শেষ যাত্রা নয়
যারা যাত্রাপথের খবর নিতে গিয়েছিল রণজিৎ তাদের মধ্যে একজন। বারহাট্টা থেকে দশধার, বাউসি হয়ে আরো দশ মাইল পর্যন্ত ঘুরে এসেছে ওরা—ওরা মানে মাণিক, দীপক, রামেন্দু, সদর আলী, কাদির এবং রণজিৎ। কাল সকালে সবাই যে-পথে রওনা দেবে আগে থেকেই সে পথের হাল অবস্থা সরেজমিনে দেখে আসার জন্যে ওরা গিয়েছিল সেই সন্ধ্যের দিকে—লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে, স্থানীয় লোকদের সাহায্য-সহানুভূতির কথা বলে ফিরতে ফিরতে তখন প্রায় শেষ রাত। বারহাট্টায় ফিরে এসে দেখল আশপাশের গ্রাম থেকে আরো অনেকেই এসে জড় হয়েছে রাতের অন্ধকারে। সাহাদের পাটের গুদাম, দোকানঘর, বাসার বারান্দাগুলো—সব জায়গায় কেবল লোক গিজগিজ করছে। ওরা ফিরতেই চারদিক থেকে ঘিরে ধরল সবে। ‘কি খবর নিয়ে এলেন’, ‘রাস্তা ভাল তো’, ‘আমরা কালকে রওনা দিতে পারব তো?’ অনাগত ভবিষ্যতের মুখে তখন আকাশ ফর্সা হয়ে উঠছে। পুবদিকে লালচে অন্ধকার। এখনি যাত্রা শুরু করতে হবে—কাদির মিঞা তার গুদামঘরে গিয়ে একটা টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলেন, ওর নিজস্ব গুণ্ডাপাণ্ডা ছিল, ওরা এগিয়ে এল। ‘কন, ভাই সাব’—সবার মুখেই প্রতিজ্ঞার চিহ্ন—প্রতিশোধ স্পৃহায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওরা, ‘কন কি করতে অইবে?’
‘শুনেছি রাত্রেই নেত্রকোনায় মিলিটারিকে টেলিফোনে খবর দিয়েছে খালেক মৌলবী; সুতরাং এখানে আর দেরি করা চলবে না।’ কাদির মিঞার অক্ষম উত্তেজনা চোখের কোণে জল হয়ে তখন ছলছল করছিল। পকেট থেকে একটা ঝকঝকে ছুরি সবার সামনে উন্মুক্ত করে কাদির মিঞা বলল—‘আমিও যাব, আপনারা আমার সঙ্গে চলুন, পথে লুটপাটের সম্ভাবনা আছে। তা ছাড়া আমি যতদূর খবর পেয়েছি বাজারের কেউ কেউ মেয়েদের উপর অত্যাচার করার প্ল্যান করছে। ওঁরা সবকিছু ফেলে রেখে দেশ থেকে পালাচ্ছেন—পথের মধ্যে যদি কেউ ওদের উপর অত্যাচার করতে চায়, আল্লাহর কসম, আমরা জান থাকতে তা হতে দেব না।’
একটা ছোটখাট বক্তৃতার শেষে সবাই উত্তেজিত হয়ে উঠল—‘চলুন, সবাই চলে আসুন, আর দেরি করা যাবে না। আসুন। যা হয় হবে।’
আসুন বলতেই পাঁচ-সাত শ সর্বস্বহীন মানুষ ছেলে-বুড়ো, যুবক যুবতী, নববিবাহিত দম্পতি থেকে শুরু করে রোগী, খঞ্জ-বিকলাঙ্গ মানুষ যার যা ছিল তাই নিয়ে লাইন বেঁধে একের পর এক দাঁড়িয়ে গেল। রণজিৎ কাঁপছিল—চোখের ভিতর জলের ঢেউ, কিন্তু মুখের আদলে একটা তীব্র আশাবাদ। কিছুই হয়নি যেন, যারা তাকে শেষ কথা বলতে এসে কাঁধে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল, সকলকেই রণজিৎ একটি কথাই বলেছে, ‘দেখবেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই, আর আমরা তখন যেভাবে দল বেঁধে যাচ্ছি, সেভাবেই ফিরে আসব আবার।’
‘আমরা সবাই ফিরে আসব’ বলতেই সারাটা পথের পাশের গাছ থেকে রাত-জাগা পাখিগুলো আনন্দে চিকচিক করে উঠেছিল। আর সারা শরীরে একটা কালো চাদর জড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে পেছনে পড়ে গিয়েছিল শিবানী। গতকাল সারা পথ বৃষ্টিতে ভিজে রাত্রে জ্বর এসেছিল তর। ভোরে রণজিৎ ফিরে এসে শিবানীকে আঁকড়ে ঘুমিয়ে থাকা শেষ সম্বলের টুকলা থেকে জাগিয়ে তুলতেই বুঝেছিল, শিবানীর গা জ্বরে পুড়ছে।
দুষ্ট লোক ভেবে প্রায় চীৎকার করে উঠেছিল শিবানী। কিন্তু দাদাকে দেখেই কেঁদে ফেলল। ‘মন্তোষের কোনো খবর পেলে, দাদা?’ ‘না’, রণজিৎ পারিবারিক কথাগুলো তুলতেই চায় নি, কিন্তু যতই বলা হোক, শিবানী কিছুতেই বাবা-ভাই-মামা-দিদিমাদের ভুলতে পারছে না।
‘দিদিমাদের একটা খবর পাঠাতে পারলে ভাল হ’ত। বাবা বাড়ি থাকলে কি সুন্দর আমরা একসঙ্গে যেতে পারতাম, তাই না?’
প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে রণজিৎ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাণী কোথায় রে?’ পাশেই জ্যাঠামশাই-এর পিঠে মুখ রেখে শুয়ে থাকা বাণীকে দেখেও প্রশ্ন না করে উপায় ছিল না রণজিতের। কারণ, জামালপুরে যে ধরনের অত্যাচার হয়েছে তাতে লোকে যতই আশার কথা বলুক, রণজিৎ কিছুতেই একথা বিশ্বাস করতে পারে না যে, তার বাবা নির্বিঘ্নে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments