নজরুলের কারাদণ্ড : দেশজুড়ে প্রতিবাদ
নজরুলের কারাদণ্ড হয়েছিল তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত, ধূমকেতু’তে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ নামে একটি কবিতা লেখার জন্য। নজরুলই বাংলার প্রথম দণ্ডিত লেখক নন। তাঁর আগে বেশ কিছু কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক সরকারী রোষে পড়েছেন ও দণ্ডিতও হয়েছেন। এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ্য, মুকুন্দদাস, সখারাম গণেশ দেউস্কর। কিন্তু নজরুলকে নিয়ে যেমন দেশজুড়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ হয়েছে, তেমন অন্য কারো ক্ষেত্রে হয়নি। নজরুলকে কারারুদ্ধ করা হলে সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। এমন ব্যাপক প্রতিবাদের নানা কারণ আছে। যেসব বাঙালী সাহিত্যিক বা কবির বই ইংরেজ আমলে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল নিঃসন্দেহে নজরুল তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কবি। আর জনপ্রিয়তায় তিনি তো সমসাময়িক সকলের উপরে ছিলেন। সেযুগে তরুণদের মুখে মুখে ফিরত তাঁর অগ্নিবীণার, ভাঙার গানের কবিতাগুলি। তদুপরি জেলের অবিচারের প্রতিবাদে কবি যখন দীর্ঘদিন অনশনে ছিলেন তখন স্বতঃই সারা দেশ বিচলিত হয়ে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ, দেশবন্ধু, সুভাষচন্দ্র তাঁর জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
কারাদণ্ড হবার আগেই রাজরোষে পড়ে কবির বই বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। কবিকে কারাগারে যেতে হয়েছিল ‘ধূমকেতু’তে লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য। নজরুলের নিবন্ধের বই ‘যুগবাণী’ আগেই বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। কিন্তু কারাদণ্ড এই প্রথম। পরে আর একবার ‘প্রলয় শিখা’ কবিতা লেখার জন্য কবি দণ্ডিত হন, তবে সে কারাদণ্ড কার্যকর হয়নি গান্ধী-আরউইন চুক্তির জন্য।
‘ধূমকেতু’র ১৯২২, ২৬ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি বের হয়। কবিতাটি লেখার জন্য কবি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারানুসারে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। এই সংখ্যায় ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ নামে একটি ছোট্ট নিবন্ধ বের হয়। সেটি ১১ বছরের একটি মেয়ের লেখা। এই লেখাটিও রাজরোষে পড়ে। সরকার নজরুলের ওই কবিতাটির সঙ্গে এই নিবন্ধটিও বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন। পৃথিবীর অন্য কোথাও এত কমবয়সী কারো লেখা রাজরোষে পড়েছে কিনা জানি না। এ সম্পর্কে মুজফ্ফর আহমেদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’য় লিখেছেন; “সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের নেতারা ‘ধূমকেতু’র প্রতাপ চাটুজ্যে লেনের বাড়ীতেই বেশী এসেছেন। এই বাড়ীতে গিয়েই অধ্যাপক সাতকড়ি মিত্রের সঙ্গে নজরুলের প্রথম পরিচয় হয়। ...তাঁর একটি ছোট বোন ছিল। এগারো বছর বয়স হবে। এ বয়সেই সে লিখতে পারতো। তার ছোট ছোট লেখা ধূমকেতুতে ছাপা হয়েছে। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ধূমকেতুর যে সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল, সেই সংখ্যায় এই মেয়েটিরও ‘বিদ্রোহীর কৈফিয়ৎ’ নাম দিয়ে একটি লেখা বার হয়েছিল। ‘আনন্দময়ীর আগমনে’র সঙ্গে বাংলা সরকার এই লেখাটিও বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই মেয়েটির নাম আমি ভুলে গেছি। মমতা মিত্র কি?”
নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হওয়ার পরে কী হল, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী মুজফ্ফর আহ্মদ লিখেছেন, “এর মধ্যে ‘ধূমকেতু’র অফিস তল্লাসী ও ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনের ১২৪এ ধারা অনুসারে ‘ধূমকেতু’ সম্পাদক কাজী নজরুল ও তার মুদ্রাকর ও প্রকাশক আফজালুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে গিরেফতারি পরওয়ানা বার হয়ে গিয়েছিল। তারিখটা ১৯২২ সালের ৮ই নভেম্বর ছিল। কমরেড আবদুল হালীম আর আমি সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে এক দোকানে চা খেয়ে বেড়াতে বেড়াতে ‘ধূমকেতু’ অফিসে গেলাম। আমরা তখন চাঁদনীর ৩ নম্বর গুমঘর লেনে আমার ছাত্রদের বাড়ীতে রাতে ঘুমাতাম। ৭নং প্রতাপ চাটুজ্যে লেনস্থিত ‘ধূমকেতু’ অফিসে গিয়ে দেখলাম অত সকালেও শ্রীবীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এসে ‘ধূমকেতু’র জন্য লিখছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে একসঙ্গে অনেকগুলো জুতোর শব্দ শোনা গেল। পুলিশ এসেছে ‘ধূমকেতু’র অফিসে তল্লাসীর পরওয়ানা ও কাজী নজরুলের নামে গিরেফতারী পরওয়ানা নিয়ে। নজরুল তখন সমস্তিপুরে গিয়েছিল বলে গিরফেতার হয়নি। পুলিশ আসায় মুহূর্তের ভিতরে বীরেনবাবু যে কোথায় উধাও হয়ে গেলেন আমরা তার কিছুই টের পেলাম না। পুলিশ প্রথমে নজরুলকে খুঁজলো। আমরা জানালাম তিনি কলকাতার বাইরে কোথায় গেছেন, তখন পুলিশ আমাদের গভর্নমেন্ট অর্ডার দেখালো যে, ২৩শে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments