-
বৈশাখ মাস এলেই অনিবার্যভাবে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ বৈশাখের রুদ্র রূপ দেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এক রুদ্র রূপের মধ্য দিয়ে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বৈশাখ আসে মানুষের জীবনের সমস্ত জীর্ণতাকে উড়িয়ে নিতে। জীর্ণতা, অসদ্ভাব, অকল্যাণ এবং যে নির্যাতন মানুষের জীবনের মধ্যে প্রত্যহ গড়ে উঠেছে, সে নির্যাতন এবং অসদ্ভাবের বিরুদ্ধেই বৈশাখ তার কল্লোলিত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। সে কারণেই তিনি বলেছেন, যে রুদ্র বৈশাখ এখন এলো তার সঙ্গে আমি যদি সামঞ্জস্য বিধান নাও করতে পারি তাহলে আমাকে পথের এক প্রান্তে রেখে দাও, দাঁড়িয়ে আমি সমস্ত পৃথিবীর মানুষের চলাচল দেখবো, সমস্ত মানুষ যে পথে অনবরত অগ্রসর হচ্ছে, দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে
-
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নান্দনিক সৃষ্টিকর্মের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমার পর জীবন সায়াহ্নে এসে ‘বিশ্বপরিচয়’ (১৯৩৭) বইতে বিজ্ঞানের নানা জটিল তত্ত্বে অবগাহন করেছিলেন। তাঁর এই দুঃসাহস আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হতে পারে। আর এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই বইটির একটি দীর্ঘ ভূমিকায় দেশের কল্যাণের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সহজলভ্য করার অতি জরুরি প্রয়োজনের প্রতি তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন; আর জানিয়েছেন, এ পথে কেউ তেমন এগিয়ে আসছেন না বলেই এক প্রবল দায়িত্ববোধ থেকে তাঁকে এ-কাজে হাত দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষায় “আমার দুঃসাহসের দৃষ্টান্তে যদি কোন মনীষী, যিনি একাধারে সাহিত্যরসিক ও বিজ্ঞানী, এই অত্যাবশ্যক কর্তব্যকর্মে নামেন, তাহলে এই চেষ্টা
-
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের “য়ূরোপ-প্রবাসীর পত্র” প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে—বলা হয় সেই থেকে তাঁর ভ্রমণ সাহিত্যের শুরু। লক্ষণীয় কোনো উপন্যাস রচনার আগেই রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এক নাতিদীর্ঘ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়—আরো দুবছর পর অর্থাৎ ১৮৮৩ সালে বেরোয় ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’। কিন্তু যে সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য ঐ সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের হাত থেকে বেরিয়েছিল, তৎকালীন প্রচলিত গদ্যের মাপে শুধু হয়, আধুনিকতার যে কোনো মাপকাঠিতেই তা উৎকর্ষের একটি অনতিক্রম্য স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ও গদ্য ভাষার যে ফর্মটি দেখা যায় তা “য়ূরোপ প্রবাসীর” গদ্যে প্রচ্ছন্ন, এবং বোধ করি তা থেকে উদ্ভূত। বস্তুত গদ্যশিল্পী রবীন্দ্রনাথকে সম্যকরূপে উপলব্ধি করতে হলে
-
বৈশাখে আমি বাংলাদেশে আসি এবং বাংলা একাডেমীর একটি সভা দিয়ে আমার এখানকার কার্যক্রম শুরু হয়। আবার বাংলা একাডেমীর সভা দিয়েই দেখছি আমার এখানকার কার্যক্রম শেষ হতে চলেছে। কাল সকালে আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা। বাংলা একাডেমীকে, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাবার এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত। আপনারা যাঁরা আজকের এই সভায় উপস্থিত আছেন—তাঁদের সবাইকেও এই সঙ্গে আমার ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের সভার বিষয় বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক মহাশয় এইমাত্র আপনাদের জানিয়েছেন।
এমন একটি ব্যক্তি অথবা সত্তাকে যদি কল্পনা করা যায় তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর তবে তাঁর শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষার তাঁদের প্রয়োজন যারা সম্পূর্ণ নন। জন্মসূত্রেই সম্পূর্ণ এবং স্বনির্ভর কোনো সত্তার শিক্ষার
-
রবীন্দ্রসাহিত্য বিরাট মহাসাগরের মতো। তার কোথায় কি আছে, কোথায় কত গভীরতা এসব নির্ণয় করা যেমন-তেমন কথা নয়। রবীন্দ্রনাথের কোনো এক কবিতায় তিনি তাঁর অনবদ্য ভঙ্গিতে অজানা বন্ধুকে যা বলেছিলেন, তার মর্মার্থ অনেকটা এই : হে বন্ধু, লোকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তোমাকে চিনি কিনা? আমি গর্ব করে বলি ‘হ্যাঁ চিনি।’ কিন্তু তারা যখন জিজ্ঞাসা করে তুমি কেমন? তখন কি যে বলবো, বুঝতে পারিনে ; কেবল বলি কি জানি? তারা তখন বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়। দেখ, আমি যে তোমাকে একেবারে চিনিনে তাই বা কেমন করে বলি? কত সকাল-সন্ধ্যা-দুপুরে আভাসে-ইঙ্গিতে হৃদয়ে তোমার স্পর্শ পেয়েছি, অভিভূত হয়েছি, কিন্তু নিশ্চয় করে ত কিছুই বলতে
-
রবীন্দ্র-সাহিত্য মূলত বিশ্বের জিনিস, সে ভাবের জিনিস, কোনো ভাষার গণ্ডি, কোনো দেশের গণ্ডি তাকে সম্পূর্ণ বেঁধে ফেলতে পারে না—তার ভাব হতে রূপে আবার রূপ হতে ভাবে অবিরাম যাওয়া আসা। এ প্রসঙ্গেগীতাঞ্জলি’র ভূমিকায় কবি ইয়েটসের উক্তি স্মরণীয় : “রবীন্দ্রনাথ ঠকুরের কবিতাবলীর গদ্যানুবাদ আমার রক্তে এমন দোলা দিয়েছে যা বহুকাল অনুভব করিনি। দিনের পর দিন এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি আমি সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছি—রেঁস্তোরা, বাস ও ট্রেনের কামরায় কবিতাগুলো পড়তে পড়তে আমি অনেক সময় পড়া বন্ধ করেছি, যাতে আমার ভাবাবেগ সহযাত্রীদের চোখে না পড়ে।... সমস্ত জীবনব্যাপী যে জগতের স্বপ্ন আমি দেখেছি কবিতাগুলো আমাকে সে রাজ্যে পৌঁছে দিয়েছে। এ কাব্য মহত্তর ঐতিহ্যের সৃষ্টি;
-
বর্তমানকালে সমগ্র বিশ্বজুড়ে পরিচিতি সত্তার রাজনীতি সাধারণভাবে রাজনীতি এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান উপাদান রূপে উঠে এসেছে। ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত পরিচিতি কেন্দ্রিক রাজনীতির ধারণারই কোনও অস্তিত্ব ছিল না। সময়টা হল ১৯৮০-র দশক, যখন থেকে পরিচিতির রাজনীতি গুরুত্ব লাভ করতে থাকে।
পটভূমি
১৯৮০-র দশকে বিশ্বায়িত ফিনান্স পুঁজির ইন্ধনে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের আবির্ভাব। নয়া উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যক্রম এই সময় থেকে জোরদার হতে শুরু করল। তথ্য-প্রযুক্তির মতো নতুন বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি বিশ্বায়ন এবং ফিনান্স পুঁজির গতিশীলতাকে ত্বরান্বিত করল।
বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের এই পর্যায় এবং সমাজতন্ত্রের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভাজন সমসাময়িক। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি হল শোষণ। সমাজতন্ত্র থেকে পশ্চাদপসরণের কারণে শোষণ থেকে মুক্তির সর্বজনীন লক্ষ্যে
-
লেখক: শহিদুল ইসলামএক. অবরুদ্ধ বাংলাদেশের প্রথম সূর্য ওঠার খরবটা পাই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। এমনকি ২৫ মার্চ ১৯৭১, মধ্যরাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী সে বাংলাদেশকে দখল করার জন্য শানিত আক্রমণ চালিয়ে প্রথম রাতেই হাজার হাজার মানুষকে লাশে পরিণত করেছে, সে খবরও আমি পাই দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। প্রকৃতির অবধারিত নিয়মানুসারে সেই কণ্ঠটি চিরকালের জন্য নীরব হয়ে গেলো। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বসে আমার ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সূর্য ওঠার আগের ঘটনাটি সেলুলয়েডে বন্দী ছবির মতো আমার চোখে ভেসে উঠলো। সেদিনের ইতিহাস নিয়ে আমি অনেক লিখেছি। সেখানে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ আছে। কিন্তু তার বেশি না। তাই দেবদুলালহীন পৃথিবীতে আজ তাঁর কথা আরো
-
যদি বলি ১৯৭১ সালে একটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল, তাহলে সম্ভবত কেউই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তবে একাত্তর সালটিকে যারা 'গণ্ডগোলের বছর আখ্যা দেয়, কিংবা যারা বলে যে ওই বছরে ভারতের উস্কানিতে একটা গৃহযুদ্ধ হয়ে তাদের সাধের পাকিস্তানটি ভেঙে গিয়েছিল—এমন কিছু অর্বাচীন মূৰ্খ বা ধুরন্ধর জ্ঞানপাপী বা কুলাঙ্গার দেশদ্রোহী ছাড়া আর সবাই-যে ওই বছরটিকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর বলে গৌরবে উদ্দীপ্ত হবেন—এমন কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তবু এরপরও আমি বলব: আমাদের মুক্তিযুদ্ধটি শুধু আমাদেরই যুদ্ধ ছিল না, ছিল বিশ্বযুদ্ধেরই অংশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রচলিত অর্থে যে আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ হয় নি,—একথা অবশ্যই সত্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই যে বিশ্বব্যাপী
-
'সাম্প্রদায়িক' শব্দটি যে সর্বদা খারাপ বা নিন্দনীয় অর্থে ব্যবহৃত হয়, তা অবশ্যই নয়। শব্দটির গঠনের দিকে দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায় যে, যা কিছু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা সম্প্রদায় সম্পর্কীয়, তা সবই সাম্প্রদায়িক (সম্প্রদায়+ঞিক)। কাজেই ব্যুৎপত্তিগত অর্থে শব্দটি মোটেই নিন্দাৰ্থক নয়। যদি বলি: দুর্গা পূজা, ঈদ, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা—এগুলো সবই সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান, তাহলে কি ওগুলোকে নিন্দা করা হলো? হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—এইসব ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরা এই অনুষ্ঠানগুলো তাদের নিজেদের ধর্মের অনুশাসন রূপেই পালন করে থাকে। তাই এগুলো সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান। এতে নিন্দার কিছু নেই। কিন্তু অনুষ্ঠানগুলো যদি এ রকম হয়ে দাঁড়ায় যে হিন্দুরা দুর্গা পূজার পর বিসর্জন দেয়ার জন্য দুর্গা মূর্তি নিয়ে যাবে
-
‘কারণাভাবাৎ কার্যাভাবঃ’— কারণ ছাড়া কোনো কার্য হয় না, অর্থাৎ বিশ্বে যা কিছু ঘটে তার সব কিছুর মূলেই কোনো-না-কোনো কারণ বিদ্যমান থাকে, বিনা কারণে কিছুই ঘটতে পারে না—দর্শন-বিজ্ঞানের এটিই হচ্ছে মূলকথা। বলা যেতে পারে, এটিই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ সত্য। এই সত্যকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েই আবহমান কাল ধরে মানুষ সত্যের সন্ধানে তথা সমস্ত ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নিরত হয়েছে।
কিন্তু কোনো বিষয়েরই সঠিক কারণটি খুঁজে বের করা মোটেই সহজ কাজ নয়। অনেক কষ্টে যদি-বা একটা কারণ খুঁজে পাওয়া গেল তো, সেই কারণটিরও কারণ খোঁজার তাগিদ এসে দেখা দেয়। দেখা যায় যে, একটা কারণ থেকেই কোনো কাৰ্য সম্পন্ন হয় না বা কোনো ঘটনা ঘটে
-
পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রের অধীনে যখন আমরা বাস করতাম তখন, শুরু থেকেই, কতকগুলো ‘পাকিস্তানী দিবস’ পালন করতে হতো আমাদের। যেমন—তেইশে মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’, চৌদ্দই আগস্ট ‘আজাদী দিবস’, পঁচিশে ডিসেম্বর ও এগারোই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ‘জাতির পিতা'র জন্ম ও মৃত্যুদিবস।
উনিশ শো পঁয়ষট্টি সনের পর থেকে আরও একটি পাকিস্তানী দিবস আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। সেটি ছয়ই সেপ্টেম্বর—‘প্রতিরক্ষা দিবস’। সে-সময়ে পাকিস্তানে চলছিল আইয়ুবি স্বৈরশাসন। সে-শাসনের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। আইয়ুব ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নাম দিয়ে একটি শয়তানি ব্যবস্থা চালু করে একটি পেটোয়া গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছিল। তার আশা ছিল যে আশি হাজার অনুগত মৌলিক গণতন্ত্রীদের দিয়েই দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারকে জোর করে
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.