-
জাপানে নজরুল চর্চা এখন শুরু হয়েছে বা এখনও শুরু হয় নি বললেও চলে। নজরুল চর্চা সম্পর্কে কিছু কথা বলার আগে জাপানে বাংলা সাহিত্য চর্চা নিয়ে কিছু বলা যাক ।
জাপানে এখনও সাধারণ লোকের মধ্যে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকেই জানা আছে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই জাপানে তাঁর পরিচয় শুরু হয়। গত ১০০ বছর ধরে জাপান সবসময় পশ্চিমমুখী ছিল বলতেই হয়। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় উনিশশো দশক থেকে শুরু হয়েছে তার কারণ তিনি পশ্চিম দেশে শ্রেষ্ঠ কবি রূপে সমাদৃত। তখন জাপানে এমন কেউ ছিল না বাংলা ভাষা বুঝতে পারে আর অনুবাদ করতে পারে। প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের সব রচনার অনুবাদ করা হয়েছিল ইংরেজী থেকে। এখন সেই
-
প্রথম মহাযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। মাঝখানে একটা যুগ; বেশীদিন নয়, বছর কুড়ি-পঁচিশ। বাংলার মুসলমানের জাতীয় জীবনে এটা একটা বিশেষ স্মরণীয় যুগ। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে জাতির জীবনে যে ক্ষীণ চেতনার সঞ্চার হয়েছিল, এ যুগে তা যেন হঠাৎ জোয়ারের মত ভেঙে পড়ল। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে আশ্রয় করেই মূখ্যত এসেছিল এই জোয়ার। নজরুলের আবির্ভাব অস্বাভাবিক না হলেও অত্যন্ত আকস্মিক তাঁর আগুন ঝরা লেখা হঠাৎ চমক লাগালো বাঙালি পাঠক সমাজের মনে।
যুদ্ধ-ফেরতা নজরুলের যখন প্রথম আবির্ভাব হল কলকাতায়, আমার স্বামী ঐ সময় কলিকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তখনকার কথা পরে তাঁর মুখে যেমন গল্প শুনেছি, ঠিক তেমনি বলছি। তিনি বলেছেন—‘মেডিক্যাল কলেজের সামনে
-
রাণীগঞ্জের ইস্কুলে তখন আমাদের ক্লাশ বসে দোতলায়।
পশ্চিমদিকে বড় বড় জানলা। সেই খোলা জানলার পথে দেখলাম, দলে দলে লোক ছুটছে রেললাইনের দিকে। কি ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। ইস্কুলের ছেলে—ক্লাশ ছেড়ে যেতেও পারি না। সবাই ভাবছে, ছুটি হোক, ছুটি হলেই ছুটবো ওইদিকে।
ছুটি হলো। বাইরে বেরিয়েই শুনলাম, সাঁওতালদের একটা মেয়ে নাকি কাটা পড়েছে ট্রেনের তলায়। তার মৃতদেহটা পড়ে আছে লাইনের ধারে।
ইস্কুলের ছেলেরা অনেকেই গেল দেখতে। আমার কিন্তু একা যেতে মন সরলো না। কিছুদিন ধরে কি যে হয়েছে নজরুলের সঙ্গে দেখা না হলে বিকেলটা মনে হয় মাটি হয়ে গেল।
নজরুল পড়ে শিয়াড়শোল ইস্কুলে, আমি পড়ি রাণীগঞ্জে। এক এক সময় আফশোষ
-
II ১ II
নজরুলের কথা আজ এভাবে স্মরণ করতে হবে, সে কথা সুদূরতম কল্পনাতেও ভাবিনি। সাহিত্য-ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে, যখন পূর্ব যুগে সংঘটিত সাহিত্যিকদের প্রতি অবিচারের কাহিনী পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম, সেদিন ভাবিনি যে, আমাদের জীবদ্দশাতেই সাহিত্য-ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম উদাসীনতার অসহায় সাক্ষীরূপে থাকতে হবে। মাইকেলের সমাধি স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম জীবনে কতদিন ভেবেছি, সেদিন যদি আমি বেঁচে থাকতাম তাহ’লে সমগ্র বাংলাদেশের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতাম, সেই নির্মম উদাসীনতার দিকে; কিন্তু আজ, সেই উদাসীনতারই পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে... সেই আমিও রয়েছি...কতটুকুই বা কি করতে পেরেছি বা পারি! নিজের অক্ষমতার দৈন্যে লজ্জিত হওয়া ছাড়া, বেশী কিছু আর কি করতে পারি?
II২II
কিন্তু ভাবি, কেন
-
প্রতিভাবানরা সকলেই জগজ্জয়ী শক্তির অধিকারী হবেন এমন কোন নিয়ম নেই। প্রতিভার ছোঁয়াচটা লেগেছে, মানুষটা জ্বলেও উঠেছিল কিন্তু অল্পকাল জ্বলেই হঠাৎ নিবে গিয়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। আরম্ভটা যেমন চমক লাগানো, শেষটা আবার তেমনি মিয়োনো। যে কারণেই হোক শেষরক্ষা হয়নি। তাহলেও মানুষটা যে অসাধারণ তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবেই। প্রতিভা জিনিসটাই বেহিসেবী; ওকে সামলে রাখতে না পারলে হিসাবে গরমিল হয়ে যায়, আকাঙ্খিত ফল পাওয়া যায় না। সামান্যটুকু করতে গিয়ে অনেকটুকু নিয়ে টান ধরে; লাভ হয় যতখানি, ক্ষয় হয় তার চাইতে বেশি। ফলে সমস্ত শক্তিই অকালে নিঃশেষিত হয়। এই যে বেহিসেবী উড়নচণ্ডী প্রতিভা—এর দৃষ্টান্ত সকল কালে, সকল দেশেই দেখা গিয়েছে। দূরে যেতে হবে
-
দুনিয়ায় খুব কমই দেখা যায়, যে একজন আর একজনকে টেনে তুলছে ওপরে। এবং সে টেনে তোলা আরও মহত্ত্বর হয়, যখন যিনি টেনে তুলছেন, তিনি খ্যাতির শীর্ষদেশে সমাসীন যাকে টেনে তুলছেন, সে রয়েছে অখ্যাত, অবহেলিত। এমনি একটি কাহিনী দিয়েই আজ আমি নজরুল ইসলামের স্মৃতি-চারণ করছি।
১৯২১ সাল। দেশে তখন প্রবল অসহযোগ আন্দোলন। সে আন্দোলনে ভাসিয়ে দিলাম আমার আসন্ন বি. এ. পরীক্ষা। স্কটিশ হস্টেল ছেড়ে দিয়ে বাসা বাঁধলাম নন্দকুমার চৌধুরী লেনের একটি মেসে।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। একদিন তার কথা উঠতে পবিত্র বললেন, ‘ও কাজীটার কথা বলছিস? তা ওটাকে আনবো একদিন।’
আমি তো হাঁ! বড় বেশী
-
১৯২৬ সালের গোড়ায় নজরুল হুগলী থেকে কৃষ্ণনগর বাস করতে এসেছিলেন, ১৯২৯ সালের গোড়ার দিকে কলকাতায় চলে যান। দিন তারিখ মাসগুলো স্মৃতির কোঠা থেকে হারিয়ে গিয়েছে। ১৯২৬ সালে অবিশ্যি তিনি চাঁদসড়কের ঐ বাড়িতে বাস করতে এসেছিলেন। তবে ১৯২৬ সালের গোড়ায় তৎকালীন অন্যতম কংগ্রেসী নেতা ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্রধান সহকারীদের মধ্যে অন্যতম হেমন্তকুমার সরকার নজরুলকে কৃষ্ণনগর নিয়ে আসেন। প্রথমে তিনি এসে ওঠেন হেমন্তকুমারের বড় ভাই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার জ্ঞানচন্দ্র সরকারের গোয়াড়ির একটা বাড়ীতে। বাড়ীটা ছিল অত্যন্ত ঘিঞ্জি জায়গায়। আশেপাশে সবাই অত্যন্ত রক্ষণশীল হিন্দু যদিও তাঁরা ও তাঁদের ঘরের মেয়েরা নজরুলের গান শোনার জন্য এই বাড়ীতে ভিড় জমাতেন। শেষে চাঁদসড়কের এই মুক্ত বাড়ীতে এসে
-
তখন আমার পনের কি ষোল বছর বয়েস হবে বোধহয়। এখনকার সময়ে শুনলে শিশুই মনে হবে। এখন তো পঁচিশ বছরেও কৈশোর কাটে না মেয়েদের। যা হোক, নজল ইসলামকে ঘিরেে আমার সব কথাই ওই সময়টুকূর পরিমণ্ডলে বাধা। ইদানিং ভুলে যাই ভীষণ। অতীত হাতড়ালে অনেক কথা একসঙ্গে ভিড় করে আসে। ঘটনাগুলোর ওপর অনেক দিনমাস বছরের প্রলেপ পড়েছে। তবু এখনো ভুলতে পারি না সেইসব গান। গান খুব ভালোবাসতাম। গান গাইতেও পারতাম। খুব প্রিয় ছিল আমার নজরুল গীতি। সেই যে ‘মন হারালে না পাওয়া যায় মনের বতন…’ ‘বাগিচা বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে…’ অপূর্ব সেই গানের পথ ধরেই স্মৃতিতে ভেসে আসেন তিনি। টুকরো অনেক ঘটনা মনে পড়ে
-
বছর বিশ পঁচিশ আগে ‘সীমান্ত গান্ধী’ বলে খ্যাত আবদুল গফফর খান-এর ‘দেশ’ থেকে কয়েকজন আমার কাছে যখন আসেন, তখন স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনতা মূল্য হিসাবে দেশবিভাগের প্রসঙ্গ ওঠে (সীমান্ত গান্ধী ১৯৪৭ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে গান্ধীজীর কাছে অনুযোগ করেছিলেন যে পাঠানদের তিনি ঠেলে দিয়েছেন ‘নেকড়ে বাঘের মুখে’), আর কথায় কথায় আমার মনে আসে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় মহাশয়ের ছড়া, “ভুল হয়ে গেছে বিলকুল / আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে / ভাগ হয়নিকো নজরুল!” ছড়া শুনে সীমান্তপ্রদেশের পাঠান স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যে বিমল আনন্দ পেয়েছিলেন তা মনে পড়ছে। অন্নদাবাবুর ছড়ার উদ্ধৃতিতে যদি ভুল করে ফেলে থাকি, তো তার দায় আমার স্মৃতিভ্রংশের।
এরই
-
১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময়ে নজরুল ইসলাম বাক্শক্তিহীন ছিলেন। তার স্বাভাবিক চেতনা ছিল না, তথাপি পূর্ব পাকিস্তানের আমল থেকে কবিকে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বেসরকারীভাবে কেউ কেউ বলতেন। তখনো সরকারীভাবে ঘোষিত না হলেও তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদার কথা চিন্তা করা হতো। এর বিপরীতে আরেকটি দিক ছিল জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েও তার গান ও কবিতার অঙ্গচ্ছেদ করার চেষ্টা হতো হিন্দুয়ানীর অভিযোগে। এভাবে যথেচ্ছ শব্দ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত কম ছিল না। পাকিস্তান আমলে ‘নওবাহার’ পত্রিকায় নজরুলের সমালোচনায় কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন: “নজরুলকে পাকিস্তানের জাতীয় কবি বলিয়া অনেকে মনে করেন। কিন্তু নজরুলের সবচেয়ে বড় অপবাদ যদি কিছু থাকে, তবে এই।... পাকিস্তানের কবি হওয়া
ক্যাটাগরি
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.