-
গলিটা হঠাৎ বোকার মতো শেষ হইয়া গিয়াছে। যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে কিছু খালি জায়গা, কিছু পুরানো ইটের স্তূপ, একটা ভাঙা দেওয়াল, আর উপরে খোলা নীল আকাশ। তার আগে শুধু এখানে-সেখানে সারি সারি টিনের ঘর, কয়েকখানা পুরানো একতলা বাড়ি, একটিমাত্র দোতলা বাড়ি, যার একতলার খানিকটা মাটির নীচে চলিয়া গিয়াছে। খোলা ড্রেন মাত্র একটি, কিন্তু খুব বড়ো, এত বড়ো যে একটা কুকুরের বাচ্চা দৈবাৎ একদিন সেখানে পড়িয়া সারা দিনে আর উঠিতে পারিল না, কেবল কেঁই কেঁই করিয়া কাঁদিল, ড্রেনের গা নখ দিয়া অনেক খুঁটিল, তারপর একদিন মরিয়া গেল। তারপর একদিন পেস্কারবাবু মথুরা চক্রবর্তীও মদের নেশায় শরীরের তাল ঠিক রাখিতে পারে নাই, হাতের
-
ছেলেগুলি যা দুষ্টু! কাল রাতে কানের কাছে কতক্ষণ ক্যান্স্ত্রা পিটিয়েছে, আজও পিটিতেছে। মানা করিলে জোরে বাজায়, কিছু না বলিলে আরও জোরে বাজায়। এমন খেলা আর খেলে নাই বুঝি। প্রত্যেকটি মধ্যযুগের দিগম্বর সম্প্রদায়ের বংশধর, মাথার চুল রোদে-পোড়া, হাতে-পায়ে বড়ো-বড়ো নখ। মুখে প্রৌঢ়া আর বৃদ্ধা মেয়েদের বিবাহের গানের অনুকরণ করিতেছে, হাতে ক্যান্স্ত্রা পিটিতেছে।
মাস্টার ছেলেটি ভালো, বড় বাধ্য। ঐশ্বর্যের লীলাভূমি শহরে অন্নের সন্ধানে আসিল, অন্ন পাইল না, কিন্তু পাইল আমাকে, তদবধি আমাকে ধরিয়াই আছে। আমি বৃক্ষ, সে লতা। মাস্টার ছেলেটি ভালো, অর্থাৎ সোজা কথায় যাকে বলে গুড বয়। মাথার চুল হইতে পায়ের নখ অবধি এমন একটি চেহারা যে, আঠারো হইতে পঁয়ত্রিশ অবধি
-
যাদব ঠিক করিল, সে আজ একটা সিগারেট খাইবে। বিবাহের আগে মাঝে মাঝে দু-একটা সিগারেট সে খাইত বটে, কিন্তু তারপর এতগুলি বছর আর ছুঁইয়াও দেখে নাই, আজ ঠিক করিয়া ফেলিল, যত দামই হোক, সিগারেট আজ একটা সে খাইবেই।
বড়ো রাস্তার রেলওয়ে ক্রসিং-এর গেটের সঙ্গে লাগিয়া যে ছোটো দোকানটা বসে, সেখানে সব রকম সিগারেটই থাকে। যাদব ধীরে ধীরে সেদিকেই চলিল। গিয়া দেখিল, দোকানের মালিক গোকুল সেখানে নাই, হয়তো খাইতে গিয়াছে, একটা ছোঁড়া বসিয়া আছে সেখানে। পান সাজানোর চকচকে থালাটার উপর দুটি পয়সা ঝনাৎ করিয়া ফেলিয়া যাদব বলিল, ‘একটা সিগারেট দে তো?’
‘যুদ্ধের ফলে সব সিগারেটের দামই চড়ে গিয়েছে’, ছোঁড়াটা বলিল।
তা হোক,
-
দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে।
বিকালের রোদের নীচে সরু আলোর পথ দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে প্রশান্ত ভাবিল, দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পরে আবার এই প্রথম সে গ্রামের দিকে পথ চলিতেছে। সেই পরিচিত পথ। সেই বুনোফুল-ঘাস-লতাপাতার গন্ধ, শুকনো পাতার স্তূপে কোনো অদৃশ্য প্রাণীর খস খস শব্দ, হঠাৎ কখনও সারি সারি আকাশ-ছোঁয়া তালগাছের সামঞ্জস্যহীন অবস্থিতি, সেই খেয়াঘাটের নৌকা ও মাঝি। বছরের পর বছর, মুহূর্তের পর মুহূর্ত কত পরিবর্তন চলিতেছে, কত স্বেচ্ছাচারীর চোখে-মুখে উল্লাস, কত ডাকাত পরের অন্নে মাথা ঠোকাঠুকি করে, অথচ এখানে তার ছোঁয়াটুকু নাই। পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে, তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল। আকাশে কী
-
তাহাদের ঘরে ঢুকিয়া হঠাৎ দরজা দিতে দেখিয়া পদ্মা কাতরস্বরে বলিল, ‘আমাকে একটু আসতে দে ভাই, আমি কিছু বলব না, কেবল চুপ করে বসে বসে শুনব, কিছু বলব না—’
দরজা আগলাইয়া সুমতি বলিল, ‘না না, তোমাকে আসতে দেওয়া হবে না।’
পদ্মা তবু তাহার মুখটি আরও কাতর করিয়া বলিল,
—‘তোদের পায়ে পড়ি ভাই, আমায় একটু আসতে দে, বলছি তো একটি কথাও বলব না—’
তাহারা একবার পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিল, শোভা মুখ টিপিয়া হাসিল, তারপর রানু গম্ভীরভাবে বলিল, ‘একটি কথাও বলতে পারবে না, ঠিক তো?’
—‘ঠিক বলছি, এই চোখ ছুঁয়ে বলছি।’ পদ্মা সত্যই তাহার দুই চোখ ছুঁইয়া বলিল।
সুমতি এবার পথ ছাড়িয়া দিল,
-
লোকটিকে কী জানি কেন চিত্তর একটু ভালো লাগিয়াছে। রতন গোঁসাই-এর গায়ের বর্ণ শ্যাম, চামড়া মনে হয় পালিশ করা সোনার চেয়েও মসৃণ, লম্বা দেহ এবং ঈষৎ মোটা, মাথা-ভরা একরাশ ঘাড় পর্যন্ত চুল, একটিও পাকা দেখা যায় না, বেশ করিয়া সযত্নে আঁচড়ানো, চোখ দুটি গোল হইলেও বেশ ভাসা ভাসা—চকচক করে, মুখে সর্বদাই মিষ্টি হাসি। সেদিনেও গল্প হইতেছিল।
রতন একটা আসনের উপর দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া, সামনেই চিত্ত ও আর একটি লোক।
চিত্ত জিজ্ঞাসা করিল, ‘তোমাকে কখনও গান গাইতে শুনিনি তো?’
রতন হাসিয়া বলিল, ‘গান গাইলে তো শুনবে। কিন্তু এ গাঁয়ে যখন প্রথম আসি তখন এই গানের জন্যই আমাকে সবাই ভালোবেসেছিল। এখন আর
-
আমাদের বাসায় ইঁদুর এত বেড়ে গেছে যে আর কিছুতেই টেকা যাচ্ছে না। তাদের সাহস দেখে অবাক হতে হয়। চোখের সামনেই, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদলের সুচতুর পদক্ষেপে অগ্রসর হওযার মতো ওরা ঘুরে বেড়ায়, দেয়াল আর মেঝের কোণ বেয়ে-বেয়ে তর-তর করে ছুটোছুটি করে। যখন সেই নির্দিষ্ট পথে আকস্মিক কোনো বিপদ এসে হাজির হয়, অর্থাৎ কোনো বাক্স বা কোনো ভারী জিনিসপত্র সেখানে পথ আগলে বসে, তখন সেটা অনায়াসে টুক করে বেয়ে তারা চলে যায়। কিন্তু রাত্রে আরও ভয়ংকর। এই বিশেষ সময়টাতে তাদের কার্যকলাপ আমাদের চোখের সামনে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুরু হয়ে যায়। ঘরের যে কয়েকখানা ভাঙা কেরোসিন কাঠের বাক্স, কেরোসিনের অনেক পুরোনো টিন, কয়েকটা ভাঙা
-
এত বড়ো বটগাছ সচরাচর দেখা যায় না। পিরপুরের হাটকে যদি চিনিতে হয়, তবে যে-কোনো অশীতিপর ক্ষীণদৃষ্টি বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেও ইহার উত্তর মিলিবে—দূরে, সে যত দূরেই হোক না কেন, যেন আকাশেরও প্রায় অর্ধেক ছাইয়া আছে, এমন একটা দৈত্যের মতো প্রকাণ্ড গোলাকার গাছের দিকে দারুণ তৎপরতায় শীর্ণ হাতটি উঠাইয়া সে বলিবে, ‘আরে, তুমি কি কানা? ওই দৈত্যিটার বরাবর চলে যেতে পার না?’ যাহাকে বলা হইবে, সে যেন কোনো ব্যবসায়ী, ওই হাটের দিকেই যাইতেছে, আর কোনো উদ্দেশ্য তাহার নাই। পিরপুর গ্রামটি অন্যান্য গ্রামের মতো নয়, সেখানে কেউ ঘর বাঁধিয়া বাস করিতে পারে, একথা কেউ ভুলেও কল্পনা করিতে পারে না। কেবল একটি হাট লইয়াই
-
সন্ধ্যা হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, কিন্তু সান্ধ্যভ্রমণ শেষ হয়নি; পার্কের যে-দিকটা জনবিরল সেখানে কখনও লাল কাঁকরের পথে, কখনও নরম ঘাসের উপরে স্যার বিজয়শংকর নীরবে পায়চারি করছিলেন। অদূরে মানুষের ভিড় থেকে, যানবাহন-পীড়িত পথের চলায়মান জনতা থেকে, একটানা কোলাহল শোনা যায়। মাঝে-মাঝে উজ্জ্বল আলো এসে পার্কের দেহাবরণ খুলে সমস্ত প্রকাশ করে দিচ্ছে।
স্যার বিজয়শংকর নিজের মনে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন।
—বাবা, ও বাবা!
কান্নায় বিকৃত একটি ছোট্ট মেয়েলি স্বর যেন কাছে কোথাও শোনা গেল! স্যার বিজয় থমকে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হলেন।
—আপনি আমার বাবাকে দেখেছেন?
মেয়েটি তাঁর কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে—ফ্রক-পরা, স্যার বিজয়শংকর চমশা-চোখে সেই স্বল্পালোকেই তাকে দেখলেন। ঘাড় পর্যন্ত চুল, দু-হাত আর পা নিরাভরণ, মুখ চোখের
-
ঠাণ্ডাটা আজ একটু বেশিই পড়িয়াছে, বাহিরেও কনকনে বাতাস, বেড়ার ফাঁক দিয়া সে বাতাস আসিয়া সকলের গায়ে লাগে। একপাশে একটি কুপি জ্বলিতেছে—প্রচুর ধোঁয়ায় মেশানো, লাল শিখা। বাতাসে কড়া তামাকের গন্ধ। রাত এখন কয়টা হইয়াছে কেহ বলিতে পারে না। মাঝে মাঝে কেবল কুকুরের ডাক ছাড়া গভীর নিস্তব্ধতা চারিদিকে।
কলকেটি উপুড় করিয়া আর এক ছিলিম তামাকের আয়োজন করিতে গিয়া কানাই দেখিল, কৌটাতে তামাক নাই। হাতের কাছেই ভেজানো দরজার দিকে চাহিয়া বলিল, ‘একটু তামাক দে তো রে, দামি?’
দামিনী কানাইর মেয়ে। কেবলমাত্র বাবার মুখের অদ্ভুত গল্পটার আকর্ষণেই এতরাত অবধি জাগিয়াছিল। বলিল, ‘তামাক তো নেই বাবা।’
—‘সে কী, কালই না অতগুলো পাতা কাটলাম?’ খাওয়ার মালিক
-
তখনও আকাশ ভালো করিয়া পরিষ্কার হয় নাই, নানাকমের পাখি আগামী দিনের ঘোষণায় প্রাণপণে ডাকাডাকি করিতেছে, বনগ্রামের মরা নদীর কঠিন বুকেও ভয়ানক ঝড় তুলিয়া কাহাদের এক লঞ্চ তীরে আসিয়া ভিড়িল।
প্রথমে দেখিয়াছিল অন্ধ দশরথ। তাহার দুই ছেলে—এক ছেলে গিয়াছে বেহালে, আর এক ছেলে যার বয়স অল্প, হাতের বৈঠাটি একপাশে রাখিয়া সে তখন অন্ধ পিতার জন্য এক ছিলিম তামাক ভরিতেছিল, আর দশরথও তখন তাহার হাতের জালটি গুটাইয়া গলাটি একটু ভিজাইবার আশায় পশ্চিমের প্রায়ান্ধকার আকাশের দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে চাহিয়া ছেলের তামাকের প্রতীক্ষা করিতেছিল। হঠাৎ কেমন একটা গুম্ গুম্ আওয়াজ তাহার কানে বাজিতে লাগিল, কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগে কান পাতিয়া শুনিয়া সে ডাকিল, ‘রাম?’
দশরথ-পুত্র
-
ছয়টা বাজিয়া গেল তবু কেউ আসিতেছে না। অথচ সাড়ে ছয়টায় মিটিং। উদ্যোক্তারা অধীর হইয়া উঠিল, শেষে স্থির করিল, এমন কাণ্ড তাহারা জীবনেও দেখে নাই, শোকসভার অনুষ্ঠান করিতে গিয়া যে এমন বেকুব বনিয়া যাইবে, ইহা তাহারা স্বপ্নেও ভাবিতে পারে নাই। একজন একটা অত্যন্ত কঠিন মন্তব্য করিয়া ফেলিল, আজ যাহারা শোকসভার এই আড়ম্বরহীন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দ্বিধা করিতেছে, কাল যে তাহারাই আবার শ্রাদ্ধ-বাসরে উপস্থিত হইতে কুকুরের মতো ঠেলাঠেলি করিয়া মরিবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। সুবোধ ঘোর জাতীয়তাবাদী, এমনকী বাংলাকেও ভারতবর্ষ হইতে পৃথক করিয়া দেখে, কিন্তু আধুনিক সব কাণ্ড কারখানা দেখিয়া সে বাঙালির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভীষণ সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছিল, অত্যন্ত বিরক্তিভরা সুরে
ক্যাটাগরি
ট্যাগ
আর্কাইভ
লেখক
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.