রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক সাহিত্য
এক
‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক সাহিত্য’ বিষয়ে কিছু বলবার জন্যে আমি আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আমার আলোচ্য বস্তুর দু’টি অংশের প্রথমটি, অর্থাৎ ‘রবীন্দ্রনাথ’ (১৮৬১– ১৯৪১) যেমন স্পষ্ট, পরবর্তী অংশ ‘আধুনিক সাহিত্য’ তেমনি অনচ্ছ। সুতরাং আলোচনার মর্মে প্রবেশের আগে এই বিষয়টি আমি একটু স্বচ্ছ ক’রে নিতে চাই।
আমার লক্ষ্য, আধুনিক সাহিত্যের যে-অংশ বাংলা ভাষায় রচিত সেটি। আবার অ্যাকাডেমিক আলোচনায় আধুনিক বাংলা সাহিত্য বলতে মাইকেল বা বঙ্কিমচন্দ্র অর্থাৎ উনিশ শতাব্দী থেকে ধরা হয়; কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্র থেকে আধুনিক সাহিত্যের সূচনা বলে মনে করেন: আমি এই রচনায় আধুনিক সাহিত্য বলতে বুঝিয়েছি রবীন্দ্রোত্তর অর্থাৎ মোটামুটিভাবে তিরিশের দশকের প্রগতি-কল্লোল-কালিকলম-কবিতা-পরিচয় ইত্যাদি পত্রিকা–বাহিত নতুন সাহিত্যকে।
‘আধুনিক’ শব্দটি পিচ্ছিল ও পরিবর্তমান ও বিপজ্জনক। রবীন্দ্রনাথআধুনিক সাহিত্য(প্রথম প্রকাশ: ১৯০৭) নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার বিষয়ীভূত ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, বিহারীলাল, সঞ্জীবচন্দ্র, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, আবদুল করিম, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, যতীন্দ্রমোহন সিংহ প্রমুখ। মোহিতলাল মজুমদার আধুনিক বাংলা সাহিত্য (প্রথম প্রকাশ: ১৯৩৬) নামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন, যার উপজীব্য ছিল বঙ্কিমচন্দ্র, বিহারীলাল, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, দীনবন্ধু, দেবেন্দ্রনাথ সেন, অক্ষয়কুমার বড়াল, শরৎচন্দ্র ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সাহিত্যালোচনা। বুদ্ধদেব বসুরAn Acre of Green Grass(প্রথম প্রকাশ: ১৯৪৮) নামে ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পর্যালোচনা’ নামাঙ্কিত পুস্তকের আলোচ্য রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নজরুল ইসলাম এবং পরবর্তীরা। আবু সয়ীদ আইয়ুবেরআধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ(প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৮) গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ আলোচিত হয়েছেন বোদলেয়ার-মালার্মে-ভালেরি প্রমুখ বিশ্বসাহিত্যের আধুনিকদের পরিপ্রেক্ষিতে। আবু সয়ীদ আইয়ুব ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিতআধুনিক বাংলা কবিতা(প্রথম প্রকাশ: ১৯৪০) কিংবা বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিতআধুনিক বাংলা কবিতা(প্রথম প্রকাশ: ১৯৫৪) সংগ্রহদ্বয় শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, শেষ হয়েছে তৎকালীন তরুণতম কবির রচনা দিয়ে। আজকের দিনে আমাদের হাতে যদি কোনো আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলন সম্পাদিত হয়, তাহলে তা শুরু হবে (বয়ঃক্রমের দিক থেকে বলছি) জীবনানন্দ দাশের (জন্ম: ১৮৯৯) কবিতা দিয়ে। আধুনিক বাংলা গল্প-উপন্যাসের সংগ্রহ শুরু করব আমরা (বয়ঃক্রমের বিবেচনায়) জগদীশ গুপ্তের (জন্ম: ১৮৮৬) লেখায়। আর এইসব সংগ্রহ শেষ হবে নিশ্চয় বাংলাদেশের তরুণতম প্রতিভাবান লেখকদের রচনা অঙ্গীভূত করে। দেখা যাচ্ছে: আধুনিক—শব্দটি সময়ের দিক থেকে ক্রম—অগ্রসরমান, ক্রমপরিবর্তমান, উদ্ভিন্ন্যমান, সঞ্চরণশীল ও গ্রহিষ্ণু। বলা বাহুল্য, শুধু সময়ের দিক থেকে নয়—বিশুদ্ধ অন্তর্বস্তুর দিক থেকেও।
আসলে আধুনিকতার এই দুই অর্থ: এক অর্থে সে সাম্প্রতিক, সমকালীন, সমসাময়িক; অন্য অর্থে শাশ্বত, ভাস্বর, চিরকালীন।
‘পাঁজি মিলিয়ে মডার্নের সীমা নির্ধারণ করবে কে?’ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আধুনিকতা বলতে তিনি অনেক সময়ই বুঝেছেন চিরত্বকে। এবং অন্তত দুজন জ্যেষ্ঠ আধুনিক কবি—জীবনানন্দ ও সুধীন্দ্রনাথ—‘আধুনিক’ শব্দটি অন্তত মাঝে মাঝে ব্যবহার করেছেন শাশ্বতী গুণসম্পন্ন রচনার ক্ষেত্রে। কিন্তু এঁরাও—যেমন রবীন্দ্রনাথ—ঐ ‘আধুনিক’ শব্দটিই প্রয়োগ করেছিলেন রবীন্দ্রোত্তর তথা তদানীন্তন—সমসাময়িকদের উদ্দেশেও। এটা ঠিকই, আদি-অর্থে আমরা সমকালীন সাহিত্যকে ‘আধুনিক’ বলব না, বলব ‘সাম্প্রতিক, সাম্প্রতিকতাকে উত্তীর্ণ যে-সাহিত্য তাকেই অভিহিত করব ‘আধুনিক’ ব’লে। কিন্তু মানুষের ও শব্দের স্বভাব এমনই যে সে সব সময় নির্মল বিশুদ্ধতায় ও সরলরেখায় চলে না। ফলে আজকের দিনের সাহিত্যকে আমরা ‘আধুনিক সাহিত্য’ই বলি—বলে ফেলি। আসলে আধুনিকতার এই দুই অর্থ: এক অর্থে সে সাম্প্রতিক, সমকালীন, সমসাময়িক; অন্য অর্থে শাশ্বত, ভাস্বর, চিরকালীন।
আমরা এখানে—আগের উক্তির জের টেনে বলতে চাই—‘আধুনিক সাহিত্য’ বলতে বোঝাচ্ছি রবীন্দ্রোত্তর প্রথম সাহিত্যকে—রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের যে দুই রাষ্ট্রকেন্দ্রী দুটি ধারা সৃষ্টি হলো তার কোনো-একটিকে বা সমগ্রকে নয়—সেই সাহিত্যকে, যাকে সেকালে বলা হতো ‘অতি-আধুনিক বাংলা সাহিত্য’। ‘অতি- আধুনিক’ শব্দের তুচ্ছার্থ ‘অতি’ খোলশটি অনেক আগেই ঝ’রে গেছে, রয়ে গেছে অপরিমেয় ‘আধুনিক’। এই স্বল্প সময়ের বক্তৃতায়
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments