পলাতকা
“ধরো ওকে! ওকে ধরো তোমরা!” চিৎকারে সবুজ পাহাড় আর ইতঃস্তত বিক্ষিপ্ত ঝোপে ঢাকা পর্বতে ঘেরা উপত্যকার মধ্যে আরামে গা ঘেঁষে থাকা পিরিচের আকারের গ্রামটার নিস্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছিল।
পাহাড়ের চূড়ো থেকে প্রতিধ্বনিগুলো মাঝ আকাশে ধাক্কা খেয়ে তালগোল পাকানো কলরবে ছিটকে পড়েছিল, গমগম সেই শব্দ আমাদের কানের মধ্যে বিঁধে গিয়ে অন্য সব শব্দ আটকে দিয়েছিল।
ওয়েহ ওয়েহ ওয়েহ খাউউ খাউউ লেহ লেহ লেহ লেহ তুউ তুউ তুউ এক মুহূর্ত আগেও যেসব ন্যাকড়ার পুতুল নিয়ে আমরা নির্বিষ্ট হয়ে ছিলাম একটা শক্তিশালী চুম্বকের মতো সোরগোলটা তার থেকে আমাদের টেনে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।
ইইই-ইইই-উউ-উউউউউ!
এম এম বা-এম বিই ই ই হ হ হ-নি!
খা আ আ-উউ-লী-লী-লা আনি!
এক বুড়ো: তার মাথার ওপরের ধূসর ক্ষুদে ক্ষুদে শক্ত করে পাকানো পশমের স্প্রিংগুলো আঁটসাঁট একটা টুপির মতো লাগছিল। স্খলিত পায়ে আমার পাশ দিয়ে সে চলে গিয়েছিল, দেখে মনে হয়েছিল দৌড়বার জন্য সে যেন আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তার গায়ে ঢিলেঢালাভাবে জড়ানো কম্বলটা সে বাঁ হাত দিয়ে চেপে ধরেছিল। তার কাঁধ থেকে ডান হাত পর্যন্ত এমনভাবে বেরিয়ে ছিল যে মনে হচ্ছিল সেটা যেন একটা টোগার থেকে বেরিয়ে আছে। রোগা, লম্বা আর অস্থিসার হাতটা তার অভিপ্রেত দ্রুততর গতির সঙ্গে তাল রেখে সামনে পিছনে দুলছিল। হাতে উঁচু করে ধরা একটা নকবেরি (মুণ্ডি দেওয়া লাঠি) বাইরের দিকে বেরিয়েছিল। যতবার সে “এমবা এমবেনি! ওকে ধরো!” বলে চিৎকার করছিল ততবারই নকবেরি ধরা হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে লাঠিটা দিয়ে পাহাড়ের দিকে দেখাচ্ছিল।
আমার দৃষ্টি তার নির্দেশিত জায়গাটার দিকে ধেয়ে চলে গিয়েছিল। পাহাড়টা সূর্যের সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল। না কি মেঘেদের সঙ্গে? যে যাই হোক পাহাড়ের অর্ধেকটা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল বাকি অর্ধেকটার দিকে আবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছিলাম।
সেখানে দূরে ছোট হয়ে আসা মানুষগুলো ছোটাছুটি করছিল, তাড়াহুড়ো করে ঠেলাঠেলি করতে করতে দৌড়োচ্ছিল।
তাদের আগে একপাল কুকুরে তাড়ানো খরগোশের মতো মাত্র একজন মানুষ সবেগে ছুটে চলেছিল। আমি লক্ষ্য করেছিলাম মেঘেরা কিন্তু অলস খেলুড়ে ছিল না। এই খেলায় তারা ছিল তৃতীয় পক্ষ, আর কার্যকর তারতম্য তারাই ঘটাবে।
সেই দিনই আমি পরিষ্কারভাবে অশ্রুর জন্ম দেখেছিলাম। মেঘেরা কেঁদেছিল আর নিস্তব্ধ পাহাড়টার ওপর হালকা কুয়াশার অশ্রু ঝরিয়েছিল। পলাতক মানুষটি কি সময় মতো কুয়াশার কম্বলের মধ্যে পৌঁছতে পারবে? সূর্য হেসে উঠেছিল আর কুয়াশা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল দীর্ঘ তপ্ত, হলুদ রঙের ছুঁচের ফোয়ারার মধ্যে, সূর্যের সন্তান-সন্ততি যে তারা।
ঐখানে সে ছিল, পরিষ্কারভাবে আমি তাকে দেখতে পেয়েছিলাম। ওর পিছনে ধাওয়া করা লোকগুলোও নিশ্চয়ই ওকে দেখতে পাচ্ছে?—আমি যেমনভাবে তাকে দেখতে পাচ্ছি ঠিক তেমনি ভাবে?
আমার ভেতরটা গুলিয়ে উঠেছিল। আমার পেটের মধ্যে আশঙ্কার একটা গোলা দলা পাকিয়ে উঠেছিল। কিন্তু মেঘেরা হার না মেনে কেঁদে চলছিল। ঘন, মোটা, গাঢ় ধূসর রঙের সব বল্লম ঝরে পড়ছিল। ক্ষিপ্র গতিতে আর সজোরে তারা নেমে আসছিল। ঘন, মোটা; তার মধ্যে গা ঢাকা দেওয়া আর তার পিছনে ধাওয়া করে আসা লোকগুলোর কাছে হারিয়ে যাওয়াটা মেয়েটির পক্ষে নিরাপদের ছিল।
“উইয়ে ফি? কোথায় গেলো সে?”
তাকে ধরার জন্য যারা বদ্ধ পরিকর তাদের আর্তনাদের শব্দ আমার কানে এসে পৌঁছেছিল। আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করেছিলাম, মেয়েটির সঙ্গে প্রবলভাবে চেষ্টা করছিলাম, চাইছিলাম সে যেন ওদের এড়িয়ে যেতে পারে, দূরে আরও দূরে চলে যাওযার জন্য তাকে উৎসাহিত করছিলাম।
শেষবারের মতো তাকে দেখেছিলাম, নীল রঙের জার্মান প্রিন্টের পোশাকটা তার দূরত্ব আর আলোর অভাবে হালকা আসমানী রঙ হয়ে গেছে… ঐ তো ঐখানে সে পাথরের চাঙরের মধ্যে দিয়ে ইতস্ততভাবে ছুটে চলেছে, তার পরনের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments