ঢাকায় খাদ্য পরিবেশন
তোরা: চুগতাই বা তুর্কী শব্দ। কার্যপ্রণালী, আইন এবং পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ঢাকায় তোরাবন্দীর ভোজ বলতে সেই খাদ্য পরিবেশনকে বুঝাত যা সম্ভ্রান্ত বা অভিজাতদের বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে প্রচলিত ছিল। এই তোরাবন্দীতে বিশেষ শৃঙ্খলা এবং বিশেষ নিয়মে খাঞ্চা বণ্টন করা হতো। আমি যে সময়ে বুঝতে শিখেছি তখন তোরাবন্দীর আহার্য পরিবেশন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তোরাবন্দীর গঠন-আকৃতি এই শুনেছি যে, একটি বড় খাঞ্চায় (কান্তি) অথবা কয়েকটি খাঞ্চার মধ্যে মাটির পেয়ালায় এবং পেয়ালা-পাত্রসমূহে খাবার লাল বানাতে (মোটা পশমী কাপড়ের খানপোষে) ঢেকে অতিথিদের বাড়িতে পাঠানো হ'তো। ঐ সকল খাঞ্চায় চার ধরনের রুটি, চার ধরনের চাউল (ভাত), চার ধরনের রুটি-খাদ্য, চার প্রকারের কাবাব, চার রকমের মিষ্টি ছাড়াও পনির, বুরহানী, চাটনী এবং আচার অর্থাৎ সর্বমোট চব্বিশ রকমের জিনিস থাকত। এতো খাবার দস্তরখান-এ পরিবেশন করে খাওয়ানো খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল এবং প্রচুর বাসনপত্র এবং জায়গারও প্রয়োজন হতো এবং কোনো ব্যক্তি যত বড় পেটুকই হোক না কেন এত খাবার খেতে পারত না। আমার যখন বুদ্ধি হয়েছে তখন তোরাবন্দীর স্থান 'নীম তোরাবন্দী' বা আধা তোরাবন্দী দখল করে ফেলেছিল এবং যতদূর মনে পড়ে এটিও তিন চার বারের বেশি দেখি নাই। যদিও নীম- তোরা শব্দ থেকে বোঝা যায় যে, এটি বার প্রকারের খাবারের সমাবেশ হবে কিন্তু তা ঠিক নয় কেননা নীম তোরাতে রুটির মধ্যে 'শীরমাল' অথবা নান 'তনক' (ভঙ্গুর মুচমুচে নান রুটি) থাকত, কিন্তু আমি নান তনক একবারই দেখেছি এবং একাধিকবার শীরমাল দেখেছি, চাউল দুই প্রকারের হতো, একটি 'খাচ্ছা' বা পোলাও, যাকে এখন মোরগ পোলাও বলা শুরু হয়েছে এবং অন্যটি 'মুতানজান' বা টক-মিষ্টি পোলাও। নান উপযোগী খাবারের মধ্যে মুরগির কোর্মা এবং খাসির কালিয়া, কাবাবের মধ্যে মুরগির শিক কাবাব এবং "পরছন্দে কাবাব",' একটি তশতরীতে পনির, পুদিনা এবং পিয়াজ এবং এক পেয়ালায় বুরহানী, মিষ্টির মধ্যে দুধ ফালুদা, মাকুতি' এবং চাউল-এর তৈরি জর্দা। সমস্ত পেয়ালা, তশতরী এবং পাত্র চীনামাটির ব্যবহৃত হতো এবং কখনও চাটনীর অন্তর্ভুক্তি হতো। শুধু দুধ-ফালুদা মাটির পাত্রে রাখা হতো। এই নীমতোরার বৈশিষ্ট্য ছিল যে, প্রত্যেক অতিথির সামনে এত খাবার আলাদা আলাদা বাসন-পাত্রে পেয়ালায় অবশ্যই পরিবেশন করা হতো এবং কখনও চাটনীর অন্তর্ভুক্তি হতো। গণনা করা হলে পনর আইটেমের কম নয়, কখনও কখনও এর বেশি আইটেম হতো। এই সব খাবার অতিথির সামনে পরিবেশন করে মেজবান সবগুলির স্বাদ গ্রহণের জন্য বার বার অনুরোধ জানাত, এইভাবে বেশি পরিমাণের খবার এঁটো এবং নষ্ট হয়ে যেত।
যদি ঢাকাবাসী জেনে শুনে এই নীম তোরাবন্দী পরিহার করত তাহলে এটা হাজারবার ধন্যবাদাহের কাজ হতো। কিন্তু সৌভাগ্যের অবনতি এবং দুর্ভাগ্যের আগমনে এখন এই নীমতোরাবন্দীও বিসর্জিত হয়েছে এবং শুধুমত্র তোরাবন্দী ও নীমতোরাবন্দী শব্দদ্বয় আহারকারী ও পরিবেশনকারীদের (খানেওয়ালা এবং খেলানেওয়ালার) মুখে রয়ে গেছে এবং সেটিও বর্তমান বংশধরদের জীবদ্দশা পর্যন্ত, প্রকৃত অবস্থা এই যে, পরিপূর্ণ তোরাবন্দী খাবারের বিস্তৃত বর্ণনা বর্তমানে কেউ বলতে পারে না। আমি প্রচেষ্টা নিয়েছি যে, চার ধরনের রুটির মধ্যে কোন্ কোন্ ধরনের রুটি ছিল, অথবা পোলাও কী কী রান্না হতো, নান-খাদ্যের মধ্যে কী কী থাকত কিন্তু বর্তমানে বিশুদ্ধভাবে বিস্তৃত বর্ণনাকারী ঢাকাতে কেউ নেই।
সর্বত্র এই নিয়ম দেখেছি এবং (বর্তমানেও) দেখি যে, মেহমানদের আলাদা কক্ষে বসান হয় এবং খাবার জায়গায় দস্তরখান বিছিয়ে তাদেরকে ডাকা হয়। অতিথিগণ পড়িমরি এবং ধাক্কা-ধাক্কি করে প্রবেশ করে এবং দস্তরখানে আসন গ্রহণ করে। প্রথমে একজন চিলুচি এবং অন্যজন আফতাবা নিয়ে আসেন এবং দস্তরখানের উপরেই হাত ধোয়ানো হয়। অতঃপর অতিথিদের সামনে খালি থালা দেওয়া হয়। বার গিরার চওড়া
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments