প্রসঙ্গ: নজরুলের সঙ্গীত শিক্ষণের পদ্ধতি
কাজী নজরুল ইসলাম ধূমকেতুর মামলায় রাজদ্রোহের অভিযোগে কারারুদ্ধ থাকার পর বহরমপুর জেল থেকে ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরের প্রায় শেষের দিকে মুক্ত হন। যেদিন মুক্ত হন সেই দিনই তাঁকে সাংসারিক কারণে কলকাতা চলে আসতে হয়। এর কিছুকাল পরে কবি মার্চ এপ্রিল নাগাদ পুনরায় বহরমপুর আসেন এবং এই সময়েই বহরমপুরবাসী সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় ও নানা স্থলে সম্বর্ধনা সভায় যোগদান করেন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বি-এ ও বি-এস-সি পরীক্ষা সবে শেষ হওয়ায় এই সময়ে পরীক্ষার্থী ছাত্রবর্গের মাথা থেকে একটা গুরুভার নেমে গেল, সঙ্গে সঙ্গে তারা নানা উৎসবে মেতে উঠলো। কবি নজরুলের সম্বর্ধনার সকল আয়োজনও তারা এইসময়েই করে।
আমিও ঐসব পরীক্ষার্থীদের অন্যতম। দেশ গোবরডাঙা থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর বহরমপুর কলেজ থেকে আই এ ও বি-এ সাঙ্গ করি। পরীক্ষার পর অন্যান্য সকলের সঙ্গে এক সম্বর্ধনা সভায় আমিও যোগদান করি। একদিন কলেজের ১নং সায়েন্স হোষ্টেলের ছাত্ররা সবাই মিলে কবির সম্বর্ধনা সভার আযোজন করে। আমি যদিও হস্টেলের মেম্বার ছিলাম না। (আমাদের বহরমপুরেই বাস ছিল) তবুও সেই সভায় যোগদান করতে আমন্ত্রিত হই। সেই অনুষ্ঠানসভায় আমি কবিকে প্রথম দেখলাম। অনুষ্ঠান শেষে কবি উপস্থিত অনেকের সাথে আলাপ করলেন। আমার সঙ্গেও। জিজ্ঞাসা করলেন আমাদের বাসা কোথায়। বললাম। বাসায় আমরা থাকতাম মা (সুনীতি দেবী), বাবা (চন্দ্রভূষণ) ও ভাইবোন নিতাই, গৌরী, কেষ্ট এবং শচী—(এর মধ্যে গৌরী ও কেষ্ট এই দুই ভাই বোন কয়েক বৎসর পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করেছে)। যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় আমার বাবা কার্যোপলক্ষে বাইরে ছিলেন। কবি বললেন—চল মাকে প্রণাম করে আসি। কবির প্রস্তাবে আনন্দের শিহরণ বয়ে গেল মনের মধ্যে। কবিকে বাসায় নিয়ে এলাম। সংগে এলেন আর একজন স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক পবিত্র গাঙ্গুলী। আমাদের বাসায় এসে কবি আমার মাকে (সুনীতি দেবী) মা বলে সম্বোধন করলেন, প্রণাম করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই জাঁকিয়ে বসে প্রাণ মাতানো গান ধরলেন। এর পর যে কটি দিন বহরমপুরে রইলেন, প্রায় প্রতেকদিনই আমাদের বাসায় এলেন; সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে তুললেন আর গান গেয়ে সকলকে মুগ্ধ করে গেলেন। ঐ সময় স্বনামখ্যাত নলিনাক্ষ সান্যালও সঙ্গে এলেন। তাঁর বাড়ি আমাদের বাসার ঠিক সামনেই ছিল। অবশ্য তিনি সদা সর্বদাই আমাদের বাসায় আসতেন।
কবি কোলকাতায় বসবাস শুরু করার অল্প কিছুকাল পরে আমার চাকরির সূত্রে আমরাও কোলকাতায় চলে আসি। ইতিমধ্যে আমরা বহরমপুরের বাসা ছেড়ে দেশের বাড়িতে চলে আসি। কবির পরিবারবর্গের সাথে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ক্রমশ আত্মীয়তার পর্যায়ে ঘনীভূত হয়। কবি আমার অগ্রজের মত, কবিপত্নী আমাদের ‘দুলিবৌদি’ (কবি পত্নীর ডাকনাম ছিল ‘দুলি’, আসলে প্রমীলা, কবির দেওয়া) কবির শাশুড়ি গিরিবালা দেবীকে কবির মত আমরাও মাসিমা বলতাম। মাসিমা এবং আমার মা কবিকে নুরু বলতেন। সেইসূত্রে আমরা কবিকে নূরুদা বলতাম। আমার একমাত্র বোন গৌরীকে (অকালে বিধবা ও বর্তমানে স্বর্গতা) মাসিমা আপন সন্তানের মত ভালবাসতেন, অনেক সময়েই কাছে রাখতেন। প্রথমদিকে কবিরা এন্টালীতে থাকতেন। পরে বেশ কয়েকবার বাসা বদল করেছেন। শিমলার কাঁসারিপাড়ায় নলিনদার বাসার পাশেই সীতানাথ রোডের বাসায়, হরি ঘোষ স্ট্রীটে, শ্যামবাজার স্ট্রীটে ইত্যাদি। আমাদের আসা যাওয়া সবসময়েই ছিল, মাঝে মাঝে একত্রে থাকার স্মৃতিও মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
কোলকাতায় কবির গানের বন্ধু অনেক ছিলেন। অন্যতম ছিলেন উমাপদ ভট্টাচার্য। উমাপদবাবু বহরমপুর নিবাসী ছিলেন, পরে কোলকাতায় বাগবাজারে বাসা করেছিলেন। তিনি শুধু সুকণ্ঠ গায়কই ছিলেন না, বহুরকমের সংগীতে অভিজ্ঞ ছিলেন, গানে সুর লাগাতেন বড় চমৎকার মেজাজে। শুনেছি তিনি মুর্শিদাবাদের ওস্তাদ কাদের বক্স এবং মঞ্জু সাহেবের কাছে তালিম পেয়েছিলেন। কোলকাতায় আসার আগে থেকেই তাঁর কবির সাথে আলাপ ও বন্ধুত্ব হয়েছিল, কোলকাতায় বাসা নেবার পর তাঁর বাগবাজারের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments