-
—তোমার মুখে ও কিসের আভা?
থামের আড়ালে ছায়া: সে-ছায়ায় ময়লা ও জীর্ণ সবুজ আলখাল্লা গায়ে যে-বৃদ্ধ ফকির নিমীলিত চোখে নিশ্চল হয়ে বসেছিল সে এবার চোখ মেলে চাইলে, প্রথমে দেখলে দুটি জ্বালাময় তীব্র দৃষ্টি। তার সামনে উবু হয়ে যে ছেলেটি বসে তাকিয়েছিল তার পানে, তার কোমল মুখ রিক্ততায় প্রখর, ক্ষীণ দীর্ঘ দেহ দীনতায় চঞ্চল, আর জ্বালাময় তীক্ষ্ণ চোখদুটি পদ্মশূন্য ও ছোট। তার পরনের কাপড় ময়লা, কিছুটা ছেঁড়া, আর তার মাথার রুক্ষ লালচে চুলগুলো এলোমেলো, সেগুলো ছড়িয়ে রয়েছে কানের পাশে, ঘর্মাক্ত কপালের ওপর।
—তুমি কে?
ছেলেটির কাছ হতে সে-প্রশ্নের কোনো উত্তর এল না। তার পানে কতক্ষণ চেয়ে থেকে ফকির আবার প্রশ্ন করলে:
-
কখনো স্বপ্ন গড়িয়ে আসে। অদ্ভুত কথা, তবু সত্যি। মনের উচ্চতম শিখরে স্বপ্ন যেন জমাট বেঁধে রয়েছে বরফের মতো, হঠাৎ কখন কিসের উত্তাপ এসে পড়ে তার শীর্ষে, সে-জমাট-বাঁধা স্বপ্ন গড়িয়ে আসে মন বেয়ে। গড়িয়ে আসে হয়তো লাভার মতো, হয়তো স্নিগ্ধ শীতল পানির মতো, কখনো-বা হয়তো পর্বত-দেহে আঘাত পেয়ে ফিরে আসা হাওয়ার মতোই আসে। সব জীবন-তো আর এক নয়।
আকবরের স্বভাব শান্ত। শান্তভাবে চলে শান্তভাবে কথা কয়ে সে আই. এ. পাস করেছে এবং শান্তভাবেই বাপের মৃত্যু সহ্য করে শান্তভাবে কেরানিগিরি করতে শুরু করেছে। কথা সে এত কম কয় যে কখনো মনে হয় তার যেন মন নেই, সে যেন ভাবে না; অথচ এ-কথা
-
[ ১৩৪৯ সালের পৌষ মাসে আমার সাত বোন পারুল শীর্ষক গল্পটিমোহাম্মদীতে প্রকাশ পেয়েছিল। আমাকে তখন আলাপে ও চিঠিতে বহুবার প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল এই মর্মে যে, এটা বাস্তব থেকে নেয়া কি না। তাহলেই হয়েছিল। আদালত পর্যন্ত ব্যাপারটা দৌড়ত না বটে, কিন্তু রুনু ঝুনু মুনু টুনু ভুলু লুলু বুলু—এই সাত বোনের গাট্টা খেয়ে মাথাটা আর আস্ত থাকত না। তবে একথাও ঠিক যে, এদের আমি ছাড়া ছাড়াভাবে এখানে-সেখানে দেখেছি, এবং এদের চপলতা ও স্বচ্ছ প্রাণময়তায় বারেবারে মুগ্ধ হয়েছি।]
দোরটা ভেজানো, সেটা ঠেলে মোনায়েম সন্তর্পণে ঘরে ঢুকলে। বাইরের ঘরটা নির্জন, কেউ কোথাও নেই। কিন্তু সে দু’পা এগিয়েছে কী অমনি অনেকগুলো সরুগলার বিকট
-
কালো গভীর চোখের তন্দ্রার মতো ম্লান কোমলতা দ্বীপের সবুজ রঙে নিবিড় হয়ে উঠেছে। এখন অপরাহ্ণ: সাগরের বুকে হাওয়া থেমে গেছে, নারকেলগাছের পাতাগুলো ঝুলে পড়েছে। সৈকতে যে-নীলজল ক্ষীণ হয়ে ভেঙে পড়ছে তার আওয়াজ নম্র হাওয়ার মতো, আর তার হালকা রঙে দূর হতে দেখা বনানীর অস্পষ্টতা। প্রশান্ত মহাসাগরের অতলতা ওপরে উঠে এসেছে, তাই দূরবিস্তৃত জলরাশি যেন বরফের মতো জমাট বেঁধে গেছে, কোথাও কোনো কম্পন নেই, কোনো শব্দও নেই।
এ-বিরাট বিচিত্র মহাসাগরের প্রান্তবর্তী জলে পা ছড়িয়ে বালুর ওপরে শুয়ে ক’টা নগ্নদেহী পুরুষ ও নারী হালকা নীল আকাশের পানে চেয়ে নিশ্চল হয়ে রয়েছে। তাদের দেহের রং ‘কারারা’ মর্মরের মতো শুভ্র; দেহগুলো বাইরের মাটির মতো
-
সন্ধের দিকে কোত্থেকে একটা জমাট মেঘ উড়ে এল, যার অভিক্ষেপগুলো কৌণিক ও তীক্ষ্ণ। মেঘ এল আর সাথে সাথে দুর্দান্ত হাওয়া শুরু হল, বাগানের ঝাউগাছগুলোতে প্রচণ্ড সাড়া পড়ে গেল। নওয়াজের স্ত্রী সকিনা ধূসর রঙের শাড়ি পরে ওঘর থেকে বেরিয়ে এল, বারান্দায় নওয়াজকে বললে: দেখেছ, কেমন হাওয়া?
—ভালো লাগছে তোমার?
—বাগানে যাবে? গিয়ে বসবে ওই ঝাউগাছগুলোর তলায়?
ঝাউগাছগুলোতে এমন একটা বিচিত্র শোঁ-শোঁ আওয়াজ, ওরা দুজন তার তলায় না গিয়ে পারলে না। গিয়ে তারা একটা দীর্ঘতর ঝাউগাছের তলায় বসলে। সকিনা তার মাথার রুক্ষ চুল ছেড়ে দিলে, প্রবল হাওয়ায় বোশেখি মেঘের মতো সে-চুল উড়তে থাকল। নওয়াজ কোনো কথা না-কয়ে শুধু তার একটি হাত নিজের
-
দক্ষিণের জানালাটা খোলা, পর্দাও সরানো। গুমট গরমের পর বাইরে হাওয়া দিয়েছে, তার কিছু জানলা গলে ভেতরেও আসছে।
সন্ধেয় বেড়িয়ে ফেরার পর আকরমের এক পেয়ালা চা খাবার অভ্যেস। আজ বেড়িয়ে ফিরে জামা-কাপড় ছেড়ে একটা পাতলা সিল্কের লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ইজিচেয়ারটাতে হেলান দিয়ে বসেছে, এমন সময় হোমেরা চায়ের পেয়ালা নিয়ে আস্তে ঘরে এল। ইজিচেয়ারের পাশে টিপয়, তার ওপর সে পেয়ালাটা নাবিয়ে রাখলে। চা দেবার পর আর কোনো কাজ নেই, কোনো কথাও নেই, তাই হোমেরা দরজার পানে আবার চলতে শুরু করেছে তখন আকরম পেছন থেকে আস্তে ডাকলে: শোন।
—কী? হোমেরা দাঁড়াল।
টিপয় থেকে পেয়ালা তুলে তাতে আকরম এক চুমুক দিলে, তারপর স্বাভাবিক
-
ভোর হতে সন্ধে পর্যন্ত এ স্থান ভরে শুধু খটাখট শব্দ। এতগুলো লোক, সবাই নীরব, কারো মুখে কোনো কথা নেই। এরা নৌকো তৈরি করে, বিভিন্ন প্রয়োজনের বিভিন্ন ঢঙের নানারকম নৌকো। সাম্পান হতে শুরু করে তিনশ' চারশ' মনের সাগরে মাছ ধরবার বা মাল বইবার বড়-বড় নৌকো এরা অনায়াসে তৈরি করতে পারে এবং করে।
কর্ণফুলী নদীর এ-ধারটা ঝোপঝাড়ে ঢাকা পাহাড়, তার ঠিক নিচেই নদীর তীর দিয়ে যে-খানিকটা সমতলভূমি, সেখানে তাদের নৌকো বানাবার কারখানা। একপাশে বিরাট টিনের গুদাম, সেখানে তারা কাঠ রাখে। তার পাশেই ছোট চালার ঘর, রাতে সেখানে লোক থাকে আর পাহারা দেয়। পাহাড়টা পেরিয়ে কাছেই গাঁ। এ-গাঁয়ের লোকদের পেশাই নৌকো বানানো, পুরুষানুক্রমে
-
[ ওর পরিচয়: ওর বয়স পঁচিশ। চেহারা ধারালো, ক্ষুদ্র উজ্জ্বল চোখদুটো অস্মিতাময়। জীবনে ওর অখণ্ড অবসর, এবং ব্যাংকে অজস্র অর্থ। তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য এই: কেউ গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে অর্থহীন পুলকে প্রেমিকার খোঁপায় গুঁজে দিলে ও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।]
সহজ গতি:
ওর ভাষায় আজ সন্ধ্যার কথা:
সায়ন্তন শান্ত অথচ উজ্জ্বল আকাশে রঙের অসংখ্যতা ও সীমাহীনতা। এবং সে-বর্ণঝর্না যেন আজ অত্যুজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে গুঞ্জনময় কোলাহলমুখর আলোকিত শহরের বুকে। চারধারে ঝলমলানি, অস্ফুট সৌন্দর্যের মৃদু অথচ কঠিন অভিব্যক্তি, প্রাণ-স্নাত নরনারীর সংস্কৃতি-তরঙ্গের অনাবিল ঝিকিমিকি, এবং সে-ঝিকিমিকির একান্ত অন্তরালে ও নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে—হঠাৎ ফুটন্ত অস্বাভাবিক উত্তুঙ্গ পুষ্পটির পাপড়িগুলো হতে দূরে, ধূসর-স্নিগ্ধ—নির্জনতার একান্তে। (সেটা দোতলার দক্ষিণ
Page 1 of 1
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.