পক্ষিরাজ
ম. আ. স্তাখোভিচের স্মৃতিতে
১
ক্রমশঃ আকাশ খুলে যেতে লাগল। পূর্বরবির ছটা ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে, আরো চিকচিক করছে অস্বচ্ছ রূপালী শিশিরবিন্দু, ক্ষীণতর হয়ে এল চাঁদের কাস্তে, বনে জাগল সাড়া, লোকজন উঠে পড়ছে; জমিদার বাড়ির আস্তাবলে ঘোড়ার নাকের আওয়াজ আর খড়ে পায়ের খসখস আরো স্পষ্ট কানে আসছে। মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ ক্রুদ্ধ হ্রেষাধ্বনি, কী একটা নিয়ে খেয়োখেয়ি লেগে গিয়েছে ভিড়-করা ঘোড়াগুলোর মধ্যে।
‘হয়েছে, হয়েছে! তাড়া কীসের! এরি মধ্যে ভুখ লেগেছে দেখছি!’ ক্যাঁচকে'চে ফটকটা খুলতে খুলতে বলল বুড়ো ঘোড়াপালক। ‘কোথায় যাচ্ছিস!’ একটা ঘুড়ী ফটকের দিকে লাফিয়ে আসাতে হাত তুলে সে চেঁচিয়ে উঠল।
ঘোড়াপালক নেস্তেরের গায়ে কসাক জ্যাকেট[১] নক্সা-করা চামড়ার বেল্ট দিয়ে আটকানো; চাবুকটা কাঁধে ফেলা, তোয়ালেতে মোড়া রুটি বেল্টে গোঁজা। হাতে জিন ও লাগাম ৷
ঘোড়াপালকের বিদ্রূপের সুরে ঘোড়াগুলো ভয় পেল না, চটলও না, পরোয়া করে না এমন ভান দেখিয়ে ধীরেসুস্থে ফটকের কাছ থেকে সরে গেল সবাই—শুধু, একটা ঝাঁকড়া চুলো খয়েরি রঙের বুড়ী ঘোড়া কান মুড়ে এক ঝটকায় তার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়াল। এ ব্যাপারে পিছনের একটা জোয়ান ঘুড়ীর মাথা না ঘামালেও চলত কিন্তু সে চিঁহি ডাক ছেড়ে কাছাকাছি দাঁড়ানো ঘোড়াটাকে পাছা দিয়ে ঝটকা দিল একটা।
‘হেই, হেই!’ আরো জোরে, আরো শাসিয়ে চেঁচিয়ে ঘোড়াপালক আস্তাবলের একটা কোণে সরে গেল।
আস্তাবলের আঙিনার সবকটা ঘোড়ার মধ্যে (গুনতিতে প্রায় একশ) সবচেয়ে কম অধৈর্যপনা দেখাল একটা ডোরাদার আক্তা ঘোড়া; চালের নীচে একলা দাঁড়িয়ে আধ-বোজা চোখে আস্তাবলের একটা ওক-কাঠের খুঁটি চাটছিল সে। খুটিটার স্বাদ ঠিক কেমন বলা মুশকিল, কিন্তু চাটবার সময় ডোরাদার আক্তা ঘোড়াটার ভাব গম্ভীর আর চিন্তান্বিত।
‘আবার দুষ্টুমি?’ কাছে এসে নাদার ওপর জিন, আর ঘামে চকচকে জিনের কাপড় রাখতে রাখতে আগেকার মতো গলায় বলল ঘোড়াপালক ৷
লেহন স্থগিত রেখে আক্তাটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নেস্তেরের দিকে, একটিও পেশী তার নড়ল না। হাসল না ঘোড়াটা, ভুরু কোঁচকাল না, চটে উঠল না, শুধু, পেটটা কেঁপে উঠল থরথর করে, কয়েক মুহূর্ত পরে গভীর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে অন্য দিকে ফিরল। তার গলায় হাত গলিয়ে লাগাম বসাল ঘোড়াপালক।
‘দীর্ঘনিঃশ্বেস আবার কেন রে?’ শুধাল নেস্তের।
ঝট করে লেজ নাড়াল শুধু আক্তা ঘোড়াটা, যেন বলতে চায় : “ও কিছু নয়, নেস্তের।” ঘোড়াপালক জিন আর জিনের কাপড় পিঠে বসিয়ে দেওয়াতে হয়ত অপছন্দ বোঝাবার জন্য আক্তা ঘোড়াটা কান ওল্টাল কিন্তু তাতে নেস্তের শুধু বোকা বলে গালি দিল তাকে। পেটের দড়া শক্ত করে টানার সময়ে ঘোড়াটা পেট ফুলিয়ে চেষ্টা করল বাধা দিতে, কিন্তু মুখে একটা ঘুষি আর পেটে হাঁটুর গুতো, ব্যস্, দম বেরিয়ে গেল তার। তবু দাঁত দিয়ে নেস্তের জিনের বেল্ট টানার সময়ে আবার কান মুড়ল সে, এমন কি ফিরে তাকাল। জানত এতে কোনো লাভ নেই, কিন্তু তার ইচ্ছে নেস্তেরকে জানিয়ে দেওয়া এটা তার ভালো লাগছে না, এবং ভালো না লাগাটা বরাবর জানিয়ে দেবে। জিন বসানোর পর ফুলে-ওঠা ডান পাটা একটু আলগা করে৷ খলীন চিবোতে শুরু করল সে, যদিও এতদিনে তার জানা উচিত ছিল যে খলীনে কোন স্বাদ থাকা সম্ভব নয়।
খাটো রেকাবে পা দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপে নেস্তের চাবুকটা খুলে নিয়ে হাঁটুর নীচ থেকে কোটটা বের করে জিনে সেই বিশেষ কায়দায় বসল যেটা কোচওয়ান, শিকারী আর ঘোড়াপালকদের নিজস্ব, তারপর লাগামে টান দিল। যে চুলোয় বল যেতে তৈয়ার, এ রকম একটা ভাবে মাথা তুলল বটে ঘোড়াটি কিন্তু নড়ল না। তার জানা ছিল যে রওনা হবার আগে সওয়ারী গলা ফাটিয়ে অনেক হকুম জারি করবে অন্য ঘোড়াপালক ভাস্কাকে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments