প্রতিভার অভিশাপ : নজরুল প্রসঙ্গে
প্রতিভাবানরা সকলেই জগজ্জয়ী শক্তির অধিকারী হবেন এমন কোন নিয়ম নেই। প্রতিভার ছোঁয়াচটা লেগেছে, মানুষটা জ্বলেও উঠেছিল কিন্তু অল্পকাল জ্বলেই হঠাৎ নিবে গিয়েছে এমন দৃষ্টান্তও আছে। আরম্ভটা যেমন চমক লাগানো, শেষটা আবার তেমনি মিয়োনো। যে কারণেই হোক শেষরক্ষা হয়নি। তাহলেও মানুষটা যে অসাধারণ তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবেই। প্রতিভা জিনিসটাই বেহিসেবী; ওকে সামলে রাখতে না পারলে হিসাবে গরমিল হয়ে যায়, আকাঙ্খিত ফল পাওয়া যায় না। সামান্যটুকু করতে গিয়ে অনেকটুকু নিয়ে টান ধরে; লাভ হয় যতখানি, ক্ষয় হয় তার চাইতে বেশি। ফলে সমস্ত শক্তিই অকালে নিঃশেষিত হয়। এই যে বেহিসেবী উড়নচণ্ডী প্রতিভা—এর দৃষ্টান্ত সকল কালে, সকল দেশেই দেখা গিয়েছে। দূরে যেতে হবে না, আমাদের হাতের কাছের দৃষ্টান্ত—কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুল নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান ব্যক্তি ছিলেন। সে প্রতিভার ছাপ তাঁর সৃষ্টিকর্মে ততখানি নয়, যতখানি তাঁর ব্যক্তিত্বে। কবি ছিলেন কিন্তু খুব উঁচুদরের কবি তাঁকে বলব না। তাহলেও স্বভাব-কবির অনায়াস-লব্ধ উচ্ছলতা তাঁর কাব্যের একটি উজ্জ্বলতা দিয়েছিল। মানুষটি যেমন প্রাণবন্ত ছিলেন, তাঁর কাব্যেও তেমনি একটা প্রাণবন্ত ভাব ছিল, সেটাই পাঠকের মনকে টানত। গান লিখেছেন অজস্র, সুরের বৈচিত্র্যে লোকের মন মাতিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ন্যায় একাধারে গীতিকার এবং সুরকার কিন্তু নজরুল গীতিকে কখনই রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে তুলনীয় মনে হয়নি। গান করতেন, খুব যে সুকণ্ঠ ছিলেন এমন নয়, তাহলেও এমন দরদ দিয়ে গাইতেন যে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতো। গুণগুলির কোনটাকেই অসাধারণ বলব না, কিন্তু সব মিলিয়ে গোটা মানুষটা অসাধারণ। একটা জ্বলজ্বলে ঝলমলে মানুষ। সেজন্যই একে ব্যক্তিত্বের প্রতিভা বলেছি। প্রতিভা-দীপ্ত ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য নজরুলের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন তাঁরাই এর সাক্ষ্য দেবেন।
প্রতিভাবানরা এমন কিছু কীর্তি রেখে যান যা শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে। কিন্তু প্রতিভাবান হয়েও নজরুল এমন কিছু রেখে যান নি যা খুব দীর্ঘজীবী হবে। কারণ তাঁর প্রতিভা পূর্ণ পরিণতি লাভের সুযোগই পায় নি। নজরুলের সাহিত্যিক জীবন বলতে গেলে মাত্র কুড়িটি বছরের। কুড়ি বাইশ বছরে শুরু, চল্লিশ বেয়াল্লিশে শেষ। একটি উল্কার মত অকস্মাৎ বাঙলার আকাশে দেখা দিলেন। আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ গতিতে দীপ্ত শিখায় সকলের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে অচিরে উল্কাটি ভূমিস্যাৎ হল। গতি স্তব্ধ হওয়া মাত্র তার আলোও নেই, তাপও নেই। একটি শীতল প্রস্তরখণ্ড মাত্র। আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুদ্গীরণ করে ঝিমিয়ে পড়ে, কিন্তু পরে কোন সময়ে আবার অগ্নিমূর্তি ধারণ করে অগ্নি বর্ষণ করতে থাকে। নজরুলের এক জ্বালাময়ী কবিতা এক সময়ে আগ্নেয়গিরির লাভাস্রোতের ন্যায় ঝলকে ঝলকে প্রবাহিত হয়েছে, কিন্তু একদিন যে সেই স্রোত স্তব্ধ হল, আর তাতে এতটুকু স্পন্দন ফিরে এল না। নিজের আগুনেই নিঃশেষে দগ্ধ হয়ে চিরতরে নির্বাপিত হল। প্রতিভা কারো হাতে আসে দেবতার বর হিসাবে, কারো কাছে অভিশাপ হয়ে। দৃষ্টান্ত আগেই দিয়েছি। একটা বিস্ফোরক পদার্থকে বহন করে চলা সব সময়েই বিপজ্জনক। যাঁরা স্থিতধী তাঁরা নীলকণ্ঠ। অর্থাৎ বিপদ তাঁরাও এড়াতে পারেন না, অনেক ক্ষয়ক্ষতি, দুঃখ আঘাত সইতে হয়। তবে সে সমস্তই তাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথের জীবনে তাই ঘটেছে। সকল ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে প্রতিভা তার মূল্য আদায় করে নেয়।
নজরুল মানুষটা এমন, প্রথম দর্শনেই চমক লাগিয়ে দিতেন। নিজের কথা মনে পড়ছে, তখন আমি কলেজে ইনটারমিডিয়েট ক্লাসের ছাত্র, বয়স সতেরো-আঠারোর বেশি নয়। সে বয়সে অবশ্য সহজেই চমক লেগে যায়। তবে নজরুলেরই বা বয়স তখন কত? তেইশ-চব্বিশের বেশি নয়। কিন্তু এরই মধ্যে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে সারা দেশে সোরগোল বাঁধিয়ে দিয়েছেন। আমাদের হস্টেলে ‘বিদ্রোহী’ কবিকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছিল। সুদর্শন মূর্তি, পরিপূর্ণ স্বাস্থ্য, চোখে মুখে তারুণ্যের আভা। কথাবার্তায়, ভাবে ভঙ্গিতে, উচ্ছ্বসিত হাসিতে কোন একটি মানুষের মধ্যে এতখানি
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments