পাগড়ি
রাস্তার ধারে ধুলোভারাচ্ছন্ন বৈঠকখানায় বসে খানবাহাদুর মোত্তালেব সাহেব ভাবেন। ভাবেন যে সে-কথা তাঁর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চোখের নিচে মাংসের থলে। বড় গোছের চোখ দুটো তার মধ্যে ভারি দেখায়। অনেকটা মার্বেলের মতো। তাও ড্রেনের কোণে হারিয়ে যাওয়া নিশ্চল মার্বেল।
তিনি তাঁর বয়সের কথা ভাবেন। তাঁর সমগ্র মাথায় আজ পক্ককেশ, কিন্তু তার জন্যে বয়সকে দোষ দেওয়া যায় না। বিস্তারিত ওকালতি ব্যবসা সৃষ্টি করবার জন্যে যে কঠোর শ্রম করেছেন বছরের পর বছর, সে-শ্রমই পক্ককেশের জন্যে দায়ী। পক্ককেশ মিথ্যার একটি প্রলেপ মাত্র। এ কথা ঠিক যে, যারা তাঁর বয়সের কথা জানে না এবং চুলের অকালপক্বতার খোঁজ রাখে না, তারা তাঁকে বৃদ্ধ বলেই মেনে নেয়। তাঁর বৈঠকখানায় যে মক্কেলের ভিড় তার প্রধান কারণও ঐ শুভ্রতা, চুলের বর্ণহীন রুপালি বিন্যাস। তারপর তাঁর বড়-বড় ছেলেমেয়েদের দেখেও তাঁর বয়স সম্বন্ধে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। তবে তার কারণ এই যে, অল্প বয়সে অধ্যয়ন শেষ করে তিনি বিয়ে করতে দু-দণ্ড সবুর করেন নাই। বয়সের বাহ্যিক এ-সব চিহ্ন থাকলেও তাঁর বয়স বেশি নয়। তিনি বয়সের ভার তো বোধ করেনই না, তিনি যুবকের তেজ-বলের অধিকারী বলেই মনে করেন। এখনো তাঁর শরীরের বাঁধন শক্ত, তাঁর মেরুদণ্ড ঋজু। তাঁর দেহে এখনো শক্তি আছে, মনে আশাও আছে। ভবিষ্যৎ তাঁর চোখে এখনো ছায়াময় হয়ে ওঠে নাই ৷
এ-পর্যন্ত ভেবে মোত্তালেব সাহেব থামেন। তিনি উকিল মানুষ। সারাজীবন দেয়ালের আলমারিতে ঠাসা আইনের কেতাবগুলি কোরানের মতো হেফজ করেছেন। কাজেই কোনো কথা তলিয়ে বা নজির খতিয়ে বিচার না করে দেখলে মনে শান্তি পান না। তাই সত্যসন্ধানীর অদম্য উৎসাহ নিয়ে কথাটা গোড়া থেকে আবার ভেবে দেখেন। অবশেষে তিনি নিঃসন্দেহ হন যে, তাঁর মাথার চুল সাদা হলেও এবং তাঁর ছেলেমেয়েরা বড়সড় হলেও তাঁর বয়সটা তেমন নয়। এবার তিনি তাঁর চিন্তাধারার পরবর্তী পর্যায়ে অগ্রসর হন। একটু সন্তর্পণেই অগ্রসর হন, কিন্তু তাঁর পদস্খলন হয় না।
তিনি ভাবেন, হোক তাঁর চুল সাদা, হোক তাঁর ছেলেমেয়েরা বয়স্থ, তবু তাঁর যখন বয়সটা তেমন নয়, তখন তিনি যদি পুনর্বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে সে-ইচ্ছার বিরোধিতায় বয়সের যুক্তিটি তোলা যায় না। পূর্ববৎ এ-কথাটাও তিনি আবার ভেবে দেখেন। সে-বিষয়ে নিশ্চিত হলে তৃতীয় পর্যায়ে তিনি উপস্থিত হন। সে-পর্যায়ে বিরাজ করে তাঁর সন্তানসন্ততি।
এখানেই খানবাহাদুর মোত্তালেব সাহেব ঠেকে যান। তাঁর ছেলেমেয়েরাই তাঁর চিন্তাধারার পথে বাধা সৃষ্টি করে। একবার নয় বারবার।
বৈঠকখানার নিঃশব্দতার মধ্যে গুড়গুড়ির মিষ্টিমধুর গন্ধ ভুরভুর করে, হালকা নীলাভ ধোঁয়া পাক খেয়ে হঠাৎ পথ খুঁজে পায় না।
তিনি অবশ্য বেশিক্ষণ স্থির হয়ে থাকেন না, শীঘ্র নতুন উদ্যমে তিনি নিজের জীবন পর্যালোচনা করে দেখেন। তিনি দেখতে পান, সারাজীবন তিনি জটিল আইনের অলিগলিতে অশ্রান্ত কীটের মতো ঘোরাঘুরি করেছেন, আদালতে গভীর অনুভূতির সঙ্গে বক্তৃতা দিয়েছেন, কখনো চিৎকার করেছেন, কখনো হেসেছেন, কখনো ব্যঙ্গ করেছেন, অশ্রু ফেলেছেন, সময়-সুযোগ পেলে আপন আত্মমর্যাদা বজায় রেখে খাসকামরায় গিয়ে হাকিমকে সালাম ঠুকতেও দ্বিধা করেন নাই। ফলে পসার করেছেন, পয়সা করেছেন। শহরে দোতলা বাড়ি তুলেছেন, দেশের কাঁচা বাড়ি পাকা করেছেন, মসজিদ দিয়েছেন ছোয়াবের আশায়, পুকুর কেটেছেন পাড়াপড়শীর অসুবিধার কথা ভেবে। তাঁর বদান্যতা-সততার জন্যে মান-যশ ও অর্জন করেছেন। অবশ্য নিন্দুকরা বলে, কোনো এক গোরা রেজিমেন্টকে সান্ধ্যভোজ খাইয়ে খানবাহাদুর পদবিটা করায়ত্ত করেছেন। সে-কথা ভিত্তিহীন জনরব, নিছক হিংসাত্মক কুৎসা।
এই তো গেল তাঁর বাইরের জীবন। তাঁর ঘরের কথা কিন্তু অন্য রকম। বাইরে তাঁর কর্মবহুল জীবন তাঁকে যশ-মান-অর্থ দিলেও তার ব্যক্তিগত জীবন তাঁকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করেছে। তাঁর প্রধান কারণ তার স্ত্রীর মস্তিষ্কবিকৃতি। পঞ্চম সন্তানের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments