তিয়াত্তরের একুশ
এ বছরের প্রথম দিনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভিয়েতনামে বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছাত্র সমাজ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সংগঠিত করে। বিক্ষোভকারী ছাত্র সমাজের শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ অন্যায়ভাবে গুলিবর্ষণ করে। ফলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে দ'জন বীর সৈনিক শহীদ মতিউল ও কাদের। আহত হয় আরো অনেকে। স্বাধীন স্বদেশের মাটি আবার নতুন করে বিপ্লবী ছাত্র সমাজের বুকের রক্ত পান করে। সেই ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অবধি যে লাখো লাখো বীর মানুষের বুকের রক্তধারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে উত্তাল হয়ে উঠেছিল তার সাথে নতুন করে ১লা জানুয়ারীর রক্তস্রোত মিশে গেল ৷ বায়ান্ন সালে বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ বুকের রক্ত দিয়েছিল বাঙালী জাতিকে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির শোষণের কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্যে। সেদিনের সে রক্তধারা ফণা তুলেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে হত্যা করার জন্য। আর আজো আমাদের সংগ্রামের ধারায় '৫২ সালের শহীদদের স্বপ্ন পরিব্যপ্ত। আমরা এখানো লড়াই করছি। রক্ত দিচ্ছি বাংলাদেশের মাটি থেকে সাম্রাজ্যবাদকে চিরতরে উৎখাত করার দুর্জয় সংকল্পে। আমরা সংগ্রাম করছি বাংলাদেশের শোষিত-নিপীড়িত জনগণের মুক্তির পথ—সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীন দেশের বর্তমান সংগ্রাম সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম। অভ্যুদয়ের মাঝ দিয়েই এ সংগ্রামের শুভসূচনা হয়ে গেছে। আমরা বাংলাদেশের জন্মের কথা কিছু না কিছু সবাই জানি। তবুও আজকের সমাজ প্রগতির সংগ্রামকে সুস্পষ্ট চেতনায় উপলব্ধি করতে হলে অতীত কথা কিছু জানা দরকার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় আমরা কী দেখতে পেলাম? আমরা দেখতে পেলাম, বাংলাদেশের মানুষ যখন প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তখন বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক পরিবার আমাদের সাহায্যে পরিপূর্ণ ভাবে এগিয়ে এল। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামকে সমর্থন জানাল ও সাহায্যের সম্ভার নিয়ে এগিয়ে এল। অন্যদিকে পাকিস্তানের একচেটিয়া ধনিকশ্রেণী ও সামন্তপ্রভুদের স্বার্থ রক্ষাকারী ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের পক্ষে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ধরণের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও বিভ্রান্ত মাওবাদী নেতৃত্ব। যেহেতু আমাদের লড়াই ছিল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির লড়াই সেহেতু বাংলাদেশের অভ্যুদয় একটা প্রচণ্ড প্রগতি। সুতরাং বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই তার ধমনীতে যে প্রগতির স্রোত প্রবাহিত তা তাকে সামনের দিনেও প্রগতির দিকে নিয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।
তাছাড়া আমাদের দেশ বর্তমান বিশ্বের বিপ্লবী ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং নিবিড়ভাবে জড়িত। সারা বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের যে সংগ্রাম চলছে সেখানে সমাজতন্ত্রের কপালই চিহ্নিত হচ্ছে বিজয়ের চন্দনে। সাম্রাজ্যবাদের ডানা ক্রমাগত খসে পড়ছে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোকে সে আর কোনক্রমেই ধরে রাখতে পারছে না। জনগণের মুক্তি বিপ্লবকেও সে ঠেকিয়ে রাখতে পারছে না। তার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে ভিয়েতনাম।
সুতরাং বাংলাদেশের সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম অনিবার্য্য হয়ে দেখা দেয়। এ সংগ্রামের তাৎপর্য হল অত্যধিক গভীর। কেননা বাংলাদেশের অভ্যুদয় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদের সমাধি রচনার পথকে ত্বরান্বিত করেছে। এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বলতর করেছে। এবং বাংলাদেশের সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রচুর শক্তি খর্ব করে দিয়েছে। আমরা যখন আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম শুরু করেছি তখন আমাদের সংগ্রামের পথের কাঁটাগুলিকে চিনে নেয়া দরকার। অর্থাৎ আমর। যদি সঠিকভাবে আমাদের শত্রু নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হই তবে তার পরিণতি হবে মারাত্মক।
পূর্বেই বলা হয়েছে আমাদের প্রগতির সংগ্রামে প্রধানতম দুশমন হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ করে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ। তার সাথে নতুন এক সাথী জুটেছে সে হচ্ছে বিভ্রান্ত মাওবাদী নেতৃত্ব। সেই সাথে আমাদের দেশের অভ্যন্তরে রয়েছে সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও স্বাধীনতা বিনষ্টকারী শক্তিসমূহ। সমাজতন্ত্রের এসব অশুভ শত্রুসমূহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবার জন্য; সমাজতন্ত্রের বিজয় রথকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য।
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments