-গলিতে এঁকেবেঁকে হাঁপাতে হাঁপাতে লাইনের ধারে গিয়ে যখন পৌঁছোলাম, দেখি সব ভোঁ-ভাঁ। কেউ কোথাও নেই। গোটাকতক ছাগল চরছে শুধু লাইনের ওপর।
কাকেই-বা জিজ্ঞাসা করি?
নজরুল তো দু’হাত তুলে ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে গান ধরে দিলে:
আহা কি দেখালে হরি!
শ্যামের বামে রাই-কিশোরী!
কাঠের স্লিপারের ওপর পা দিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
ও মশাই, শুনছেন?
এক ভদ্রলোক লাইন পার হচ্ছিলেন ছাতি মাথায় দিয়ে। তাঁকেই জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে একটা মেয়ে কাটা পড়েছিল জানেন?
জানি।
কি হলো বলতে পারেন?
পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে গেছে অনেকক্ষণ।
বাস, খতম। হয়ে গেল আমাদের অভিসার-যাত্রা।
সামনে এগেরা যাবার পাকা রাস্তা। রাস্তার দু’দিকে বড় বড় গাছ। লাইন থেকে নেমে সেই রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কোথায় যাব ভাবছি। নজরুল বললে, আমি আর হাঁটতে পারছি না। বসলাম।
গাছের তলায় কচি কচি ঘাস গজিয়েছে। শাখায়-প্রশাখায় পত্রে-পল্লবে মাথার ওপর আকাশ দেখা যায় না। ছায়াস্নিগ্ধ জায়গাটি বড় মনোরম। ঘাসের ওপর নজরুল শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে বুক বাজিয়ে আবার শুরু হলো তার সঙ্গীতচর্চা।
গাছের তলায় দু’জন পাশাপাশি শুয়ে।
হঠাৎ মোটরের হর্নের শব্দে চমকে উঠলাম। চেয়ে দেখি, পথের ওপর একটা মোটর এসে দাঁড়িয়েছে।
হুডখোলা মোটর। যিনি চালাচ্ছিলেন তিনি ইংরেজ। আমাদের দিকে তাকিয়ে কি যেন তিনি বললেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে।
নজরুল বললে, আমাদের ডাকছে।
গেলাম এগিয়ে। কিন্তু কি যে বলছেন ভদ্রলোক, এক বর্ণ বুঝলাম না।
সেকেণ্ড ক্লাশে পড়ছি। ছাপা বই পড়তে পারি। মানেও বুঝি কিছু কিছু। কিন্তু খাস ইংরেজের কথা বুঝবার ক্ষমতা তখনও হয়নি। নজরুল তাকাচ্ছে আমার দিকে, আমি তাকাচ্ছি তার দিকে। গাড়ির পেছনে কমবয়েসী যে মেয়ে দুটো বসেছিল, তারা তখন মুখ টিপে টিপে হাসছে।
সাহেবের পাশে যে ভদ্রমহিলা বসেছিলেন, তিনি গাড়ির দরজা খুলে নামলেন। আমাদের কাছে এসে বললেন, ছেলেসকল এসোনসোল কেটো দূর বলিতেছি।
নজরুল বলে উঠল, দে গরুর গা ধুইয়ে। তা এতক্ষণ বলতে হয় মা-ঠাকরুণ!
এবার মা-ঠাকরুণের পালা! কিছু বুঝতে না পেরে তিনি হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে।
বললাম, ভুল পথে চলে এসেছেন আপনারা।
নজরুল বললে, পিছু হঠে গিয়ে গ্র্যাণ্ড-ট্রাঙ্ক রোড ধরতে হবে।
বাঙলা-জানা মেমসাহেব ভেবেছিলাম এবার সবই বুঝতে পারবেন। কিন্তু ‘ভুল’ কথাটা তখন তাঁর মাথায় ঢুকে গেছে। এখনও আমার মনে আছে—কি বিপদেই না পড়েছিলাম সেদিন। আমি যত বলি—‘ভুল হয়েছে আপনাদের,’ উনি তত বলেন, ‘নো। ভুল আমার
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments