-
বন্ধুরা ওকে বলত জরদ্গব। তার ঢিলে-ঢালা, জবুথুবু, ভ্যাবাচ্যাকা স্বভাবের জন্যে। ক্লাসে কোনো সাপ্তাহিক পরীক্ষার সময় কখনোই ওর সময়ে কুলাত না, প্রশ্নটা মাথায় ঢুকতে ঢুকতে ঘন্টা পড়ে যেত। চা খেতে বসলে তার টেবিল পিরিচের চারপাশে জমত চায়ের ডোবা। চলত এদিক-ওদিক হেলে দুলে, নির্ঘাৎ ধাক্কা খেত টেবিলের কানায়, নয়ত উল্টে পড়ত চেয়ার। নতুন জুতো হপ্তার মধ্যেই এমন তুবড়ে যেত যেন ওই পরে সে সেনাপতি সুভোরভের সঙ্গে আল্প্স্ পর্বত পেরিয়েছে। মুখের ভাব ঢুলুঢুলু, যেন এইমাত্র ঘুম ভাঙল, নয়ত এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। সবকিছুই ওর খসে পড়ত হাত থেকে, কিছুই উৎরাত না। এক কথায় জরদ্গব।
গায়ে আঁট হয়ে বসত কোট, প্যান্টে পা ঢুকত কোনোক্রমে। মুটকো
-
পাইওনিয়ার শিবিরের ব্র্যাস ব্যাণ্ড বাজিয়েদের মধ্যে পাশা সেদভ ছিল সবার ছোটো। কিন্তু তার ড্রামটি ছিল প্রকাণ্ড। এমনকি যে রামশিঙাটা তার পেতলের অজগর পাকে ঢ্যাঙা কারাভায়েভ’কে জড়াত, সেটাও হার মানত ড্রামের কাছে। কাঁধে তারপলিনের স্ট্র্যাপ গলিয়ে আশা ঝুলিয়ে নিতে ভারি ড্রামটা, ভারসাম্য রাখার জন্যে সামান্য পেছনে হেলতে হত তাকে। হাতে তার থাকত বিস্ময়চিহ্নের মতো হালকা সরু কাঠি নয়, ফেল্ট-মোড়া বাঁটুল লাগানো রীতিমতো বাজন-ডাণ্ডা। তা দিয়ে পাশা নিপূণ বোল তুলত, প্রকাণ্ড যন্ত্রটা দিয়ে তান ধরত ট্রাম্পেটের সঙ্গে। যে জানে না, তার কাছে মনে হবে ড্রাম বাজাতে সবাই পারে। একেবারে ভুল কথা! যে-স্বরলিপি দেখে পাশা বাজাতে তাতে লেখা ছিল: ‘ড্রামের পালা’। গোটা ব্যাণ্ডই
-
ছোট্ট কলিয়ার যতদূর মনে পড়ে, যুদ্ধের দিনগুলোয় তার কেবলি ক্ষিতে পেত। ক্ষিদে সে কিছুতেই সইতে পারত না, মানিয়ে নিতে পারত না, রাগের ঝলক ফুটত তার কোটরে ঢোকা চোখে, অনবরত খাবার খুঁজে বেড়াত। না-ছাঁটা এলোমেলো কালো কালো চুল আর খোঁচা খোঁচা পাঁজরায় তাকে দেখাত যেন ছোট্ট রোগটি এক নেকড়েছানা। খাওয়ার মতো কিছু একটা পেলেই সে তা মুখে তুলত—সরেল মুুখ আটকে আসা বৈঁচি, বার্ড-চেরি, কী সব শিকড়বাকড়, অসহ্য টক আর শক্ত বুনো আপেল। বাড়িতে সে পেত জলের মতো কিছু ঝোল আর রুটি। ঝাড়াই-করা জোয়ারের গুছি গুঁড়ো করে মা মেশাত ময়দার সঙ্গে, ফলে রুটি হত ভারি, চ্যাটচেটে, সোঁদা সোঁদা কাদাটে গন্ধ উঠত। কিন্তু
-
সে গ্রীষ্মে গরম একেবারে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দিনের গরমের পর আসে সাঁঝের গরম, সাঁঝের পর রাতের। শুধু ভোরের দিকেই একটু তাজা আমেজ আসে সমুদ্র থেকে। কিন্তু এই ক্ষীণ শীতলতাটুকুও টেকে বেশিক্ষণ নয়। তার তাপ ছড়ায় কেবল সূর্যই নয়। পাথর, বালি, এমনকি গাছের পাতা থেকেও চুইয়ে পড়ে গরম। মাথার ওপর আলস্যে ভাসা বিরল দু’ একটি মেঘ দেখে আর তুষারের কথা মনেও পড়ে না। এমন গরমে আদৌ কল্পনা করারই অসম্ভব যে দুনিয়ার কোথাও আছে তুষার-কণা, বরফ, ঠাণ্ডা।
সমুদ্রতীরের এই বসতটায় নিথর হয়ে গেল জীবন। লোকে হাঁটে গা-ছাড়াভাবে, নেতিয়ে পড়ে, রোদে বেরতে ভয় পায়। এমনকি ঝানু পুলিন-বিলসীরাও হামলা সইতে না পেরে ঠাঁই নিয়েছে
-
মানুষের স্বভাবই এই যে গ্রীষ্মে তার মন কেমন করে নীলাম তুষার-কণা আর শাসির্তে বরফের নক্সার জন্যে। আবার শীতে তার চাই তপ্ত সূর্য, পল্লবের সবুজ খস-খস, বিলবেরির গন্ধ।
যাচ্ছিলাম আমি গভীর মুড়মুড়ে তুষারের ওপর দিয়ে আর ভাবছিলাম গ্রীষ্মের কথা। অনাড়ম্বর রুশী গ্রীষ্ম নয়, দক্ষিণী গ্রীষ্ম—জ¦লজ¦লে ফুলের গন্ধে যা চনমনে, পাথর যেখানে আতপ্ত, গরমে-সমুদ্র যেখানে অলস, নিস্তেজ। ভাবতে ভাবতে আমার নিজেরই কেমন গরম ঠেকল, ওভারকোটের বোতাম খুলে ফেললাম, টুপিটা সরিয়ে দিলাম কপাল থেকে। তুষার-কণা হয়ে দাঁড়াল ঝুরঝুরে চকমকি বালি, ফর গাছ উঠে দাঁড়াল সাইপ্রাস গাছ হয়ে, পাইনের ডাল নড়ে উঠল পাম গাছের সবুজ পাখার মতো।
এই সময়েই শাদা তুষার স্তূপের ওপর দেখলাম
-
লকড়ি-গুদামটায় উঠে উর্সের কাছে ঘেঁষবে এমন কোনো ছেলের কথা আমি শুনিনি। কিন্তু একটি মেয়ের কথা জানি, কেট—সে এটা পারে। উর্সকে সে ভয় পায় না। কাঁটা-তারের তল দিয়ে সে ঢোকে, উর্স কিন্তু খেঁকিয়ে আসে না, ডাকে না ভাঙা-ভাঙা গলায়, কামড়ে ছেঁড়ে না তার ফ্রক। দু’জনের মধ্যে বেশ ভাব—রোগা সরু ঠেঙে কেট আর দক্ষিণ রাশিয়ার পাহারাদার কুকুর উর্স।
ছেলেপিলেরা বলে, কেট কী একটা মন্ত্র জানে। সেটা বাজে কথা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাতে নাক কুঁচকে ওঠে তার কেউ মিথ্যে কথা বললে সে বরাবরই নাক কোঁচকায়।
উর্স দেখতে প্রকাণ্ড। গায়ের লোম তার ঝুলে ঝুলে থাকে নোলকের মতো। কপালের নোলকগুলো পড়ে চোখর ওপর। চোখের
-
আফ্রিকাতেও কিরণ দেয় আমাদের এই একই সূর্য। কিন্তু সূর্য সেখানে মাটির অনেক কাছে, তাই রোদ হয় কাঠ-ফাটা। আর সিংহ ভাবে সূর্য বোধ হয় দুটো: একটা গরম, একটা ঠাণ্ডা।
সিংহ থাকে খাঁচায়। যেন লাইন-টানা কাগজের ওপর আঁকা। আঁকা হয়েছে হলুদ-বাদামী রঙে। সিংহের আধখানায় ঘন, লম্বা লম্বা চুল, অন্য আধখানা রোগা, লোম-ছাঁটা, মসৃণ। হয়ত আধখানায় তার সর্বদাই গরম লাগে, অন্য আধখানায় ঠাণ্ডা।
খাঁচায় থাকলে শুধু এক জায়গাতেই থাকতে হয়, কিছুই ভালো করে দেখা হয় না। যেমন, শুঁড়-ওয়ালা একটা মাথা দেখতে পায় সিংহ, কুলো-পানা তার কান। কিন্তু মাথার ওই মালিকটির পা কটা, তা সে জানে না। নাকি তিমি মাছের মতো লেজ নেড়ে সে
-
শিশুকে এত ভাল লাগে কেন?
আমার নবাগত দৌহিত্রটি সম্প্রতি আমার মনে এই চিন্তাটি উদ্রিক্ত করিয়াছে। পাঁচ বৎসরের শিশু, কিন্তু তাহাকে লইয়াই সমস্ত দিন মাতিয়া আছি, অন্য কিছু করিবার আর অবসর নাই। কখনও তাহাকে কাগজের নৌকা বানাইয়া দিতেছি, কখনও জাহাজ, কখনও দোয়াত, কখনও ঘুড়ি। শুধু তাই নয়, তাহাকে আমার গৃহিণীর কল্পিত প্রণয়ী ধরিয়া লইয়া তাহার সহিত নানারূপ ছদ্মকলহে প্রবৃত্ত হইয়াছি। বালকটি শিষ্ট নহে, শান্ত তো নহেই।
ইতিমধ্যেই সে আমার হুঁকা উল্টাইয়াছে, কলিকা ভাঙিয়াছে, চশমার খাপটি বারংবার খুলিয়া চশমাটি অধিকার করিতে চাহিতেছে। ধূলিধূসরিত দেহ লইয়া ক্রমাগত আমার ঘাড়ে পিঠে পড়িতেছে। বালাপোশখানার দফা রফা হইয়া গেল।
তথাপি কিছুতেই তাহার উপর চটিতে পারিতেছি না।
-
কোনও রাজশক্তির যখন পতন আসন্ন হয়ে ওঠে তখন তার চারিদিকে কতকগুলি লক্ষণ দেখা দেয়। তার মধ্যে বুদ্ধিনাশটাই বড়।
ভারতেও কয়েকশো বছর ধরে যে তুর্ক-আফগান রাজশক্তি শাসন করছিলেন, যেটাকে সাধারণত ঐতিহাসিকরা পাঠান আমল ব’লে আখ্যা দেন—তাদের পতন ঘনিয়ে এল ঐ যুগের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীর আমলে। ইব্রাহিম লোদী যখন সিংহাসনে বসলেন তখন দিল্লীর সাম্রাজ্য বলতে দিল্লীর চারপাশে কয়েকটি মাত্র জেলা বোঝায়, তার বাইরে চারিদিকেই আফগান শাসক ও জমিদাররা প্রবল হয়ে উঠেছেন, হিন্দু জমিদাররাও সুযোগ বুঝে স্বাধীনভাবে মাথা তুলেছেন।
এই সঙ্কটকালে যে স্থিরবুদ্ধি ও কৌশলের প্রয়োজন তা ইব্রাহিমের ছিল না, তিনি কঠোর হস্তে এই সব জমিদারদের শাসন করতে প্রবৃত্ত হলেন। অথচ সে
-
সকালের নাস্তা সকাল-সকাল শেষ করার জন্য বড় বড় নাস্তার ডিমগুলি সামনে রেখে আমরা সবাই গোল হয়ে বসে আছি। নানাবাড়ির রান্নাঘরের লাগোয়া ঘরটার মেঝেতে পাটি বিছিয়ে খাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। লাল আটার মোটা মোটা রুটি, বুটের ডাল, পাঁচ রকমের মিশেলে দেওয়া সবজির নিরামিষ, গরুর মাংসের ভুনা, নারকেলের সন্দেশ আর রসমালাই নিয়ে নানাভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি, তিনি এলেই খাওয়া শুরু হবে। এত সব খাবার অবশ্য প্রতিদিন হয় না। ঢাকা থেকে মেজ খালারা এসেছেন, তাদের জন্যই এই স্পেশাল আয়োজন।
পুবের ঘর থেকে নানাভাইয়ের কোরান-শরিফ পড়ার মিষ্টি করুণ সুর ভেসে আসছে। তিনি সকাল সাতটা পর্যন্ত কোরান-শরিফ পড়বেন সে তো এখনও প্রায় দু’তিন মিনিট বাকি।
-
‘আচ্ছা, মেঘগুলো সব গেল কোথায়?’ বলল ল্যুবাশকা।
ঘাসের ওপর শুয়ে শুয়ে সে নীল আগুনে পোড়া আকাশটাকে দেখছিল। পরিষ্কার ফাঁকা আকাশ। শুধু ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে একটা তপ্ত গোলক—সূর্য। আজ দু’দিন ধরে এই চোখ ধাঁধানো গোলকটায় মেঘের ছায়া পড়েনি।
গুমোট। গরম। তপ্ত হাওয়ায় তালু জ্বলে যায়। পুড়ছে, পুড়ছে। ফ্যাকাশে নীল আগুনে পুড়ছে উঁচু আকাশটা। পুড়ছে একদিন, দু’দিন, দু’সপ্তাহ। সাদা মেঘগুলো যেন দানা বাঁধতে-না-বাঁধতেই সে আগুনে বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে।
‘অমন মনমরা কেন ওগুলো, অমল চুপচাপ?’ বলল ক্ষেতের গম শিষগুলোকে লক্ষ করে।
গমগাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে একেবারে নিশ্চল। গম, ঘাস, গাছপালা—সবকিছুই। এতটুকু খসখসানি নেই।
‘হবে না মনমরা!’ পাশ দিয়ে যাচ্ছিল শুরা মাসি, আমার
-
ত্যুলকা মেয়েটির চোখ দুটি নীল, মাথায় মজার দুটি বেণী, একটা চাকার মতো, আরেকটা ছাগলের শিঙের মতো। জেলেদের জেটি বরাবর মনমরার মতো সে হাঁটছে। মাথার ওপর হাসিখুশি হালকা মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে হাসিখুশি গাঙচিল, হাসিখুশি রোদ্দুর চারদিকে, কিন্তু মেয়েটির মন ভার। চুপ করে তাকিয়ে দেখছে সমুদ্রের দিকে।
আর সে কী সমুদ্র! এই নীল। এই আবার ছেয়ে সবুজ। হঠাৎ একেবারে সোনালি। কিন্তু ত্যুলকার চোখ অন্যদিকে...দূরের ওইখানটায়, যেখানে সবচেয়ে নীল, সেখানে সমুদ্রের গভীরে আছে গন্ধকী-হাইড্রোজেনের রাজ্য, জীবন্ত সবকিছুই মারা পড়ে তাতে, কাঁকড়া, মাছ, জেলি ফিশ, এমনকি সিন্ধুঘোটক পর্যন্ত...
এই বিছছিরি গ্যাসটার কথা সে শুনেছে স্কুলের শিক্ষিকা আল্লা ফেদোরভনার কাছ থেকে। সেই থেকে ত্যুলকার মনে
উৎস
আর্কাইভ
লেখক
- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭)
- আন্দ্রেই দুগিনেৎস (১)
- আলেক্সান্দর বাত্রভ (১)
- ইউরি ইয়াকভলেভ (১২)
- খান মোহাম্মদ ফারাবী (১২)
- খালিদা হাসিলভা (১)
- গজেন্দ্রকুমার মিত্র (৫)
- গোলাম মোরশেদ খান (৭)
- চার্লস ডিকেন্স (৩)
- নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় (১)
- নিকোলাই নোসভ (১)
- প্রক্রিয়াধীন (৫৩)
- প্রযোজ্য নয় (৩)
- ফরহাদ খুররম (১২)
- বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (৮)
- ভিক্টর গোলিয়ভকিন (১)
- ভিক্তর দ্রাগুনস্কি (১)
- ভ্লাদিমির জেলেজনিকভ (১)
- ভ্লাদিমির বইকো (১)
- ভ্লাদিস্লাভ ক্রাপিভিন (১)
- মহমেৎ ইয়াখিয়ায়েভ (১)
- লীলা মজুমদার (১)
- শিবরাম চক্রবর্তী (১)
- সত্যেন সেন (১৯)
- সুবীর বৈরাগী (১)
- সেমিওন শুরতাকভ (১)
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.