গল্পগুচ্ছে মেঘ-বৃষ্টি: রূপ-রূপান্তর

মেঘ-বৃষ্টি রবীন্দ্রসাহিত্যে নানা বর্ণিলতায় ও বিবিধ মাত্রায় রূপ লাভ করেছে; রবীন্দ্র-চেতনায় তা কখনো হয়ে উঠেছে বেদনা ও সংবেদনাময়, আবার কখনো-বা উপনিষদের মন্ত্রবিজড়িত তত্ত্বময়। নিরুদ্দেশ উদ্বেগ, সূক্ষ্মরহস্য, desolation ও বিরহবিষাদ, বৃন্দাবনের স্মৃতিমুখর অভিসার এবং ক্ল্যাসিক না-পাওয়ার অনুভূতি—মেঘ-বৃষ্টি তথা বর্ষার হাত ধরেই, রবীন্দ্রসাহিত্যে, সূচনামুহূর্ত থেকে চলাচল করেছে। প্রাচীন ভারতের নিভৃত বৃষ্টি, সন্ত্রস্ত অভিসারিকা, প্রতীক্ষা—উৎকণ্ঠিতা নায়িকা, রামগিরির ঘনায়মান মেঘ—এসব রবীন্দ্রকবিতায়, চিরদিন জন্ম দিয়েছে এক গতিশীল রোম্যান্টিক ব্যাকুলতার। এসব স্মৃতিদীপ্ত কল্পনায়, রবীন্দ্রনাথ এক উজ্জ্বল মহানুভবতায় ত্রিকালের ভেদরেখাকে বিলুপ্ত করে দেন; তিনি সত্য হয়ে ওঠেন প্রত্নকল্পে, স্মৃতি-বিস্মৃতিতে, অনন্ত কালের রূপ ঐশ্বর্যে। এ-সূত্রে এসে পড়বে তাঁর দার্শনিক সত্তার কথা। উপনিষদ-পরিশ্রুত বিশিষ্টদ্বৈতাদ্বৈতবাদী রবীন্দ্রনাথের মেঘ-বৃষ্টি তথা প্রকৃতি বিশ্বপ্রাণের লীলাবৈচিত্র্য; এর মাঝ দিয়েই তিনি বিশ্বদেবতার সান্নিধ্য লাভ করেন। এসব ক্ষেত্রে মিস্টিক রবীন্দ্রনাথ অনেকাংশে তপোবনবাসী তপস্বীর মতোই বাণীময়, মন্ত্র উচ্চারণরত; তাঁর উচ্চারণে রূপের সীমানায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয় বিমূর্ত মহাপ্রাণ; আবার কখনো কথায়-সংগীতে স্পন্দিত হয় রবীন্দ্র তত্ত্বাবেগ। যেমন: “আজি শ্রাবণ ঘন গহন-মোহে/গোপন তব চরণ ফেলে,/ নিশার মত নীরবে ওহে,/ সেবার দিঠি এড়ায়ে এলে।” কিংবা, “আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার,/ পরাণসখা বন্ধু হে আমার।” অন্যদিকে, প্রকৃতিবোধের ইয়োরোপীয় চারিত্র্য অনুসারে, রবীন্দ্রনাথ মেঘ-বৃষ্টির লোকায়ত বৈচিত্র্য আস্বাদন করেছেন। মেঘের বিচিত্র রং, রঙের বর্ণান্তর ও গভীরতার তারতম্য (tone), নিশ্চল-চঞ্চল–চলমান ও ঝড়ো মেঘ, বৃষ্টির শব্দ-নৈঃশব্দ্য, কৌণিক কিংবা উল্লম্ব ধারাপাত; অথবা বৃষ্টির বিবিধ মাত্রা ও মুড—রবীন্দ্রসাহিত্যে ইন্দ্রিয়জ নানা রূপ পরিগ্রহ করেছে। সেখানে অবিরল ছবি ও গানে, উদ্বিগ্ন বিষাদে, প্রসন্ন সংবেদে এবং বৈপরীত্য সামঞ্জস্য সত্য হয়ে ওঠে: “নীল নব ঘনে আষাঢ় গগনে”, “গগনে গরজে মেঘ”, “মন মোর মেঘের সঙ্গী” ইত্যাদি। অপরপক্ষে “মেঘদূত”, “শ্রাবণ-সন্ধ্যা” ও “কেকাধ্বনি” প্রভৃতি প্রবন্ধে প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিবিষয়ক তত্ত্ব ও তত্ত্বাবেগ। প্রকৃতি-অনুধ্যানে রবীন্দ্রনাথ বিশিষ্টদ্বৈতাদ্বৈতবাদী এবং স্বতন্ত্র এ কারণে যে, যুগপৎভাবে তিনি বহুবর্ণিল রূপজগৎকে প্রণাম করেছেন, আবার মহা-অরূপকে অন্তর্দাহক শান্ততায় ধ্যান করেছেন। তিনি ঔপনিষদ ঐতিহ্যানুসারে প্রকৃতিজগৎকে “উপলব্ধি” করেছেন, আর ইয়োরোপীয় স্বভাব অনুসারে নিসর্গলোককে “উপভোগ” করেছেন। একথা রবীন্দ্র সাহিত্যের যাত্রামুহূর্ত থেকেই সত্য।


ছিন্ন মেঘ ও ফ্যাকাশে রং, থমকে থাকা মেঘ কিংবা গুমট মেঘ—গল্পগুচ্ছে, খণ্ড কিংবা অখণ্ড জীবনের ট্র্যাজেডিকে চিহ্নিত করে; আর রৌদ্র—জীবন, প্রাপ্তি, সৌন্দর্য, মিলন ও আনন্দের প্রতিনিধি।


দুই

মেঘ-বৃষ্টির, চোখ ও চৈতন্যে-দেখা এক পরস্পর সন্নিহিত রূপ লক্ষ করা যায় গল্পগুচ্ছে, উপন্যাসে। সে-রূপ আত্মমগ্ন কবিতার কিংবা মননময় প্রবন্ধের নয়, বরং ভিন্ন এক পরিপ্রেক্ষিতের। গল্পগুচ্ছের মেঘ-বৃষ্টি হলো লোকায়ত-প্রাকৃত-ইন্দ্রিয়জ-রূঢ় ও নির্মম; মানবচরিত্রের সঙ্গে আন্তরক্রিয়াময়; মানবীয় পরিস্থিতির সন্নিপাতে মেঘ-বৃষ্টি দ্রুত পরিবর্তনশীল; কখনো মানুষের নৈঃসঙ্গ্যে স্তম্ভিত, জীবনের পরাভবে সংকেতময়; আবার কখনো—চরিত্রের অন্তরাবেগী ক্ষিপ্রতা অনুসারী হয়ে ব্যাপ্যমান কিংবা ছুটে-চলা। গল্পগুচ্ছে মেঘ-বৃষ্টির শরীর, রং ও গতি জীবন ও জীবনাবেগের সঙ্গে সমান্তরাল, বিরোধাত্মক ও বিপ্রতীপভাবে অভিব্যঞ্জনাময় হতে দেখা যায়। মেঘ-বৃষ্টি এবং জীবন, গল্পগুচ্ছে, সংবেদনার তারতম্যে হয়ে ওঠে দ্যোতনাময়, ইন্দ্রিয়-চেতনা-হৃদয়াবেগ ও মেধার সমন্বয়ে প্রতীকাশ্রয়ী ও সংকেতসম্ভবা। গল্পগুচ্ছের মেঘ-বৃষ্টি নানাভাবে জীবনকে স্পর্শ করে যায়: কখনো বহির্জগতের উদ্দীপিত বিভাব (objective correlative) হিসেবে, সক্রিয়-নিষ্ক্রিয় সত্তা হিসেবে, অন্তিম, কারুণ্যে সঞ্চারকারী রূপে; কখনো-বা বিনাশী শক্তি হিসেবে, কিংবা অন্তর্নাটকময় রূপে। রবীন্দ্রনাথের উপরিউক্ত নান্দনিক মনস্তত্ত্বের উৎস সন্ধান দুরূহ কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ, গল্পগুচ্ছে, মানুষ-প্রকৃতি ও সময়কে পরম মূল্য দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন রূপজগতের একান্তবর্তী মানুষই সমস্ত শিল্প উৎসের অবিরাম কারণ। বাংলার প্রাত্যহিক প্রকৃতি, মানুষ ও মানবীয় পরিস্থিতির মৌল জিজ্ঞাসা, বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের লৌকিক ও অতিলৌকিক চেতনাস্তরে অভিব্যঞ্জিত হয়ে উপরিউক্ত নান্দনিক মনস্তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। কথাটা একটু প্রসারিত করলে এই দাঁড়ায়: প্রত্যক্ষ মৃত্তিকাভূমি, ইন্দ্রিয়জ মানুষ—তাদের মানস দ্বন্দ্ব ও জীর্ণতা, তাদের বিষণ্ন ক্ষুব্ধ-উচ্ছ্বলিত অন্তর্জীবন ও বহির্জীবন, বৃত্তাবদ্ধ লোকজীবনের

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

৯৯

এক মাস

৯৯

৩০

মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

আজকের কুইজ

[কুইজে অংশ নিয়ে জিতে নিন এক মাসের ফ্রি সাবক্রিপশন]

এ সপ্তাহের জরিপ

Readers Opinion

Editors Choice