একটি রাত
রাত অনেক।
রাস্তায় লোকজন একটিও নেই। এখন আশ্বিনের শেষ, তাই একটু শীতের আমেজ লাগে। সুকুমার তার জামার কলারটি আরও টেনে ধরল। নিতান্ত অন্যমনস্ক হয়েও সে শুনতে পেল, একটা বিড়াল মিউ মিউ করে কাতরস্বরে ডাকছে, হয়তো হঠাৎ কোনো খোলা ড্রেনে পড়ে স্নান করে উঠেছে। তাছাড়া ড্রেনের গন্ধও নাকে আসে, রাত্রির নিস্তব্ধতায় দিনের বেলার চেয়েও তীব্র। দূরে একটা কেরোসিনের ল্যাম্প টিমটিম করে জ্বলছে। পাশেই একটা দীর্ঘ অস্পষ্ট ছায়া।
সে পুরোনো বাড়িটার একটা ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে সুকুমার থাকে, সামনেই তার মস্ত বড়ো গেট, প্রায় অর্ধেকটা ভাঙা। সর্বাঙ্গ লোনায় ধরেছে। বাড়ি ঢুকতে গিয়ে সুকুমার দেখল, লম্বা একটা লোক হঠাৎ কোথায় সাপের মতো সরে পড়ল। লোকটা কে সে বিষয়ে আর সন্দেহ নেই। এদের ছায়া দেখলেও চিনতে কষ্ট হয় না। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে সুকুমার বাড়ি ঢুকে পড়ল। ভিতরে মা-র কাশির শব্দ শোনা যায়, সেই কাশি। সুকুমার ডাকল, ‘মা?’
মা-র বদলে ভোলা এসে হাজির হল।
ভোলা সুকুমারের কুকুর।
কিন্তু একটা সামান্য কুকুরের আগেও ছেলের ডাক না শোনার এই অক্ষমতায় লজ্জিত হয়ে মা চেঁচিয়ে উঠল—‘যা এখান থেকে, কেবল পায়ে পায়ে হাঁটে। কতবার বলি, আমার বাপু এসব ঘেন্না করে, তবু—’মা আর বলতে পারল না, দরজা খুলে দিয়ে যেন নিষ্কৃতি পেল। তার চুলগুলি কাকের বাসার মতো উস্কোখুস্কো, মুখে একটা অসাধারণ কাঠিন্যের ছাপ, চোখে একটা অদ্ভুত কাতরতা। ভ্রু কুঁচকে সে কুকুরটার কাণ্ড দেখল। সুকুমারের বুকে সে শিশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তার সমস্ত শরীরটাকে ফোঁস ফোঁস শব্দ করে শুঁকছে। সুকুমার বললে, ‘আরে, দাঁড়া, দাঁড়া, আগে ঘরে ঢুকতে দে।’
ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে মা আলো হাতে সটান ঘরের দিকে গেল। ভিতরের এই গলির বাতাস ঠান্ডা আর ভারী, চারদিকে কেমন একটা পচা আবর্জনার গন্ধ।
ঘরে ঢুকে জামা-কাপড় ছেড়ে সুকুমার তক্তপোষের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। ভোলাও তার বুকের ওপর মুখ রেখে গা চাটবার চেষ্টা করল। তার কান দুটি নিয়ে খেলা করতে করতে সুকুমার হঠাৎ বললে, ‘এবেলা কী রেঁধেছ মা?’ কোনো উত্তর নেই। বোঝা যায়, বাইরে অন্ধকারে কোথাও সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।
সুকুমার আবার ডাকল, ‘মা?’
কিছুক্ষণ পরে ভারী গলায় উত্তর এল, ‘তুই এখন খাবিনে সুকু?’ দেখল, অন্ধকারে দেয়ালে হেলান দিয়ে নীরবে সে দাঁড়িয়ে আছে। সুকুমার বললে, ‘তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কেন মা? বাইরে যে হিম পড়ছে।’
—‘কোথায় হিম!’ ব্যঙ্গের সুরে সে বললে, ‘যা গরম পড়েছে।’
এই বলে পরক্ষণেই আবার অন্ধকূপের মতো রান্নাঘরে ঢুকে ভাত বেড়ে ডাকল, ‘খেতে আয়।’
সুকুমারের পেছনে পেছনে ভোলাও ঢুকছিল। এবার চুপ করে থাকা যায় না। মা চিৎকার করে উঠল: ‘ঢের হয়েছে বাপু, শোবার ঘর এমনকী বিছানা পর্যন্ত তো হয়েছে, এখন খাবার ঘরটা থাক।’
সুকুমার হেসে ফেলল, হাসতে হাসতে ভোলাকে লক্ষ করে বললে,—‘যা এখান থেকে, দূর হয়ে যা, পাজি কুকুর কোথাকার—আমাদের জাত ধর্ম খুইয়ে ছাড়বি দেখছি!’
একটু একটু করে খানিকটা এগিয়ে পেছিয়ে গিয়ে ভোলা এখন অন্ধকারে শুয়ে পড়ল। অনেক আগেই তার খাওয়া হয়ে গিয়েছে। ওপরের ঘরের মাতাল দীননাথ চক্রবর্তীর মেয়ে বীণা কয়েকদিন ধরে তাকে রোজ খাইয়ে দেয়। কিন্তু এ-ইতিহাসের বিন্দু-বিসর্গও সুকুমার জানে না।
খাওয়া-দাওয়ার পরে সুকুমার একটা বই খুলে বসল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সারাদিনের পরিশ্রমে চোখ তার জড়িয়ে এল। বইটা পাশে সরিয়ে রেখে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
মা এবার ছেলের পাশে বসল। ছেলের নিদ্রিত মুখের দিকে চেয়ে চোখের দৃষ্টি তার অদ্ভুত নরম হয়ে এসেছে।
সে তার দেহে গভীর স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার নিজের ফ্যাকাশে বর্ণহীন চোখেও একরাশ অশ্রু জমা হয়েছে, একটু পরেই
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments