জাতীয় দিবস : পাকিস্তান বনাম বাংলাদেশ
পাকিস্তান নামক একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রের অধীনে যখন আমরা বাস করতাম তখন, শুরু থেকেই, কতকগুলো ‘পাকিস্তানী দিবস’ পালন করতে হতো আমাদের। যেমন—তেইশে মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’, চৌদ্দই আগস্ট ‘আজাদী দিবস’, পঁচিশে ডিসেম্বর ও এগারোই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ‘জাতির পিতা'র জন্ম ও মৃত্যুদিবস।
উনিশ শো পঁয়ষট্টি সনের পর থেকে আরও একটি পাকিস্তানী দিবস আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। সেটি ছয়ই সেপ্টেম্বর—‘প্রতিরক্ষা দিবস’। সে-সময়ে পাকিস্তানে চলছিল আইয়ুবি স্বৈরশাসন। সে-শাসনের বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। আইয়ুব ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নাম দিয়ে একটি শয়তানি ব্যবস্থা চালু করে একটি পেটোয়া গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছিল। তার আশা ছিল যে আশি হাজার অনুগত মৌলিক গণতন্ত্রীদের দিয়েই দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারকে জোর করে চাপা দিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু সে আশা যে পুরোপুরি পূরণ হবার নয় সে-কথা বুঝতে তার খুব বেশি সময় লাগে নি, পঁয়ষট্টি সনের জানুয়ারিতে মিস ফাতেমা জিন্নাহ্র সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনী লড়াইয়ে লড়তে গিয়েই তার ঘাম ছুটে গিয়েছিল। এরপর এই স্বৈরশাসক তার শাসনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যে আরেকটি ফন্দি আঁটে। যে ভারতবিদ্বেষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই ছিল এর রক্ষাকবচ, সেই ভারতবিদ্বেষকে নতুন করে উস্কে দিয়েই খল জঙ্গি নায়ক আইয়ুব পাকিস্তান জুড়ে এক জেহাদি জজবার সৃষ্টি করে, ১৯৬৫-তে কাশ্মীরকে ছুঁতো করে ভারতের সঙ্গে এক যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়। দুটো রাষ্ট্রের ভেতর নানা কারণে যুদ্ধ তো লাগতেই পারে। আর পাকিস্তান ও ভারত—এ দুটো রাষ্ট্রের জন্মই যেখানে হয়েছে পারস্পরিক বিদ্বেষকে সম্বল করে, সেখানে এদের ভেতর যুদ্ধ লাগাটা তো অস্বাভাবিক নয় মোটেই। কিন্তু পাকিস্তানের বদমায়েশ শাসকরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধকে যুদ্ধ বলে না, বলে—‘জেহাদ’। হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের জেহাদ। পঁয়ষট্টির যুদ্ধের সময়কার আইয়ুবের নানা ভাষণ ও রেডিও পাকিস্তানের প্রচার প্রোপাগাণ্ডায় জেহাদের নামে ঘটে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার একান্ত নগ্ন প্রকাশ এবং এ-রকমটি সবচেয়ে বেশি ঘটে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। আসলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের ভেতর ‘পাকিস্তানী জাতীয় সংহতি’ পোক্ত করে তোলার লক্ষ্যেই পাকিস্তানী শাসকরা জেহাদের নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। আশা করেছিল যে এ-রকম নাটকের অভিনয় দেখে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষগুলো তাদের প্রতি আচরিত সকল বৈষম্যের কথা ভুলে যাবে, ‘মুসলমান-মুসলমান ভাই ভাই’—বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা পশ্চিম পাকিস্তানী শোষণ ক্রিয়াকে বড় ভাইয়ের স্বাভাবিক অধিকার বলেই মেনে নেবে, শত্রু বলে চিহ্নিত করবে দেশের ভেতরের ও বাইরের অমুসলমানদের, এবং মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে সকল সেক্যুলার জাতীয়তাবাদীদের, প্রগতিপন্থীদের, কমিউনিস্টদের। কিন্তু পাকিস্তানী সৈর শাসকের এ আশাটিও পূর্ণ না হয়ে বাস্তবে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনার উদ্ভব ঘটলো, পাকিস্তানী জাতীয় সংহতির বদলে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাঙালিত্বের বোধে উদ্বুদ্ধ হতে থাকলো, দ্বিজাতিতত্ত্বের কবর খননের কাজে হাত লাগালো। তাই পাকিস্তানী শাসকরা ঊনিশ শো ছেষট্টি সন থেকে সত্তর সন পর্যন্ত ছয়ই সেপ্টেম্বরে ‘প্রতিরক্ষা দিবস’ পালন করতে গিয়ে খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। সরকারি উদ্যোগে যখন প্রতিরক্ষা দিবস পালনের তোড়জোর চলেছে, তখন বরং সে-সময়কার পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিরক্ষা নিয়ে পাক শাসকদের বাগাড়ম্বরের অন্তঃসারহীনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা উপলব্ধি করতে পারে যে পূর্বপাকিস্তানকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত রেখে পাক শাসকরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধিয়েছিল। ভারত যদি সত্যি সত্যিই পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল আক্রমণ করে বসতো তাহলে অতি সহজে ও প্রায়-বিনা প্রতিরোধে এ-অঞ্চলটি ভারতের কুক্ষিগত হয়ে যেতো, এ অঞ্চলের মানুষের সীমাহীন অসহায়তা প্রকট হয়ে উঠতো, হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ অঞ্চলের জন্য কিছুই করতে পারতো না। এই উপলব্ধিই এখানকার মানুষের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য-চেতনা ও স্বাধিকার-চেতনাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে। এরই ফলে পাক-ভারত যুদ্ধের পরের বছর—অর্থাৎ উনিশ শো ছেষট্টি সালেই—‘ছয় দফা’ কর্মসূচি প্রণীত হতে পারে,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments