আমার গীতিকার নজরুল
দুনিয়ায় খুব কমই দেখা যায়, যে একজন আর একজনকে টেনে তুলছে ওপরে। এবং সে টেনে তোলা আরও মহত্ত্বর হয়, যখন যিনি টেনে তুলছেন, তিনি খ্যাতির শীর্ষদেশে সমাসীন যাকে টেনে তুলছেন, সে রয়েছে অখ্যাত, অবহেলিত। এমনি একটি কাহিনী দিয়েই আজ আমি নজরুল ইসলামের স্মৃতি-চারণ করছি।
১৯২১ সাল। দেশে তখন প্রবল অসহযোগ আন্দোলন। সে আন্দোলনে ভাসিয়ে দিলাম আমার আসন্ন বি. এ. পরীক্ষা। স্কটিশ হস্টেল ছেড়ে দিয়ে বাসা বাঁধলাম নন্দকুমার চৌধুরী লেনের একটি মেসে।
‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। একদিন তার কথা উঠতে পবিত্র বললেন, ‘ও কাজীটার কথা বলছিস? তা ওটাকে আনবো একদিন।’
আমি তো হাঁ! বড় বেশী কথা বলতেন পবিত্র। কিন্তু সত্যি সত্যিই তিনি অবাক করে দিলেন কবি কাজী নজরুলকে একদিন আমাদের মেসে এনে। একটা শিহবণ খেলে গেলো আমার মনে। এই সেই কাজী নজরুল? আর পবিত্র তাঁর এতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পূজারীর মনোভাব নিযে সেদিন তাঁদের সামনে অর্ঘ্য রেখেছিলাম চায়ের বাটি, জলখাবারের থালা।
আমি তখন ‘বঙ্গে মুসলমান’ নামে একটি রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক নাটক লিখে নিজেই রোমাঞ্চিত। খুব ভয়ে ভয়ে কথাটা পেড়ে পাণ্ডুলিপি থেকে কবিকে তার দু’এক পাতা পড়ে শোনাবার একটা দুর্দম আকাঙ্খায় ভুগছি। শুরুও করেছিলাম, কিন্তু তেমন একটা সাড়া পেলাম না। আর একদল অনুরাগী এসে কবিকে বগলদাবা করে তুলে নিয়ে গেলেন আমাদের আসর থেকে।
১৯২৩ সাল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. আর ল’ পড়ি। তখনই লিখি আমার প্রথম একাঙ্ক নাটক—‘মুক্তির ডাক’। একটা অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্য এলো। কলকাতার স্টার থিয়েটার ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সেই নাটকটি এখনকার নটসূর্য অহীন্দ্র চৌধুরীর পরিচালনায় মঞ্চস্থ করেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক একাঙ্ক নাটকরূপে নাটকটি ঐতিহাসিক মর্যাদা পেলো বটে, কিন্তু তদানীন্তন চার-পাঁচ ঘণ্টার নাটকের যুগে এই স্বল্প-দৈর্ঘ্য দেড় ঘণ্টার একাঙ্ক নাটকটি মোটেই জনপ্রিয় হলো না।
কিন্তু তখনও আমি অখ্যাতই বলতে হবে। কারণ স্টার থিয়েটার তাঁদের প্রচার পত্রে নাট্যকাররূপে আমার নাম ঘোষণা করেন নি, ‘মুক্তির ডাক’ যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো, তখনই আমার নামটা প্রকাশ পেলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় জগন্নাথ হলেন সাহিত্য মুখপত্র ‘বাসন্তিকা’য় আমি ‘সেমিরেমিস’ নামে একটি ঐতিহাসিক নাটক লিখি। ১৯২৭ সাল পর্যন্তভারতবর্ষ,সবুজপত্র,কল্লোল,বিচিত্রাপ্রভৃতি সাহিত্য পত্র-পত্রিকায় আমার কিছু একাঙ্ক নাটক প্রকাশিত হলো বটে কিন্তু তখনও খ্যাতিমান হইনি আমি।
এম.এ. এবং ল’ পাশ করে আমি চলে এলাম আমার তদানীন্তন বাসভূমি বালুরঘাট মহকুমা শহরে। শুরু করলাম ওকালতি। সাহিত্যের হাটে হারিয়েই গেলাম বলা চলে। হঠাৎ সেখানে পেলাম অযাচিত একখানি চিঠি। বিস্মযে হলাম অভিভূত। বহু কষ্টে আমার ঠিকানা সংগ্রহ করে চিঠিটি লিখেছেন কবি নজরুল ইসলাম। আমার সঙ্গে পরিচয় করতে উৎসুক তিনি, কলকাতায় গেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেন না ভুলি... সঙ্গে সঙ্গে দিলাম উত্তর। লিখলাম, ‘ঐ লগ্নটির অপেক্ষায় আমিও রইলাম।’ সঙ্গে সঙ্গে পেলাম তাঁর আর একখানি চিঠি। লিখলেন তিনি—
কার্যালয়
৪৫বি মেছুয়াবাজার স্ট্রীট
কলিকাতা
৪-৭-২৭
নওরোজ
সচিত্র মাসিক পত্র
জয়যুক্তেষু,
আপনার স্নিগ্ধ চিঠি না-চাওয়ার পথ দিয়ে এসে আমায় যতো না বিস্মিত করেছে তার চেয়ে আনন্দ দিয়েছে ঢের বেশী।
আমি এতটা আশা করতে পারিনি যে, আমার প্রশংসা আপনার ললাটের প্রদীপ্ত প্রতিভা-শিখাকে উজ্জ্বলতর করবে বা সোজা কথায় আমার প্রশংসায় আপনার মতো অসীম শক্তিশালী দুরন্ত সাহসী লেখকের কিছু ‘এসে যায়’।
আমার মনের চেয়ে চোখের স্মরণশক্তি একটু বেশী। দেখলে তাকে হয়তো গ্রহান্তরেও চিনতে পারি—শুনলে তাকে পথান্তরে চিনতেও বেগ পেতে হয়। কাজেই নন্দকুমার চৌধুরী লেনের দেখা আপনাকে কাব্যের নন্দন-কাননের রাজপথে দেখেও চিনতে আমার এতটুকু দেরী হয়নি। নন্দকুমার চৌধুরী
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments