ধর্মবাপ
অনাথ হল তিন ভাই, নেই বাপ, নেই মা। চাল-চুলোও নেই। গাঁয়ে গঞ্জে ঘোরে, খোঁজে কেউ মুনিষ খাটতে নেবে কিনা। যেতে যেতে ভাবে, ‘আহ্, মায়াদয়া আছে এমন কোনো মনিব যদি মুনিষ নেয়, বেশ হয়।’ দেখে, যাচ্ছে এক বুড়ো, একেবারে থুত্থুড়ে, কোমর পর্যন্ত শাদা দাড়ি।
ভাইদের সঙ্গ ধরে বুড়ো শুধোয়: ‘কোথায় চলেছ বাছারা?’
ওরা বলে: ‘কোথাও মুনিষ খাটতে।’
‘তোমাদের নিজেদের কি জোতজমি নেই?’
বলে, ‘নেই। দরদি কোনো মনিব পেলে ধম্মমতে তার জন্যে খাটতাম, কথা শুনতাম, আপন বাপের মতো মান্যি করতাম তাকে।’
ভেবেচিন্তে বুড়ো তখন বললে: ‘তা বেশ, তোমরা হবে আমার ছেলে, আমি হব তোমাদের বাপের মতো। তোমাদের মানুষ করে তুলব, ধৰ্ম্মমতে, বিবেক মতে চলতে শেখাব, কেবল আমার কথা শুনো।’
রাজি হল ভাইয়েরা, গেল বুড়োর সঙ্গে। যায় অন্ধকার বন দিয়ে, তেপান্তর মাঠ দিয়ে। যেতে, যেতে, যেতে—দেখে ছোটো এক কোঠাবাড়ি, ভারি সুন্দর, ধবধবে, চারিদিকে রংবেরঙের ফুলের গাছ। কাছেই একটা চেরি ফলের বাগান। বাগানে একটি মেয়ে, ভারি মিষ্টি, হাসিখুশি, ওই ফুলগুলোর মতোই। বড়ো ভাই তাকে দেখে বললে: ‘হ্যাঁ এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারলে হত! আর থাকত যদি বেশ কিছু গরুবলদ!’
বুড়ো তখন বললে: 'তা বেশ, চলো ঘটকালি করি। বৌ হবে তোর, গরুবলদও হবে—সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাস, শুধু ন্যায় পথটা ভুলিস নে।’
গেল তারা, ঘটকালি হল, বিয়ে হল ধুমধাম করে। বড়ো ভাই হল মালিক, বৌকে নিয়ে থাকতে লাগল সেই বাড়িতে।
দেখে বুড়ো ওদিকে ছোটো দুই ভাইকে নিয়ে চলল আরো এগিয়ে। যায় অন্ধকার বন দিয়ে, তেপান্তর মাঠ দিয়ে। যেতে, যেতে, যেতে—ছোটো একটা সুন্দর বাড়ি, ঝলমলে। কাছেই পুকুর, পুকুরে ময়দাকল। আর বাড়ির কাছে মিষ্টি একটি মেয়ে কী যেন করছে—ভারি কর্মী মেয়ে।
মেজোভাই তাকে দেখে বললে: ‘হ্যাঁ, এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারলে হত! সেই সঙ্গে ময়দাকল আর পুকুরটা যদি পাওয়া যায়। ময়দার জাঁতাকলে বসে গম পিষতাম, খেয়ে দেয়ে বেশ থাকা যেত।’
তখন বুড়ো তাকে বললে: ‘তা বেশ বাছা, তোর যখন ইচ্ছে, তাই হোক।’
বাড়িটায় গেল তারা, ঘটকালি হল, বিয়ে হল ধুমধাম করে। নতুন বৌ নিয়ে মেজোভাই থাকতে লাগল বাড়িটায়। বুড়ো তাকে বললে: ‘তাহলে বাছা, সুখে স্বচ্ছন্দে থাক, শুধু ন্যায় পথটা ভুলিস না।’
চলল তারা এগিয়ে—ছোটো ভাই আর ধর্মবাপ। যেতে যেতে দেখে—দীনদরিদ্র একটা কুঁড়ে, তা থেকে বেরিয়ে আসছে ভোর বেলাকার মতো ফুটফুটে একটি মেয়ে, পোশাক-আশাকে একেবারে কাঙাল, কেবল তালি আর তালি। ছোটো ভাই কিন্তু বললে: ‘এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে পারলে হয়। দুজনে খাটতাম, রুটি জুটত। গরিবদের কথাও ভুলতাম না: নিজেরাও খেতাম, অন্যদেরও ভাগ দিতাম।’
বুড়ো তখন বললে: ‘বেশ বাছা, তাই হবে। শুধু দেখিস, ন্যায় পথ ভুলিস নে।’
এরও বিয়ে দিয়ে বুড়ো চলে গেল তার নিজের পথ ধরে।
দিন কাটাতে লাগল ভাইয়েরা। বড়ো ভাই খুব ধনী হয়ে উঠল, ঘরবাড়ি বানাল, মোহর জমাতে লাগল, কেবল ভাবে আরো কত জমানো যায়। আর গরিব লোকদের সাহায্য—সে নিয়ে একেবারে উচ্চবাচ্য নেই—হয়ে উঠল ভারি কৃপণ!
মেজো ভাইও ফেঁপে উঠল: তার হয়ে খাটতে লাগল মুনিষেরা, সে কেবল গড়ায়, খায় দায়, আর হুকুম করে।
ছোটোটা অল্পেস্বল্পে চালায়: বাড়িতে কিছু এলে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে; কিছু না থাকলে, তা না থাকুক—দুঃখু করে না।
এখন, ধর্মবাপ ওদিকে দীনদুনিয়া ঘুরে বেড়াবার পর ঠিক করলে দেখবে ছেলেরা কেমন আছে, ন্যায় পথ থেকে সরে যাচ্ছে কিনা। বুড়ো অভাগার বেশ ধরে সে গেল বড়ো ভাইয়ের কাছে। আঙিনায় ঘুর ঘুর করে, নিচু হয়ে কুর্ণিশ করে বলে: ‘হুজুর দয়াদাক্ষিণ্যে এই অভাগ্য বুড়োটাকে কিছু খেতে দিন।’
ছেলে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
৳৯৯
এক মাস
৳৩০
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments