ভারতবর্ষ ও ইসলাম
অনুবাদ: মুহম্মদ আবদুল হাই
ইসলাম যখন ভারতবর্ষে এলো তখন তার প্রগতিশীল ভূমিকা নিঃশেষ হয়ে এসেছে আর শিক্ষিত ও সুসংস্কৃত আরবদের হাত থেকে তার অধিনায়কত্ব করার ভারও খসে গেছে কিন্তু তার পতাকার উপরে ইসলামের শৈশব ও যৌবনের বিজয়বহুল দিনগুলোর বৈপ্লবিক নীতি ছিলো সুগ্রথিত। প্রমাণাভিলাষী মন নিয়ে ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যাবে যে, যেমন পারস্য ও খ্রীষ্টান দেশগুলোতে তেমনি এই ভারতবর্ষেও মুসলিম বিজয়ের পথ সুপ্রশস্ত ক’রে দিয়েছিলো দেশীয় কতকগুলি ঘটনা। বিজিত জাতির বিপুল জনসাধারণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা না হোক অন্তত মৌখিক সহানুভূতি, কি মৌন সম্মতি না পেলে কোন বিদেশী আক্রমণকারীরাই সুদীর্ঘ ইতিহাস ও প্রাচীন সভ্যতাসম্পন্ন কোন বড় জাতিকে অতি সহজে তাদের পদানত করতে পারে না। ব্রাহ্মণ্য গোঁড়ামি বৌদ্ধ বিপ্লবের কণ্ঠ রোধ করলো; তাতেই প্রচলিত ধর্মবিরোধী অগণিত মানুষ একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে ভারতে নীড়হীন নির্যাতিতের মতো দিশেহারা হয়ে ফিরেছে, তারাই ইসলামের মতবাদকে জানিয়েছে সাদর সম্ভাষণ।
ব্রাহ্মণ শাসকদের দ্বারা নিপীড়িত জাঠ ও অন্যান্য কৃষিজীবীদের সক্রিয় সহযোগিতায় মোহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করলেন। আর তারপরেই তিনি অনুসরণ করলেন প্রথম আরব বিজেতাদের রাজ্যশাসন পদ্ধতি। "তিনি ব্রাহ্মণদের উপর করলেন বিশ্বাস স্থাপন আর দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনার ভার দিলেন তাদেরই উপরে, তাদেরই দিলেন তাদের মন্দিরাদি মেরামতের অবাধ স্বাধীনতা, আর আগের মতোই আপনার ধর্ম চর্চা করার পূর্ণ অধিকার; রাজস্ব সংগ্রহের ভার রইলো তাদেরই হাতে আর স্থানীয় আদিম শাসন পদ্ধতি চালিয়ে যাবার জন্য তাদেরই করলেন নিযুক্ত।”[১]যখন ব্রাহ্মণেরা পর্যন্ত—অন্তত তাঁদের কেউ কেউ বিজয়ী ম্লেচ্ছদের দিকে ঝুঁকতে লাগলেন তখন দেশের সামাজিক অবস্থা যে খুব স্বাভাবিক ছিলো তা বলা চলে না। সমাজ ছিলো এমন বিশৃঙ্খলা ও অসংশ্লিষ্ট যে তাতে সুবিধাভাগীদের অবস্থা ও বড় নিরাপদ ছিলো না। প্রতিবিপ্লবের ফল সাধারণতঃ এই ধরনেরই হয়। বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে বিপ্লব হয়তো দমনও করা যায় কিন্তু সমাজের যে বিশ্রী বিশৃঙ্খলতা থেকে বিপ্লবের উৎপত্তি, প্রতিক্রিয়াপন্থী বিজয়ী শক্তিগুলোর সমন্বয় অবশ্য তা দূর করতে পারে না। ভারতে বৌদ্ধ বিপ্লবের পরাজয় ঘটেনি বরং তার আভ্যন্তরীণ দুর্বলতার জন্যই তা ব্যর্থ হয়েছে। সেই বিপ্লবকে জয়ের পথে নিয়ে যাবার জন্য সমাজশক্তি তেমন ভাবে দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। তার ফল হলো এই যে, বৌদ্ধ মতবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই সমগ্র দেশ অর্থনৈতিক দুর্গতি, রাজনৈতিক অত্যাচার, বিচার-বুদ্ধির স্বেচ্ছাচারিতা আর আধ্যাত্মিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ডুবে গেলো। বাস্তবিক পক্ষে সমগ্র সমাজ তখন ধ্বংস ও বিলুপ্তির ভয়াবহ কবলে প'ড়ে গেছে। এরই জন্য নিপীড়িত জনগণ ইসলামের পতাকার নীচে এসে ভিড় ক’রে দাঁড়ালো আর ইসলামও রাজনৈতিক সমানাধিকার না হোক, অন্তত তাদের সামাজিক সমানাধিকার দিলো। সমাজের এমন কি উচ্চশ্রেণীর লোকেরাও স্বার্থের খাতিরে বিদেশী আক্রমণকারীদের কাছে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। এ থেকে মনে হয় যে, জনসাধারণ যখন নৈরাশ্যজনক অবস্থার মধ্যে পড়েছে, তখনই উচ্চ শ্রেণীর ভেতর নৈতিক আদর্শ-বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে।
হ্যাভেল সাহেব প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতির একজন উগ্র্য সমর্থক, মুসলমানদের প্রতি তাঁর যে কোন সহানুভূতি কি উদার মনোভাব ছিলো তা ভুলেও সন্দেহ করা যায় না অথচ ভারতবর্ষে ইসলামের প্রসারের কথা বলতে গিয়ে তিনি এই চমৎকার কৌতূহলপ্রদ প্রমাণ দিয়ে বলেছেন—“যারাই ইসলামকে গ্রহণ করলো আইনত পেলো মুসলমান প্রজার সব রকম অধিকার। আদালতে সব মামলার নিষ্পত্তি হতো আর্য আইন-কানুন দিয়ে নয়, কোরআনের বিধি দিয়ে। এই ভাবে ধর্মান্তরিত করার পদ্ধতি নিম্ন শ্রেণীর হিন্দুদের মধ্যে বিশেষত যে সব অস্পৃশ্যজাতি হিন্দু ধর্মের নির্মম বিধানে নির্যাতিত হচ্ছিলো তাদের মধ্যে খুব কার্যকরী হলো।”[২]
ব্রাহ্মণ্য বিধিবিধানের পূর্ণতায় ঘোর বিশ্বাসী ব্যক্তির কাছ থেকে এহেন উক্তি অবশ্য মোটেই প্রশংসার নয় তা সত্য, তবু মুসলমান বিজয়ের সময়ে ভারতবর্ষে এমন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments