চট্টগ্রামে নজরুল
প্রথম মহাযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। মাঝখানে একটা যুগ; বেশীদিন নয়, বছর কুড়ি-পঁচিশ। বাংলার মুসলমানের জাতীয় জীবনে এটা একটা বিশেষ স্মরণীয় যুগ। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে জাতির জীবনে যে ক্ষীণ চেতনার সঞ্চার হয়েছিল, এ যুগে তা যেন হঠাৎ জোয়ারের মত ভেঙে পড়ল। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে আশ্রয় করেই মূখ্যত এসেছিল এই জোয়ার। নজরুলের আবির্ভাব অস্বাভাবিক না হলেও অত্যন্ত আকস্মিক তাঁর আগুন ঝরা লেখা হঠাৎ চমক লাগালো বাঙালি পাঠক সমাজের মনে।
যুদ্ধ-ফেরতা নজরুলের যখন প্রথম আবির্ভাব হল কলকাতায়, আমার স্বামী ঐ সময় কলিকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। তখনকার কথা পরে তাঁর মুখে যেমন গল্প শুনেছি, ঠিক তেমনি বলছি। তিনি বলেছেন—‘মেডিক্যাল কলেজের সামনে ৩২ নং কলেজ স্ট্রীটেবঙ্গীয় মুসলমানসাহিত্য পত্রিকার আপিসে একটি রিডিং রুম ছিল। আমি সেখানে গিয়ে প্রায়ই পড়াশোনা করতাম। একদিন অভ্যাসমত রিডিং রুমে বসে পড়ছি। লোকজন বেশী নেই, শুধু ভেতরের ঘরে বসে আছেন সাহিত্য সমিতির সেক্রেটারী, আরও জন দুই লোক। এমন সময় সৈনিক কবি হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম ঝড়ের মত এসে ঢুকলেন সেখানে। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব অনুভূত হচ্ছে তার আগে থেকেই, ঘরে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই হাসি ও গল্পের তোড়ে ছোট্ট আপিসখানা কাঁপিয়ে তুললেন তিনি।
আমার আর পড়াশোনা হল না সেদিন। চুপচাপ একপাশে বসে দেখছি। তারপর তিনি আরম্ভ করলেন কবিতা আবৃত্তি। বোঝা গেল, তিনি নতুন কবিতা লিখেছেন, আর তাই সাহিত্যিক বন্ধুদের শোনাবার জন্যে ছুটে এসেছেন। তিনি আবৃত্তি ক’রে চললেন:
বল বীর
বল উন্নত মম শির।
শির নেহারি আমারি
নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির।
নতুন লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাখানি একটানা সম্পূর্ণ আবৃত্তি ক’রে তিনি থামলেন। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ভাবছি, কি অদ্ভুত লোক, কি অভিনব কবিতা, আর কি চমৎকার আবৃত্তির ভঙ্গী। কিছুদিন পরে দেখলাম, যে কবিতাটি আমিবঙ্গীয় মুসলমানপত্রিকার আপিসে বসে অবাক হয়ে শুনেছিলাম—সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সারা বাংলাদেশে এক মহা তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।’...
এল অসহযোগ আন্দোলন। আজাদীর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিদ্রোহী নজরুল। প্রবন্ধ, কবিতা, গান ও বক্তৃতার ভেতর দিয়ে তিনি পরাধীনতার মর্মজ্বালা ছড়ালেন দেশময়। শুধু তাই নয়। তিনি এগিয়ে এলেন পুরোভাগে, পরলেন শৃঙ্খল। বিদেশী শাসনের আইন অমান্য করে কয়েকবার তিনি কারাবরণ করলেন। সাম্রাজ্যবাদের ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য করে বললেন:
তোদের চক্ষু যতই রক্ত হবে,
মোদের চক্ষু ততই ফুটবে।...
এইভাবে কয়েদখানার আবহাওয়াকে কি করে তাঁরা উতরোল করে তুলতেন, অতিষ্ঠ করে তুলতেন জেল কর্তৃপক্ষকে—এসব গল্প আমরা নজরুলের নিজের মুখে শুনেছি। তাঁর চট্টগ্রাম সফরের কথা বলছি। দাদা চট্টগ্রামের ছাত্রদলকে, তরুণ সমাজকে মাতিয়ে তুললেন, ‘নজরুলকে চট্টগ্রামে আনা চাই।’ ফলে ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ এই বছর তিনেকের মধ্যে নজরুলকে দু’বার আমরা চট্টগ্রামে পেয়েছিলাম আমাদের বাড়িতে।
আমাদের দাওয়াত তিনি কবুল করেছিলেন খুশি হয়ে। যে ডাক প্রাণের ডাক, সে ডাকে তাঁর স্নেহ-কাঙাল মন সাড়া দিয়েছে চিরকালই। তাছাড়া অলক্ষ্যে চট্টগ্রামের নদীগিরিবন যে দাওয়াত পাঠিয়েছিল তাও বড় কম লোভনীয় ছিল না তাঁর কবি-চিত্তের কাছে। কবির থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল আমাদের বাড়িতে। এ ব্যাপারে আমার আম্মা ও নানীআম্মার আগ্রহও বড় কম ছিল না।
যে ক’দিন তিনি ছিলেন, শুধু চট্টগ্রাম শহরটাই যে সভা-সমিতিতে বক্তৃতায়, গানে, আবৃত্তিতে গুলজার হয়ে থাকত তা নয়, চট্টগ্রামের পার্বত্য প্রকৃতি, চট্টগ্রামের নদীগিরিবন সমুদ্র পর্যন্ত যেন উতরোল হয়ে উঠত; এমনি ছিল নজরুলের প্রাণের প্রাচুর্য।
বাইরে যেমন সভা-সমিতিতে, বক্তৃতায়, গানে মেতে থাকতেন অথবা পাহাড়ে, ঝর্ণায়, নদীতে, সমুদ্রে আনন্দ লুটে বেড়াতেন তেমনি বাড়িতেও চলত অবিরাম হাসি, গল্প, গান ও পানের মজলিস। সকাল থেকে শুরু করে অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ফাঁক পড়েনি কখনো এক মুহূর্ত। তিনি বলতেন, ‘থাকি আমি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments