-
নদী কিংবা প্রবহমান জলধারাকে নানারূপে ও প্রতীকে তুলে ধরার চেষ্টা বাংলাসাহিত্যে এক ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য। কবিতা, গান, ছোটগল্প ও উপন্যাসে একাধিক লেখকের হাতে নদী নানা ভূমিকায় উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথসহ পরবর্তী যুগের আধুনিক কবিদের অনেকে এই বিশেষ দিকে তাঁদের মেধা ও সময় ব্যয় করেছেন। আধুনিকদের মধ্যে এ বিষয়ে কবি বিষ্ণু দে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
নাম উল্লেখ না করে বলা যায় এদের মধ্যে কেউ চঞ্চলা জলস্রোতে গতির সৌন্দর্য বা বেগের আবেগ লক্ষ করে অভিভূত, কেউ উদাসী জলধারায় মল্লার বা টোড়ির বিষণ্ণতা অনুভব করেন। আবার কেউ নদীস্রোতের উজান-ভাটিতে জীবনের তাৎপর্যময় রূপ খুঁজে পান এবং সে ধারায় ভেসে সচ্ছল জীবনের উন্মুক্ত পত্তনে পৌঁছাতে চান। অন্য
-
মহাকালের প্রবাহে ভাসমান জীবনের ধারাবাহিক যাত্রা বহুকাল ধরে চলে আসছে। এক মুহূর্তও না থেমে এই অবিরাম চলা এরই মধ্যে জীবন কোথাও কোথাও হয়ে উঠছে মহাজীবন, রেখে যাচ্ছে স্থায়ী চিহ্ন। অস্তিত্বের প্রখর বৈশিষ্ট্যে কোনো কোনো বিরল ব্যক্তিত্ব কালের বুকে খোদিত করে যাচ্ছেন নিজ নাম, নিজের কীর্তি। প্রত্যয়-শীলিত বক্তব্যের ও কর্মের অভিজ্ঞান ঐতিহ্য-মন্দ্রিত অতীতকে বহন করে, সমকালীন যুগ চেতনা ধারণ করে বর্তমানের সীমা অতিক্রম করে ভাবীকালের জন্য রেখে যাচ্ছে পাথেয়, পথের সন্ধান দিয়ে আহ্বান করছে প্রার্থিত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
তেমনি একজন সত্যান্বেষী জ্ঞানসাধক, ভাবসম্পদ সমৃদ্ধ আদর্শবাদী, সৃষ্টিশীল স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বিশ্বের বিপুল কর্মযজ্ঞের অক্লান্ত ও শ্রমনিষ্ঠ মহান পুরুষ কবি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর জন্মের আগে থেকেই
-
এক
রবীন্দ্রনাথের জীবনের লক্ষ্য ছিল—মনুষ্যত্বের সাধনা। সে সাধনা দেশকাল বা বিশেষ ধর্মমতের গণ্ডিতে ঠেকে থাকে না। সেই জীবনসাধনার কথা তাঁর নানা রচনায় বার বার প্রতিফলিত হয়েছে। ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থটির বক্তব্য আলোচনা সূত্রে ঐ প্রসঙ্গটি আমরা এখানে তুলে ধরব।
সকল মানুষের ভিতরেই এমন একটি বিশিষ্টতা আছে, যার সার অংশ দিয়ে কালে কালে দেশে দেশে তৈরি হয়ে ওঠে একটি মানবসত্তা। রবীন্দ্রনাথ বলছেন—এই সত্তাটি হচ্ছে “সর্বজনীন সর্বকালীন মানব”। আপন জীবসত্তার দিনানুদৈনিক প্রয়োজনের সীমানা পার হয়ে সেই মানবসত্তার উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ হতে হয় মানুষকে। উপলব্ধিতে একদেশদর্শিতার সংকীর্ণতা বা বিকৃতি থাকলে সাধনা অসফল থেকে যাবে। মানুষের জানা হবে না আপন আত্মা বা আত্মস্বরূপ তথা সত্যকে। সীমা
-
বৈশাখে আমি বাংলাদেশে আসি এবং বাংলা একাডেমীর একটি সভা দিয়ে আমার এখানকার কার্যক্রম শুরু হয়। আবার বাংলা একাডেমীর সভা দিয়েই দেখছি আমার এখানকার কার্যক্রম শেষ হতে চলেছে। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা। বাংলা একাডেমীকে, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবার এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। আপনারা যাঁরা আজকের এই সভায় উপস্থিত আছেন—তাঁদের সবাইকেও এই সঙ্গে আমার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের সভার বিষয় বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহাশয় এইমাত্র আপনাদের জানিয়েছেন।
এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি কল্পনা করা যায় তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তবে তাঁর শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষার তাঁদের প্রয়োজন যারা সম্পূর্ণ নন। জন্মসূত্রেই সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর কোনো সত্তার শিক্ষার
-
এক
১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ রাত্রে রবীন্দ্রনাথের প্রজ্বলিত মরদেহের সামনে দুঃখছিন্ন আরেক বয়ঃকনিষ্ঠ কবি গভীর বেদনায় বলে উঠেছিলেন, এই একটি লোকের চলে যাওয়ায় এখন থেকে সব পাল্টে গেল। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রায়-দৈবী সেই উচ্চারণের যাথার্থ্য যত দিন গেছে তত বেশি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে। মৃত্যু যখন জীবন থেকে ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নেয় তখন শূন্যতা নেমে আসে হয়তো এক বা একাধিক ব্যক্তির জীবনে, হয়তো-বা একটি কি দুটি পরিবারে। সেই ফাঁকটুকু ধীরে ধীরে ভরে দেয় সময়। জীবন নিরবধি বয়ে চলে, মৃত্যু ক্রমশ দূরস্মৃতি হয়ে থেকে যায়। বকরূপী রাক্ষস যুধিষ্ঠিরের নিকট যখন সপ্ত পরমাশ্চর্যের ধাঁধা ধরেছিলেন তখন ধর্মপুত্র একটি উত্তরে বলেছিলেন, ‘এক পরমাশ্চর্য হলো এই যে,
-
এক
‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক সাহিত্য’ বিষয়ে কিছু বলবার জন্যে আমি আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আমার আলোচ্য বস্তুর দু’টি অংশের প্রথমটি, অর্থাৎ ‘রবীন্দ্রনাথ’ (১৮৬১– ১৯৪১) যেমন স্পষ্ট, পরবর্তী অংশ ‘আধুনিক সাহিত্য’ তেমনি অনচ্ছ। সুতরাং আলোচনার মর্মে প্রবেশের আগে এই বিষয়টি আমি একটু স্বচ্ছ ক’রে নিতে চাই।
আমার লক্ষ্য, আধুনিক সাহিত্যের যে-অংশ বাংলা ভাষায় রচিত সেটি। আবার অ্যাকাডেমিক আলোচনায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলতে মাইকেল বা বঙ্কিমচন্দ্র অর্থাৎ উনিশ শতাব্দী থেকে ধরা হয়; কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্র থেকে আধুনিক সাহিত্যের সূচনা বলে মনে করেন: আমি এই রচনায় আধুনিক সাহিত্য বলতে বুঝিয়েছি রবীন্দ্রোত্তর অর্থাৎ মোটামুটিভাবে তিরিশের দশকের প্রগতি-কল্লোল-কালিকলম-কবিতা-পরিচয় ইত্যাদি পত্রিকা–বাহিত নতুন সাহিত্যকে।
-
ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের কৃতির মূল্যায়ন খুব একটা কম হয় নি। পশ্চিমবঙ্গে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, পবিত্র সরকার, সুনীল সেনগুপ্ত; বাংলাদেশে মুহম্মদ আবদুল হাই, কাজী দীন মুহম্মদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্; বিদেশে, রাশিয়ায় এ. এম. বিকোভা রবীন্দ্রনাথের ভাষাসংক্রান্ত রচনাবলির অনুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে কবির ভাষাতাত্ত্বিক প্রজ্ঞার গভীরতায় বিমুগ্ধ হয়েছেন। এদেশে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের উদ্গাতা মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন:
... বিস্ময়ের বিষয় এই যে যাঁকে আমরা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং বাংলাভাষার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ কবি বলে জানি; সেই কবি রবীন্দ্রনাথই বাংলাভাষার বর্ণনাভিত্তিক আলোচনার জনক এবং পথিকৃৎ হয়ে রয়েছেন (হাই ১৩৬৮: ৬৯)।
ভাষাতাত্ত্বিকেরা রবীন্দ্রনাথের দুটো ভাষাসংক্রান্ত গ্রন্থ ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ ও ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ বিশ্লেষণ করে তাতে বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব,
-
মেঘ-বৃষ্টি রবীন্দ্রসাহিত্যে নানা বর্ণিলতায় ও বিবিধ মাত্রায় রূপ লাভ করেছে; রবীন্দ্র-চেতনায় তা কখনো হয়ে উঠেছে বেদনা ও সংবেদনাময়, আবার কখনো-বা উপনিষদের মন্ত্রবিজড়িত তত্ত্বময়। নিরুদ্দেশ উদ্বেগ, সূক্ষ্মরহস্য, desolation ও বিরহবিষাদ, বৃন্দাবনের স্মৃতিমুখর অভিসার এবং ক্ল্যাসিক না-পাওয়ার অনুভূতি—মেঘ-বৃষ্টি তথা বর্ষার হাত ধরেই, রবীন্দ্রসাহিত্যে, সূচনামুহূর্ত থেকে চলাচল করেছে। প্রাচীন ভারতের নিভৃত বৃষ্টি, সন্ত্রস্ত অভিসারিকা, প্রতীক্ষা—উৎকণ্ঠিতা নায়িকা, রামগিরির ঘনায়মান মেঘ—এসব রবীন্দ্রকবিতায়, চিরদিন জন্ম দিয়েছে এক গতিশীল রোম্যান্টিক ব্যাকুলতার। এসব স্মৃতিদীপ্ত কল্পনায়, রবীন্দ্রনাথ এক উজ্জ্বল মহানুভবতায় ত্রিকালের ভেদরেখাকে বিলুপ্ত করে দেন; তিনি সত্য হয়ে ওঠেন প্রত্নকল্পে, স্মৃতি-বিস্মৃতিতে, অনন্ত কালের রূপ ঐশ্বর্যে। এ-সূত্রে এসে পড়বে তাঁর দার্শনিক সত্তার কথা। উপনিষদ-পরিশ্রুত বিশিষ্টদ্বৈতাদ্বৈতবাদী রবীন্দ্রনাথের মেঘ-বৃষ্টি তথা প্রকৃতি বিশ্বপ্রাণের
-
বিবিক্ত, বিষণ্ন ও ভয়াবহভাবে নির্জন এই কালে লোকসাহিত্যের চর্চা, পঠন-পাঠন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা আমাদের চেতনার শরীরে স্নিগ্ধ মধুর প্রলেপের মতো। লোকসাহিত্যের সরল সহজ অনাড়ম্বর পৃথিবী একমাত্র ঠাঁই যেখানে মুখ লুকোবার মতো জায়গা আছে, অন্তত পিতৃমাতৃহীন এ-যুগে। লোকসাহিত্যের মধ্যে যুক্তিশাস্ত্রের নিয়মকানুন মানবার তেমন আয়োজন নেই অথচ শুধু তারই ভিতরে পর্যাপ্ত হৃদয় একেবারে ছড়িয়ে আছে, আর সেখানেই আমরা পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সংলাপে স্নিগ্ধ হতে পারি। একালের ধূসর সৃষ্টিহীন মুহূর্তে লোকসাহিত্য দেশের বিপুল জনসাধারণের সঙ্গে একাত্ম হতে শেখায়, আমাদের একাকিত্ববোধ, স্বল্পকালের জন্য হলেও, মুখর জনকণ্ঠের মধ্যে হারিয়ে যায়, ব্যক্তির আলাদা নির্জন অস্তিত্ব জন-অস্তিত্বের স্বাদ পায়, তদুপরি দেশ-কাল-পাত্রের দিগ্বলয় বিশ্ববলয়ের মধ্যে স্থিতি পায়, আমাদের বিষাক্ত
-
রবীন্দ্রসাহিত্য বিরাট মহাসাগরের মতো। তার কোথায় কি আছে, কোথায় কত গভীরতা এসব নির্ণয় করা যেমন-তেমন কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের কোনো এক কবিতায় তিনি তাঁর অনবদ্য ভঙ্গিতে অজানা বন্ধুকে যা বলেছিলেন, তার মর্মার্থ অনেকটা এই : হে বন্ধু, লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে চিনি কিনা? আমি গর্ব করে বলি ‘হ্যাঁ চিনি।’ কিন্তু তারা যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কেমন? তখন কি যে বলবো, বুঝতে পারিনে ; কেবল বলি কি জানি? তারা তখন বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়। দেখ, আমি যে তোমাকে একেবারে চিনিনে তাই বা কেমন করে বলি? কত সকাল-সন্ধ্যা-দুপুরে আভাসে-ইঙ্গিতে হৃদয়ে তোমার স্পর্শ পেয়েছি, অভিভূত হয়েছি, কিন্তু নিশ্চয় করে ত কিছুই বলতে
-
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের “য়ূরোপ-প্রবাসীর পত্র” প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে—বলা হয় সেই থেকে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের শুরু। লক্ষণীয় কোনো উপন্যাস রচনার আগেই রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—আরো দুবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালে বেরোয় ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। কিন্তু যে সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য ঐ সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে বেরিয়েছিল, তৎকালীন প্রচলিত গদ্যের মাপে শুধু হয়, আধুনিকতার যে কোনো মাপকাঠিতেই তা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ও গদ্য ভাষার যে ফর্মটি দেখা যায় তা “য়ূরোপ প্রবাসীর” গদ্যে প্রচ্ছন্ন, এবং বোধ করি তা থেকে উদ্ভূত। বস্তুত গদ্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হলে
-
বৈশাখ মাস এলেই অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রুদ্র রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক রুদ্র রূপের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৈশাখ আসে মানুষের জীবনের সমস্ত জীর্ণতাকে উড়িয়ে নিতে। জীর্ণতা, অসদ্ভাব, অকল্যাণ এবং যে নির্যাতন মানুষের জীবনের মধ্যে প্রত্যহ গড়ে উঠেছে, সে নির্যাতন এবং অসদ্ভাবের বিরুদ্ধেই বৈশাখ তার কল্লোলিত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সে কারণেই তিনি বলেছেন, যে রুদ্র বৈশাখ এখন এলো তার সঙ্গে আমি যদি সামঞ্জস্য বিধান নাও করতে পারি তাহলে আমাকে পথের এক প্রান্তে রেখে দাও, দাঁড়িয়ে আমি সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চলাচল দেখবো, সমস্ত মানুষ যে পথে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে
ক্যাটাগরি
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.