রাত্রিশেষ

লোকটিকে কী জানি কেন চিত্তর একটু ভালো লাগিয়াছে। রতন গোঁসাই-এর গায়ের বর্ণ শ্যাম, চামড়া মনে হয় পালিশ করা সোনার চেয়েও মসৃণ, লম্বা দেহ এবং ঈষৎ মোটা, মাথা-ভরা একরাশ ঘাড় পর্যন্ত চুল, একটিও পাকা দেখা যায় না, বেশ করিয়া সযত্নে আঁচড়ানো, চোখ দুটি গোল হইলেও বেশ ভাসা ভাসা—চকচক করে, মুখে সর্বদাই মিষ্টি হাসি। সেদিনেও গল্প হইতেছিল।

রতন একটা আসনের উপর দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া, সামনেই চিত্ত ও আর একটি লোক।

চিত্ত জিজ্ঞাসা করিল, ‘তোমাকে কখনও গান গাইতে শুনিনি তো?’

রতন হাসিয়া বলিল, ‘গান গাইলে তো শুনবে। কিন্তু এ গাঁয়ে যখন প্রথম আসি তখন এই গানের জন্যই আমাকে সবাই ভালোবেসেছিল। এখন আর গাই না। আশ্চর্য বটে! যা এখন তুমি খুবই ভালোবাসলে পরে হয়তো তাই কোনো কারণে ভুলে যেতে পার, এটা কি আশ্চর্য নয়?’

কথার ভাবে মনে হয় তাহার মূলে কোনো ইতিহাস আছে।

চিত্ত বলিল, ‘নিশ্চয়ই। কিন্তু তোমার এই গান না গাওয়ার পেছনে কোনো কারণ আছে বোধ হয়!’

রতন কোনো উত্তর না দিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া রহিল। চোখের দৃষ্টি নিবিড় হইয়া আসিয়াছে। কখন বিকাল হইয়াছে। গাছপালার পাশে তির্যক ছায়া, তার ফাঁকে ভাঙা মিষ্টি রোদ।

রতন আগের কথা আর না তুলিয়া অন্য লোকটিকে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করিল, ‘তারপর কালীচরণ, কেমন আছ?’

—‘এই তুমি যেরকম রাখ।’ কালীচরণ হাসিল।

—‘আমি রাখব কী হে? রাখবে একমাত্র আকাশের ওই—’

রতন উপরের দিকে আঙুল দিয়া দেখাইল। একটু চুপ করিয়া থাকিয়া হঠাৎ আবার বলিল, ‘তোমার ছেলেটির না অসুখ করেছিল বলেছিলে?’

—‘সেরে গেছে।’

রতন এবার হাসিয়া বলিল, ‘কালীচরণ, এ তোমার ভারি অন্যায়—বিয়ে করেছ সেই কবে, খাওয়ালে না, থাক, সেকথা নয় জোর করে ভুলেই গেলাম। কিন্তু তারপর ছেলে হল, তাতেও খাওয়ানোর নামটি নেই, এ কেমন কথা বল? ভারি অন্যায়, ভারি—’

কালীচরণ মুখ নিচু করিয়া হাসিল।

ঘরের ভিতর ছিল বিনোদিনী। তাহার গলা শোনা গেল।

—‘আর সেকথা মানুষের কাছে বলতে উলটো আমাদেরই লজ্জা করে। ওর সঙ্গে আমাদের এত ঘনিষ্ঠতা, আর তার মধ্যে কিনা বিয়ে হল, এমনকী ছেলে হল, তাতেও খাওয়ালে না! বাস্তবিক এসব কথা মনে হলে সংসার আর ভালো লাগে না।’

রতন হাসি মুখে বলিল, ‘ওরে বাপরে এতই দুঃখ।’

—‘হ্যাঁ গো।’ বিনোদিনী হাসিয়া উঠিল।

কালীচরণ লজ্জা পাইয়া বলিল, ‘আচ্ছা, সে হবে’খন। ঝুলন পূর্ণিমা কবে?’

—‘এখনও দু-মাস বাকি।’

—‘সেদিন এখানকার উৎসবে যা খরচ হবে সব আমার।’

রতন খুশি হইয়া বলিল, ‘শুনছ ঠাকরুন?’

—‘হুঁ।’

কিছুক্ষণ পরে কালীচরণ চলিয়া গেল।

চিত্ত বলিল, ‘কেন গাও না বলবে?’

রতন চারিদিকে চাহিয়া মুখ বাড়াইয়া আস্তে আস্তে বলিল—‘বলি শোনো। সে অনেক দিনের কথা। তখন আমাদের এখানে রাধা বলে একটি মেয়ে ছিল। ওর একবার অসুখ হল, সে ভয়ানক অসুখ, মেয়েদের যেসব কঠিন রোগ হয়। কোবরেজ চিকিৎসা করত। এতে হল না দেখে দু-ক্রোশ দূরের মাধবদি, সেই যে যেখানে খুব বড়ো রথের মেলা বসে, সেখান থেকে মহিম ডাক্তারকে আনানো হল, সে বুড়ো এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু যার আয়ু সত্যি ফুরিয়ে এসেছে তাকে কি আর বাঁচানো যায়? যায় না। অবস্থা খারাপ হয়ে এল। এমন সময় হল কী, আশ্চর্য, রাধা আমার গান শুনতে চাইল। কিন্তু ডাক্তারদের সাথে রোগীর নীতি মেলে না। তখন এমনি খারাপ অবস্থা যে একটু টুঁ শব্দ করাও ভালো নয়। তাছাড়া রোগীর মনে মরবার ভাব জেগেছে, প্রশ্রয় দেওয়াও ভালো নয়। ক্ষান্ত হলাম। কিন্তু সে সময় রাধার মুখের যে অবস্থা, যে কাতরতা দেখেছি, তারপর থেকে আজ পর্যন্ত গান গাওয়া হয়নি, হবেও না।’

শুনিয়া চিত্তর কষ্ট হইল,

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice