ধনতন্ত্রের অনিবার্য সংকট ও আমাদের মহান বিজয়
‘কারণাভাবাৎ কার্যাভাবঃ’— কারণ ছাড়া কোনো কার্য হয় না, অর্থাৎ বিশ্বে যা কিছু ঘটে তার সব কিছুর মূলেই কোনো-না-কোনো কারণ বিদ্যমান থাকে, বিনা কারণে কিছুই ঘটতে পারে না—দর্শন-বিজ্ঞানের এটিই হচ্ছে মূলকথা। বলা যেতে পারে, এটিই হচ্ছে স্বতঃসিদ্ধ সত্য। এই সত্যকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েই আবহমান কাল ধরে মানুষ সত্যের সন্ধানে তথা সমস্ত ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নিরত হয়েছে।
কিন্তু কোনো বিষয়েরই সঠিক কারণটি খুঁজে বের করা মোটেই সহজ কাজ নয়। অনেক কষ্টে যদি-বা একটা কারণ খুঁজে পাওয়া গেল তো, সেই কারণটিরও কারণ খোঁজার তাগিদ এসে দেখা দেয়। দেখা যায় যে, একটা কারণ থেকেই কোনো কাৰ্য সম্পন্ন হয় না বা কোনো ঘটনা ঘটে না, প্রতিটি ঘটনার পেছনেই থাকে এক গুচ্ছ কারণ বা কারণ সমবায়। আবার যাকে এক সময় কারণ বলে মনে করা হয়েছিল, অনেক বছর পরে হয়তো প্রমাণিত হয়ে গেল যে সেটি মোটেই সঠিক কারণ নয়।
তবু এর পরও, কারণের খোঁজ করতে মানুষ কখনো পিছ-পা হয় না। আসল কারণের সন্ধান না-পেলে সে নকল কারণকেই মেনে নেয়। নকল কারণও না-পাওয়া গেলে একটি কারণ নিজেই বানিয়ে নিয়ে বা কল্পনা করে ঘটনার ওপর চাপিয়ে দেয়। এমনি করেই প্রাক্-আধুনিক কালের মানুষ ভূমিকম্পের কারণ বলে নির্দেশ করে এমন একটি ষাঁড়কে, যে-ষাঁড়টি তার মাথার একটি শিং-এর ওপর পৃথিবীটাকে ধরে রেখেছে। একটি শিংকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য অপর শিংটির ওপর পৃথিবীটাকে তুলে নেয় যখন, তখনই পৃথিবীটা কেঁপে ওঠে, হয় ভূমিকম্প। আর চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের কারণ তো রাহুনামক এক দৈত্য। রাহু চাঁদ বা সূর্যকে গিলে ফেলে বলেই চাঁদে বা সূর্যে গ্রহণ লাগে; তবে রাহুর পেটটি কাটা বলে চাঁদ ও সূর্য বেরিয়ে আসতে পারে, এবং...।
এ-রকম আরো অনেক কিছুর কারণ যে মানুষ এভাবে বানিয়ে নিয়েছে, এবং এগুলোর নামই-যে মিথ বা পুরাণ—সেকথাও আমরা জানি। আগেকার মানুষ এ-সব কারণকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতো, যে-সব মানুষকে আমরা 'অশিক্ষিত' বলি এখনকার সে-সব মানুষও হয়তো সে-রকমই বিশ্বাস করে। কিন্তু আমরা কি তেমন বিশ্বাস করতে পারি? আমরা তো 'আধুনিক' 'শিক্ষিত' ‘বিজ্ঞানমনস্ক’!
বিশেষ করে ধনের প্রাচুর্য যে-দেশের মানুষকে ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শিখিয়েছে, বর্তমান দুনিয়ায় স্বঘোষিত নেতৃপদে অধিষ্ঠিত যে-দেশটি, সেই স্যামচাচার দেশ মার্কিন মুলুকের জ্ঞানী মানুষরা তো সকলে মিথকে মিথ্যা বলেই জানেন। তাঁরা বিজ্ঞানমনস্ক, বিজ্ঞানের অনুসারী। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের দ্বারা যা নির্ণীত হয় না তাকে কোনোমতেই সত্য বলতে তাঁরা রাজি হতে পারেন না। বিজ্ঞানই তাঁদের শিখিয়েছে যে সব কিছুরই কারণ আছে, আর সেই কারণটি খুঁজে বার করতে হয় পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের সাহায্যে।
সে-রকম পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের সাহায্যে নানা প্রাকৃতিক ঘটনার কার্য-কারণ সম্পর্ক নির্ণয় তো খুব স্বাভাবিক ভাবেই করা যায়। কিন্তু মুশকিল দেখা দেয় সামাজিক ঘটনাবলির বেলায়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো নৈর্ব্যক্তিকভাবে সামাজিক বিজ্ঞানের চর্চা ও চর্যা করা যায় না। কারণ সমাজ তো শ্রেণীবিভক্ত। সামাজিক সত্যও, তাই, শ্রেণীসত্য। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সকল শ্রেণীর জন্য অভিন্ন সত্য নেই, থাকতে পারে না। সে-সমাজে সকল শ্রেণীর মানুষের স্বার্থও এক নয়, বরং পরস্পর-বিরোধী। আমি যে-শ্রেণীতে অবস্থান করি ও যে-শ্রেণীর স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে আছে আমার ব্যক্তিগত স্বার্থ, সেই স্বার্থকে যা ক্ষুণ্ন করে তাকে আমি কোনো মতেই মেনে নিতে পারি না। কাজেই সেই আমি যখন কোনো সামাজিক ঘটনার কারণ নির্ণয়ে ব্ৰতী হই, তখন যদি দেখি যে সেই কারণটি আমার শ্রেণীস্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখনই আমার চিন্তা ও কথার রাশ টেনে ধরতে আমি বাধ্য হই। ঘটনার আসল কারণটাকে আড়াল করে ফেলি, বা সেটিকে খণ্ডিত করে নিয়ে আমার সুবিধামতো খণ্ডাংশকেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments