এক কোটি লোকের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়
বাংলাদেশে যখন মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র সাত কোটি, তখন দেশের এক কোটি লোক দেশ ছাড়তে বাধ্য হলো। কেন এক কোটি বাংলাদেশি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল তার কয়েকটি রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক কারণ ও প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা যেতে পারে:
রাজনৈতিক:
শরণার্থীদের এক বৃহৎ অংশ ছিল হিন্দু ধর্মের অনুসারী। এ সকল বাংলাভাষাবাসী হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা প্রধানত ভোট দিয়েছে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এককভাবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদেরকে। কারণ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে সব সময় বলে আসছে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তারা বিশ্বাসী এবং এই দল নির্বাচিত হলে তারা ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সকল মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। সকল ধর্মের অনুসারীরা তাদের বিশ্বাস ও রীতিনীতি প্রতিপালন করে নির্ভয়ে এবং নিরাপদে তাদের জন্মভূমিতে বসবাস করতে পারবে। হিন্দুরা ছিল মোট ভোটারের প্রায় ২০ শতাংশ, তারা প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু মেয়েরা ভোট কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যায় হাজির হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ১৯৭০ এর ৭ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় সংসদ এবং প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বলা যায় ঐতিহাসিকভাবে একটি কারচুপি বিহীন পরিচ্ছন্ন নির্বাচন, যেখানে ৬৩ শতাংশের মতো ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিল। এমন সুশৃঙ্খল নির্বাচনের উদাহরণ বিশ্বে বিরল। পাকিস্তানি সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এবং তার উপদেষ্টা জঙ্গি শাসক গোষ্ঠী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর দল ভাবতেই পারেনি এমন একটি নির্বাচনের কথা যেখানে তাদের হবে ভরাডুবি এবং তারা উৎখাত হতে পারে সমগ্র পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা থেকে। এমন কোনো সমীক্ষাই তাদের কাছে ছিল না, যেখানে দেশের এক বৃহৎ অংশ তাদের শাসন ব্যবস্থায় অখুশি এবং রাষ্ট্রের বিভাজনের কথা ভাবছে। ভুট্টোর ভাবনা এবং ইয়াহিয়ার প্রশাসন যন্ত্র এতোই দুর্বল যে নির্বাচনের ফলাফল তাদের বিরুদ্ধে যেতে পারে এমন কথা তারা ভাবেনি।
সৌভাগ্যবশত আমি নির্বাচন চলাকালে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাবনায় ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলাম। পাবনা সদরের মহকুমা প্রশাসক মরহুম কাজী লুৎফুল হক পাবনার জেলা প্রশাসক মরহুম নুরুল কাদের খানকে বলে আমাকে চেয়ে নেন যেন আমি রিটার্নিং অফিসার ও মহকুমা প্রশাসককে সহযোগিতা করতে পারি। তাই আমার সুযোগ হয়েছিল এই নির্বাচনকে প্রত্যক্ষভাবে দেখার এবং নির্বাচনের ফলাফলের সাথে নিজেকে যুক্ত করার। সহজ ভাবে বলা যায়, ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে সুশৃঙ্খল পুরুষ মহিলার সারিবদ্ধভাবে ভোট প্রদান দেখে আমি অভিভূত হয়েছি।
প্রসঙ্গত বলতে হয় এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা অবিশ্বাস্য রকমভাবে জয়লাভ করে। নির্বাচন হয়েছিল একইসঙ্গে পাকিস্তান জাতীয় সংসদ-এর ৩০০ সিটে এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ সিটে। ফলাফল ঘোষিত হলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ প্রার্থীগণ পাকিস্তান জাতীয় সংসদে ৩০০ জন সদস্য পদের মধ্যে ১৬০টি, জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে পেয়েছিল ৮১টি, জামাত-ই- ইসলামী ৪টি, পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) ও পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) মিলে ১১টি এবং অন্যান্যরা পেয়েছে অবশিষ্ট।
উল্লেখ্য, প্রাপ্ত ভোটের হিসেবে আওয়ামী লীগ পায় ৩৯.২% ভোট এবং ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলপ পার্টি পায় ১৮.৬% ভোট এবং জামায়েত ইসলাম পার্টি পায় ৬% ভোট। অর্থাৎ পাকিস্তানের জনগণের অভিমত পরিচ্ছন্নভাবে ফুটে উঠে, যখন দেখা যায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির একটি সদস্যও পূর্ব পাকিস্তান থেকে জয়লাভ করতে পারেনি এবং আওয়ামী লীগের একজন সদস্যও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে জয়লাভ করতে পারেনি। পরিচ্ছন্নভাবে দৃশ্যমান হলো পূর্ব ও পশ্চিম সম্পূর্ণ আলাদা এবং এই দু'য়ের মিলন অসম্ভব।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের কেন্দ্রে একক সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আত্মপ্রকাশ করে। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ ৩০০ সীটের মধ্যে ২৮৮ সীট পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠ দল হিসেবে নিজেদের মর্যাদা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments